26/10/2025
ভূমিকাঃ সৈয়দ মুজতবা আলীর লেখা ‘পন্ডিতমশাই’ গল্পটি খুব সম্ভবত ক্লাস সিক্স এ থাকতে পড়া। তবে সেই সময় পড়া এই গল্পটি মনে দাগ কেটেছিলো। যারা গল্পটি আগে পড়েছেন, নতুন ভাবে পড়ার পর সন্দেহ নাই তারা আবার স্কুল জীবনের সেই সময়টাতে ক্ষনিকের জন্য হলেও ফিরে যাবেন। আর যারা পড়েননি – তারাও একবার পড়ে দেখতে পারেন। এইটা মূল গল্পটার সাথে মিলাবেন না। মূল গল্পটির সারসংক্ষেপ এখানে দেয়া হয়েছে।
গল্প:
পন্ডিতমশাই
লেখক: সৈয়দ মুজতবা আলী
আমাদের স্কুল জীবনের সেই সময়ের স্মৃতি থেকে এক মুহূর্ত আজও জীবন্ত। পন্ডিতমশাই ছিলেন সেই শিক্ষক, যিনি বাঙলা ভাষার প্রতি ছিলেন অত্যন্ত অনমনীয়। কিন্তু এই অনমনীয়তা ছিল এক ধরনের কৌশল—মাত্র খাঁটি সংস্কৃত অংশই তিনি পড়াতেন, যেমন কৃৎ, তদ্ধিত, সমাস আর সন্ধি। বাকি সবকিছুতে তার ছিল কঠোর, কখনো কখনো বিস্ময়কর অশ্রদ্ধা।
পন্ডিতমশাই ক্লাসে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই টেবিলে পা তুলে বিশ্রাম নিতেন। তবে তিনি ঘুমাতেন অন্যরকম—নাক ডাকিয়ে, পুরো দেহ শিথিল করে। হেডমাস্টারও তার কাছে কোনো বিশেষ গুরুত্ব রাখতেন না; কারণ হেডমাস্টারও স্কুলজীবনে সংস্কৃতের ছাত্র ছিলেন এবং পন্ডিতমশাই তা বারবার মনে করিয়ে দিতেন। আমরা, ছাত্ররা, এই কাহিনী শুনে আনন্দিত হতাম, কখনো কখনো তাকে খুশি করার জন্য স্মরণ করিয়ে দিতাম।
শ্যামল বর্ণের পন্ডিতমশাই মাসে একবার গোঁফ কামাতেন এবং হাঁটু পর্যন্ত জোকা ধুতি পরতেন। তার শরীরের একাংশে যেটি দড়ি বলে জানতাম, সেটি আসলে চাদর। ক্লাসে ঢুকেই সে দড়িখানা টেবিলে রাখতেন এবং আমাদের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ছুঁড়ে দেখতেন, যেন মনে করিয়ে দিচ্ছেন, মাঠে হাল চাষের চেয়ে স্কুলে উপস্থিতি বেশি উপযুক্ত। আর যদি কোনো অজুহাত না থাকত, তিনি নিজে তত্ত্ব আলোচনা করতেন—কৃৎ, তদ্ধিত ইত্যাদি—তারপরে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়তেন।
একদিন আসামের চিফ-কমিশনার এন.ডি. বীটসন বেল আমাদের স্কুলে পরিদর্শনে আসলেন। তার আসল নাম “নন্দদুলাল বাজায় ঘন্টা”—এন.ডি মানে ‘নন্দদুলাল’, বীটসন বেল মানে ‘বাজায় ঘন্টা’। সেই দিন আমরা সবাই সকাল থেকে স্কুলে হাজির। হেডমাস্টার সবদিকেই ব্যস্ত, যেন তিনি শহরের কোনো গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান দেখাচ্ছেন।
কমন রুমে গিয়ে দেখি পন্ডিতমশাই নতুন হলদে রঙের গেঞ্জি পরে বসেছেন। অন্যান্য শিক্ষকরা প্রশংসা করছেন। আমরা কৌতূহলী হয়ে তাকালাম। পন্ডিতমশাই সাধারণত সেলাই-করা কাপড় পরতেন না, কিন্তু আজ বিশেষ উপলক্ষে গেঞ্জি পরেছিলেন। আমরা আশা করছিলাম, গেঞ্জি দেখে হয়তো তিনি আমাদের শাসন করবেন, কিন্তু তিনি চুপচাপ বসে রইলেন। পদ্মলোচন উচ্ছ্বসিত হয়ে জিজ্ঞেস করল, “পন্ডিতমশাই, গেঞ্জিটি কত টাকা দিয়ে কিনলেন?”
“পাঁচ সিকে,” পন্ডিতমশাই বললেন, কোনো উত্তেজনা ছাড়াই।
পরিদর্শনের পর তিনি আবার নিজের স্বাভাবিক রুটিনে ফিরে এলেন। ক্লাসে ভরা মেঘের ডাক দিয়ে জানতে চাইলেন, লাট সাহেবের সঙ্গে আর কে ছিলেন। সমস্ত ফিরিস্তি দেওয়ার পরও তিনি সন্তুষ্ট হলেন না। অবশেষে, তিনি আমাদের প্রশ্ন করলেন লাট সাহেবের কুকুর সম্পর্কে। আমরা বললাম, “একটা ঠ্যাং কম ছিলো।” পন্ডিতমশাই আবার চোখ বন্ধ করে ফেললেন।
ক্লাসের শেষ দিকে তিনি একটি অংকের উদাহরণ দিলেন, যা আমাদের হতবাক করে দিল। বললেন, লাট সাহেবের কুকুরের পেছনের মাসিক খরচ পচাত্তর টাকা, আর তার তিনটি ঠ্যাং। প্রতি ঠ্যাংয়ের খরচ কত? আমরা বললাম পঁচিশ টাকা। তখন পন্ডিতমশাই জানালেন, তার নিজস্ব পরিবার—ব্রাক্ষণী, বৃদ্ধা মাতা, তিন কন্যা, বিধবা পিসি ও দাসী—মোট আটজনের জীবনধারার জন্য তিনি মাসে পঁচিশ টাকা পান। এরপর প্রশ্ন করলেন, আমাদের এই পরিবারের খরচ লাট সাহেবের কুকুরের কত ঠ্যাং সমান। আমরা হতবাক, নিস্তব্ধ হয়ে রইলাম। পন্ডিতমশাই যেন আমাদের সামনে আত্ম-অবমাননার নির্মম উদাহরণ স্থাপন করলেন।
#সৈয়দমুজতবাআলী
#পন্ডিতমশাই
#বাংলাসাহিত্য
#স্কুলজীবনেরস্মৃতি