31/05/2025
আজ ৩৭তম শহীদ জামিল দিবস!
৩১মে ১৯৮৮, স্বৈরশাসক এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে উত্তাল ছাত্র সমাজ। এরশাদের রাষ্ট্রধর্ম ইসলামের বিল এই আন্দোলনকে আরও বিস্ফোরিত করে। এই আন্দোলনে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছিলো ছাত্র মৈত্রী। রাজশাহী অঞ্চলে এরশাদ বিরোধী আন্দোলন ও রাষ্ট্রধর্ম বিল বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম শীর্ষ নেতা ছিলেন তৎকালীন ছাত্র মৈত্রী রাজশাহী মেডিকেল কলেজ শাখার সভাপতি জামিল আখতার রতন।
এমন সময়েই রাজশাহী মেডিকেল কলেজের হোস্টেলের কিছু 'ইসলামী ছাত্র শিবির' কর্মীদের সাথে অস্ত্রসস্ত্রসহ বিপুল সংখ্যক বহিরাগত 'ইসলামী ছাত্র শিবির' কর্মী অবস্থান নেয়। রাতে তারা ক্যাম্পাসের কলাপসিবল গেইট বন্ধ করে সেই বহিরাগতদের সাথে নিয়ে অস্ত্রসজ্জিত হয়ে "ধর ধর" বলে মিছিল করতে থাকে। এমন পরিস্থিতিতে 'ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের' স্মারকলিপির প্রেক্ষিতে একাডেমিক কাউন্সিলে বসে রাজশাহী মেডিকেলের শিক্ষককেরা। মিটিং শেষে তারা মেইন হোস্টেল সরেজমিনে দেখতে যান। কিন্তু হোস্টেলে ঢোকার মুখে বাধা হয়ে দাঁড়ায় শিবির কর্মীরা, তারা শিক্ষকদের হোস্টেলে ঢুকতে দেয় না, কয়েকজন বহিরাগত তর্ক শুরু করে দেয় শিক্ষকদের সাথে। ছাত্র মৈত্রী, রাজশাহী মেডিকেল শাখার সভাপতি জামিল আখতার রতন ছিলেন শিক্ষকদের পেছনে; তিনি তখন বলেন, "এই যে স্যার, এরা বাহিরের লোক।"
ঠিক তখনই শিবির কর্মীদের থেকে একটা তীব্র হুইসেল বেজে ওঠে, এটাই ছিলো তাদের সংকেত। সাথে সাথে "নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবর" ধ্বনিতে কেঁপে ওঠে হোস্টেলটি। মুহূর্তের সাথে কয়েকশো বহিরাগত ইসলামী ছাত্র শিবির কর্মী প্রাণঘাতী অস্ত্র নিয়ে হোস্টেলের নিচে নেমে আসে, ধাওয়া করে নিরস্ত্র ছাত্রনেতা জামিল আখতার রতনকে। যিনি অনেক দিন ধরেই ইসলামী ছাত্র শিবির হত্যার হিট লিস্টের তালিকায় এক নম্বরে ছিলো। তারা তাকে ধাওয়া করতে করতে একসময় তলোয়ার নিয়ে ঝাপিয়ে পড়ে। তলোয়ার দিয়ে কমরেড জামিল আখতার রতনের পেট ও পিঠ এফোড়-ওফোড় করে দিতে থাকে শিবির কর্মীরা। তখন হয়তো জামিল আখতার রতন মাটিতে পড়ে গিয়ে এফোড়-ওফোড় হয়ে যাওয়া পেট চেপে ধরেছিল, রক্ত পড়ছিল অবিরাম। মৃত্যু যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছেন কমরেড জামিল এমন সময় তার মৃত্যু নিশ্চিত করতে ইট দিয়ে আঘাত করে জামিলের মাথা থেতলে দেয় ঘাতকরা। হয়তো তখনও জামিল তার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন নাই, হয়তো তিনি তখনো তার বুজে যাওয়া চোখেও অস্পষ্টভাবে দেখছেন। তিনি দেখছেন তাকে হত্যা করার উল্লাসে ফেটে পড়ছে ইসলামী ছাত্র শিবিরের কর্মীরা, হত্যা শেষে এবার তারা একজন আরেকজনের সাথে আলিঙ্গন করে, বুক মেলায়, আর মুখে তীব্র সুরে উচ্চারণ করতে থাকে "নারায়ে তাকবির আল্লাহু আকবার"।
