16/06/2026
৫ই আগস্টের চেতনা ক্ষুণ্ন: বনপাড়া পৌরসভায় মাস্টার রোলে নিয়োগ বাণিজ্য ও হাট শেড বরাদ্দে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ
বড়াইগ্রাম (নাটোর) প্রতিনিধি:
দীর্ঘদিনের বৈষম্যবিরোধী ও কোটা সংস্কার আন্দোলনে ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব ত্যাগ, নির্মম নির্যাতন ও রক্তের বিনিময়ে গত ৫ই আগস্ট অর্জিত হয়েছে এক নতুন বাংলাদেশ। স্বৈরাচারী ও বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে একটি স্বচ্ছ ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া চালুর লক্ষ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের হাত ধরে দেশ যখন এগিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তখনই নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার বনপাড়া পৌরসভায় উল্টো চিত্র দেখা গেছে। ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মূল চেতনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পৌরসভাটিতে দলীয় ও ব্যক্তি প্রভাব খাটিয়ে এবং বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে ‘মাস্টার রোলে’ (দৈনিক মজুরি ভিত্তিক) নিয়োগ দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের মতে, যোগ্যতা ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে যেকোনো নিয়োগে কারও আপত্তি নেই। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়েও ব্যক্তি বা দলীয় প্রভাব বিস্তার করে এবং আর্থিক অনৈতিকতার মাধ্যমে চাকরি দেওয়া সম্পূর্ণ অবৈধ এবং গণ-অভ্যুত্থানের চেতনার সঙ্গে চরম অসঙ্গতিপূর্ণ। তবে এই নিয়োগ বাণিজ্যের বিষয়ে ক্ষুব্ধ ভুক্তভোগীদের দু-একটা কথা বললেও, কোণঠাসা হওয়ার ভয়ে তারা প্রকাশ্যে মুখ খুলতে নারাজ।
হাট শেড ও দোকান বরাদ্দে লাখ লাখ টাকার ‘রসিদবিহীন’ বাণিজ্য
পৌরসভার অনিয়মের খতিয়ান এখানেই শেষ নয়। বনপাড়া বাজার হাট শেড নির্মাণ ও তা বরাদ্দ দেওয়া নিয়ে উঠেছে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ। বরাদ্দ পাওয়া একাধিক ব্যবসায়ী ও ভুক্তভোগী মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পৌরসভা থেকে দেওয়া অফিশিয়াল ভাউচারে বা রসিদে যে পরিমাণ অর্থের কথা উল্লেখ রয়েছে, বাস্তবে তাদের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি টাকা। অতিরিক্ত এই বিপুল পরিমাণ অর্থের কোনো দালিলিক প্রমাণ বা রসিদ পৌরসভা কর্তৃপক্ষ তাদের দেয়নি।
এছাড়া পৌরসভার অন্তর্ভুক্ত দোকানগুলোর বরাদ্দ নিয়েও রয়েছে চরম স্বেচ্ছাচারিতা। নিয়ম অনুযায়ী, বরাদ্দ পাওয়া ব্যক্তিরা কোনো অবস্থাতেই পৌরসভার দোকানঘর অন্য কারও কাছে উপ-ভাড়া (সাব-লেট) দিতে পারবেন না। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, মূল বরাদ্দপ্রাপ্তরা পৌরসভা কর্তৃক নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে কয়েক গুণ অতিরিক্ত ভাড়া এবং মোটা অংকের জামানত (অ্যাডভান্স) নিয়ে অন্য ব্যবসায়ীদের কাছে দোকান ঘর ভাড়া দিয়ে ব্যবসা করছেন। এই প্রকাশ্য অনিয়মের বিষয়ে স্থানীয়রা বারবার পৌরসভা কর্তৃপক্ষের কাছে लिखित ও মৌখিক অভিযোগ জানালেও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা রহস্যজনকভাবে নীরব ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন।
পৌরসভার ড্রাম ট্রাকের আয়-ব্যয়ের কাল্পনিক হিসাব, হলরুমে সাংবাদিকের প্রশ্ন
