23/09/2021
ইউরো-ফাইটার বাংলাদেশের আপকামিং যুদ্ধবিমান।
বাংলাদেশ বিমানবাহিনী প্রাথমিক স্তর থেকে তার কর্মক্ষমতা পুনর্গঠন করছে
আমরা যখন বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর জন্য ইউরোফাইটার টাইফুনের কথা চিন্তা করছিলাম, তখন বেশিরভাগ মানুষ হতবাক হয়ে গিয়েছিল। বলা হচ্ছিল, কোন সাহসে এটি সুপারিশ করা হচ্ছে? তারা এমনভাবে উপহাস করেছিল যেন বাংলাদেশ বিমানবাহিনী কখনোই ইউরোফাইটার বা উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন যুদ্ধবিমান পরিচালানার জন্য উপযুক্ত হবে না। মনোবিজ্ঞানের মতে, এই বিদ্রুপ আসলে পূর্বসুরীদের রেখে যাওয়া ধারণা থেকে পাওয়া।
১১ বছর আগে আওয়ামী লীগ সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ধীরে ধীরে বিমান বাহিনীকে নতুন করে সাজাতে শুরু করে। বাহিনীর প্রায় সবকিছুই প্রতিস্থাপন অথবা নতুন করে তৈরি করতে হয়েছিল। বর্তমানে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় এয়ারফোর্স একাডেমি পরিচালনা করছে। তারা এমন একটি বিমান প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করছে যা বিশ্বের যেকোনো সেরা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তুলনাযোগ্য।
তবে আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিমানবাহিনী প্রাথমিক স্তর থেকে তার কর্মক্ষমতাকে পুনর্গঠন করছে।
প্রকৃতপক্ষে, এটি তো সেই বাহিনী যাদের রয়েছে বিমানযুদ্ধের দক্ষতা দিয়ে বিখ্যাত হওয়া তওয়াব এবং আজমের মতো সদস্যদের গৌরাবান্বিত ঐতিহ্য।
এই অগ্রযাত্রার শুরুতে বিমানবাহিনীর জন্য একটি নতুন বহুমাত্রিক যুদ্ধবিমান প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। প্রথমে একটি এসইউ-৩০ বিমান কেনার কথা ভাবা হয়েছিল। তবে সেক্ষেত্রে একটি সমস্যাও ছিল। আর তা হলো প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছেও একই ধরনের বিমান রয়েছে। তাই এই বিমান বাংলাদেশ বিমান বাহিনীকে কার্যত কোনো বিশেষ সুবিধা দিতে পারবে না।
যাত্রার শুরু এয়ার চিফ মার্শাল আবু এসরারের সময় থেকে। এক জীবনের চেয়েও বড় স্বপ্ন দেখা এই মানুষটি বুঝতে পারলেন, বাংলাদেশ বিমানবাহিনীতে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সময় এসেছে। চীন এবং রাশিয়া থেকে যুদ্ধবিমান কেনার প্রথা থেকে বের হয়ে তিনি সম্পূর্ণ পশ্চিমা প্রযুক্তির দিকে অগ্রসর হন, যা মানোন্নয়নের পাশাপাশি বাহিনীর মনোবল বাড়াবে। পাশাপাশি এই ধরনের যুদ্ধযান বিমানবাহিনীকে বুদ্ধি ও সক্ষমতার সঙ্গে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত একটি বাহিনী হিসেবে সুসংহত করবে।
এত মূল্যবান ইউরোফাইটার টাইফুন যখন বাংলাদেশের হাতে এলো, তখন বিষয়টি সত্যিই প্রতিবেশীদের মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। হ্যাঁ, যে বিমানটি কেনা হয়েছে তার দাম নৌবাহিনীর রণতরীর মতো হতে পারে, এটি সম্ভবত সমগ্র সশস্ত্র বাহিনীর যেকোনো সামরিক যন্ত্রের মধ্যে সবচেয়ে ব্যয়বহুল।
আমরা জানি, রক্ষণাবেক্ষণের পাল্লায় ইউরোফাইটারের সমকক্ষ কেউ নেই। এটি ফ্রান্সের তৈরি রাফাল কিংবা বিশ্বের অন্যতম যুদ্ধবিমান চ্যানেল বা গেরেলেনের চেয়ে কম ব্যয়বহুল নয়। মসৃণ, সুন্দর, সম্ভবত পরিশীলনের প্রতীক। কিন্তু এতে একটি সমস্যা আছে, আসলে বলা উচিত একাধিক। এই নিবন্ধের পরবর্তী ধাপে সেসব বিষয়ও উঠে এসেছে।