এই দৃশ্য দেখতে থাকেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজের ৩৫ জন শিক্ষক, দেখে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। এক অকুতোভয় দুঃসাহসী বামপন্থী ছাত্রনেতা, রাষ্ট্রধর্ম বিল বিরোধী আন্দোলনের নেতা হত্যার আনন্দে এবার ধর্মীয় ফ্যাসিস্ট রাজনৈতিক সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবিরের কর্মীরা হোস্টেলটির আশেপাশে থাকা গাড়ি ভাঙচুর করে, শেষে বোমা ফাটিয়ে "আল্লাহু আকবর" বলতে বলতে ক্যাম্পাস ছাড়ে। রাষ্ট্রধর্ম বিল বিরোধী আন্দোলনের প্রথম শহীদ হন ছাত্র মৈত্রীর জামিল আকতার রতন।
শহীদ জামিলের লড়াই থেমে যায়নি। শহীদ জামিল লড়াই করেছিলেন এরশাদ স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে যে ধর্মকে আঁকড়ে ধরেই ক্ষমতায় টিকে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছিল। জনগণের অব্যাহত সংগ্রামের মধ্য দিয়েই ক্ষমতাচ্যুত হয় স্বৈরশাসক এরশাদ। কিন্তু, ৩৭ বছর পরে এসে বর্তমান বাংলাদেশ পার করছে আরও একটি ভয়াবহ সময়। যে অন্ধকার সময়ে ঘটছে নব্য-ফ্যাসিবাদের উত্থান। অভ্যুত্থান-পূর্ববর্তী সময়ে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য আওয়ামী লীগ যেভাবে মৌলবাদী গোষ্ঠীকে প্রত্যক্ষ মদদ জোগাতো। একইভাবে জুলাই-আগস্ট পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ছাত্র শিবির, হেফাজতে ইসলামসহ উগ্র, সাম্প্রদায়িক ও প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীগুলোকে নিজ স্বার্থে ব্যবহার ও বিকশিত করছে।
অভ্যুত্থানের গণআকাঙ্খাকে ভূলুণ্ঠিত করে যখন ইন্টারিম সরকার চট্টগ্রাম বন্দরকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির হাতে তুলে দেয়, মানবিক করিডোর প্রদানের মাধ্যমে দেশকে যুদ্ধপরিস্থিতিতে ঠেলে দেয়, বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের প্রেসক্রিপশনে দেশের অর্থনীতি পরিচালনা করে – তখন জনবিরোধী এসব সিদ্ধান্ত থেকে জনগণের দৃষ্টি সরাতে প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী গণতান্ত্রিক আন্দোলন, বামপন্থীসহ ভিন্ন মত ও পথের মানুষের ওপর নানা ধরণের মব-সন্ত্রাস ও আক্রমণ চালায়। ক্যাম্পাসে-ক্যাম্পাসে তারা শুরু করছে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড। বর্তমানে দেশ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের পথে বড় বাঁধা এই প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী। এই অবস্থায় জনগণতান্ত্রিক সংগ্রাম জারি রাখতে শহীদ জামিল আখতার রতনের স্পর্ধা ও আদর্শকে ধারণ করা আমাদের ঐতিহাসিক কর্তব্য৷
নব্য-ফ্যাসিবাদের কবল থেকে বাংলাদেশের জনগণকে মুক্ত করতে শহীদ জামিলের লড়াইয়ের স্পৃহাই সকল রাজনৈতিক কর্মীদের এখন প্রয়োজন। এই লড়াইয়ে জয়ী হওয়ার মধ্য দিয়েই শহীদ জামিলকে জয়ী করতে হবে, এই লড়াইয়ে জয়ী হওয়ার মধ্য দিয়েই শহীদ জামিলকে শ্রদ্ধা জানাতে হবে। শহীদ জামিল, শহীদ রূপম, শহীদ রিমু, শহীদ ফারুক, শহীদ নাসিম, শহীদ আতিকুল বারী, শহীদ পান্না, শহীদ আইয়ুবদের সংগঠন বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর কাছ থেকে বিপ্লবী অভিবাদন ও লাল সালাম কমরেড জামিল আখতার রতন!