পৌরসভার অভ্যন্তরীণ আরেকটি বড় অনিয়ম প্রকাশ পেয়েছে এর নিজস্ব যানবাহন ব্যবস্থাপনা খাতে। জানা গেছে, বনপাড়া পৌরসভার নিজস্ব মালিকানাধীন মোট ছয়টি ড্রাম ট্রাক রয়েছে। এই ড্রাম ট্রাকগুলো থেকে প্রতি মাসে ভাড়া বাবদ কী পরিমাণ আয় হচ্ছে এবং তা পরিচালনায় কী পরিমাণ ব্যয় হচ্ছে, তার একটি হিসাব পৌর কর্তৃপক্ষ উপস্থাপন করেছে। তবে সচেতন মহলের দাবি, এই আয়-ব্যয়ের হিসাব কোনোভাবেই বাস্তবসম্মত নয় এবং এর পেছনে বড় ধরনের আর্থিক নয়ছয় লুকিয়ে রয়েছে।
সম্প্রতি পৌরসভার হলরুমে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় এই কাল্পনিক ও অসঙ্গতিপূর্ণ হিসাবের বিষয়টি নিয়ে তীব্র আপত্তি তোলেন প্রবীণ সাংবাদিক অমর ডি কস্তা। তিনি সরাসরি পৌর কর্তৃপক্ষের সামনে এই হিসাবের অসামঞ্জস্যতা ও অযৌক্তিকতার কথা তুলে ধরে এর জবাব চান। কিন্তু উপস্থিত পৌর কর্তৃপক্ষ সাংবাদিক অমর ডি কস্তার উত্থাপিত যৌক্তিক প্রশ্নের কোনো সদুত্তর বা সদয় ব্যাখ্যা প্রদান করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়, যা এই খাতের অনিয়মকে আরও বেশি স্পষ্ট করে তুলেছে।
দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থেকে ‘প্রভাবশালী সিন্ডিকেট’
অনুসন্ধানে জানা যায়, বনপাড়া পৌরসভার অধিকাংশ কর্মকর্তা ও কর্মচারী বছরের পর বছর ধরে একই কর্মস্থলে বহাল রয়েছেন। সাবেক মেয়রের সঙ্গে গভীর সখ্যতা ও ‘বনিবনা’র মাধ্যমে তারা দীর্ঘদিন ধরে এখানে চাকরি করার সুবাদে একটি শক্তিশালী নিজস্ব প্রভাব বলয় বা সিন্ডিকেট তৈরি করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, এই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বড় একটি অংশ বিভিন্ন ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতিতে সরাসরি সম্পৃক্ত। এমনকি তাদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলাও রয়েছে, যা বর্তমানে চলমান।
এলাকার সুধী সমাজের দাবি, কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অতীত ও বর্তমান সম্পদের হিসাব নেওয়া এখন সময়ের দাবি। শূন্য থেকে শুরু করে কীভাবে অনেকে ‘আঙুল ফুলে কলাগাছ’ হয়েছেন এবং বিপুল সম্পদের মালিক বনে গেছেন—তার রহস্য উদঘাটন হওয়া জরুরি।
পানি বিল লোপাট: তদন্তের নামে কালক্ষেপণ, বহাল তবিয়তে টিপু
পৌরসভার পানির বিল লোপাটের অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত মাস্টার রোলে চাকরিরত টিপু নামের এক কর্মচারী। অভিযোগ রয়েছে, গ্রাহকদের পানির বিলের বিপুল অংকের টাকা লোপাট করে আত্মসাৎ করেছে সে। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, পৌরসভারই এক প্রভাবশালী কর্মকর্তা বর্তমানে টিপুর চাকরি স্থায়ীকরণের জন্য জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
এই বিষয়ে পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা হাফসা শারমিন-এর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি টিপুর দুর্নীতির বিষয়টি স্বীকার করে জানান, টিপুর বিষয়ে আনীত অভিযোগটি এখনো তদন্তাধীন রয়েছে। তবে সচেতন মহলের প্রশ্ন, তদন্তের নামে কতদিন এই কালক্ষেপণ চলবে এবং একজন চিহ্নিত অভিযুক্ত কীভাবে এখনো বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে?
নেপথ্যে সাবেক মেয়র: এখনো চলছে ‘রিমোট কন্ট্রোল’ শাসন!
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, বিগত সরকারের দোসর ও সাবেক মেয়র এ কে এম জাকির হোসেনের সঙ্গে বনপাড়া পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিবিড় যোগাযোগ এখনো অক্ষুণ্ন রয়েছে। সচেতন মহলের অভিযোগ, বর্তমান পৌরসভা যেন আড়াল থেকে সাবেক মেয়র জাকিরের পরামর্শ ও ইশারায় ‘রিমোট কন্ট্রোলে’ পরিচালিত হচ্ছে। রাতের আঁধারে পৌরসভার অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী সাবেক মেয়রের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন এবং তাদের প্রোপাগান্ডা চালিয়ে যাচ্ছেন।