ইউরোফাইটার রাফালের চেয়ে কম ব্যয়বহুল। এটি এমন একটি যুদ্ধবিমান যার চারটি সরবারহকারী প্রতিষ্ঠান থাকায় যন্ত্রাংশ পাওয়া অনেক সহজ। রাফালের প্রস্তুত এবং বিপণন পুরোটাই ফ্রান্সের হাতে। এর অর্থ হলো বাংলাদেশ বিমানবাহিনীকে নির্মাতা দেশটির কাছ থেকেই যন্ত্রাংশ নিতে হবে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ বিমানবাহিনী ইউরোফাইটার কিনে নিলে এক সরবরাহকারীর কাছে কোনো যন্ত্রাংশ না থাকলে সেটি অন্য তিন প্রতিষ্ঠানের যেকোনো একটির কাছ থেকে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইউরোফাইটার কিনলে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী এবং স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ক্ষমতাসম্পন্ন চারটি ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারবে। যা দেশে মহাকাশ শিল্প গড়ে তুলতে সহায়ক হতে পারে। একটি বিষয় অনস্বীকার্য যে, বিশ্বের চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিমানবাহিনীর সঙ্গে পরিচালনা এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভিজ্ঞতা বিনিময় ইতিবাচক ফলাফল নিয়ে আসতে পারে।
এখন একটু কূটনৈতিক দিক বিবেচনায় আনা যাক। বর্তমানে প্রায় সব আরব দেশ ইউরোফাইটার ব্যবহার করছে। বিষয়টি কেবল একটি বিমান নয়, দেশগুলো মুসলিম বিশ্বের শীর্ষ যোদ্ধা প্ল্যাটফর্মও। অর্থাৎ, বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর কর্মীরা উপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থার (জিসিসি) বিমানবাহিনীর সঙ্গে প্রশিক্ষণ ও কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ পাবে।
ফলে অবসরে যাওয়ার পর, বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর কর্মীরা মধ্যপ্রাচ্যে উচ্চ বেতনে প্রকৌশলী এবং প্রযুক্তিবিদ হিসেবে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারবেন। প্রথমবারের মতো, বাংলাদেশ বিমানবাহিনী এমন একটি বাজারে প্রবেশ করবে যেখানে দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তান বিমান বাহিনীর একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। যারা এফ-১৬ পরিচালনা করে এবং যা সাধারণত জিসিসি অস্ত্রাগারে রাখা যুদ্ধবিমান।
এখন এই অঞ্চলে ফিরে আসি, আমাদেরকে বুঝতে হবে যে ভারতের বিপরীতে আমাদের প্রযুক্তিগত প্রতিরোধ সক্ষমতা থাকতে হবে। কিন্তু রাফাল বা এসইউ -৩০ কিনলে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী সে ধরনের প্রতিরোধ সক্ষমতা হারাতে পারে। কারণ একই বিমান পাওয়ার অর্থ একই ধরনের প্রতিরোধ সক্ষমতা অর্জন নয়। একটি ভালো যুদ্ধবিমান সবচেয়ে ভালো সমাধান, যার কারণে ইউরোফাইটার আরও ভালো বিকল্প।
ইউরোফাইটারের অধিক যাত্রী পরিবহন সক্ষমতা এবং একটি দ্রুতগতি ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ইঞ্জিন রয়েছে। এটির একটি বৃহত্তর পরিচালন সীমা রয়েছে এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশ রাফালের চেয়ে বেশি সংখ্যায় ইউরোফাইটার ব্যবহার করে।
বৈজ্ঞানিক গবেষণা, ভূ -রাজনৈতিক বিবেচনায় এবং আর্থিক কার্যকারিতার ভিত্তিতে পেশাদার বিশেষজ্ঞরা এই বিমানটি সুপারিশ করেছেন। ইউরোফাইটার বাংলাদেশ বিমান বাহিনীকে এক অনন্য মাত্রায় নিয়ে যাবে। কারণ স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশের প্রতিরোধ ক্ষমতায় কিছুটা ঘাটতি ছিল।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য যারা জীবন উৎসর্গ করেছিলেন তারা একটি শক্তিশালী দেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন। যে দেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সক্ষম। আমাদেরকে সম্মিলিতভাবে জাতির জন্য সর্বোত্তম সেবা নিশ্চিত করতে হবে।
পার্বত্য অঞ্চলের শুভ্র মেঘ, সুন্দরবনের সবুজ এবং রাজধানীর আকাশে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর ইউরোফাইটার গর্জে বেড়াক।
©Dhakatribune