21/06/2025
স্কুলের সেই ছুটির ঘন্টা: স্মৃতির শেষ প্রহরে একটি সুর
যখন স্কুলের প্রাচীন দেয়ালের মাঝে শেষ ক্লাসটি শেষ হয়ে আসে, তখন হঠাৎ করেই একটানা একটি শব্দ বাতাসে কেঁপে ওঠে—ছুটির ঘণ্টা। সেটি যেন কেবল একটি ধাতব যন্ত্রের শব্দ নয়; বরং একটি দিনান্তের কবিতা, একটি নির্মল প্রশান্তি, আবার অনেক সময় একটি মধুর বেদনার নাম।
ছুটির ঘণ্টা শব্দটি শোনামাত্র শ্রেণিকক্ষে এক অদ্ভুত পরিবর্তন ঘটে। শিক্ষার্থীদের ক্লান্ত চোখে ঝিলিক দিয়ে ওঠে মুক্তির আনন্দ, অথচ কোথাও যেন হালকা করে জেগে ওঠে এক অজানা বিষণ্নতা। কারণ, প্রতিটি ছুটির ঘণ্টা একেকটি অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি।
বাংলাদেশসহ উপমহাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই ছুটির ঘণ্টা একটি দীর্ঘ ঐতিহ্যের অংশ। প্রায় শতবর্ষ ধরে এটি সময় নির্দেশক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আগে হাতের চাকা ঘোরানো লোহার ঘণ্টা বাজিয়ে সময় ঘোষণা করা হতো। শিক্ষার্থী কিংবা দপ্তরি একটি নিদিষ্ট সময়ে এসে কর্কশ অথচ পরিচিত সুরে ঘন্টাটি বাজাতো। আধুনিক কালে এই ঘণ্টা ইলেকট্রিক বেল কিংবা অটো সিস্টেমে রূপান্তরিত হলেও, তার আবেদন এতটুকুও কমেনি।
সাহিত্যের পাতায়ও ছুটির ঘণ্টার ছায়া রয়েছে। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের “পথের পাঁচালী”-তে স্কুলের ঘন্টা একটি সামাজিক কাঠামোর প্রতীক হয়ে উঠে আসে। কবি জীবনানন্দ দাশ কিংবা সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতায় সেই ছুটির ঘণ্টা কখনো মুক্তি, কখনো শৈশবের রূপক হয়ে উঠেছে।
ছুটির ঘণ্টা শব্দটি যেন চিহ্নিত করে একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির শেষ সীমা—যেখানে বিদ্যার সাধনার অন্ত হয়, আর শুরু হয় অপেক্ষাকৃত অবাধ জীবনের। মাঠে দৌড়ে যাওয়া, খেলায় মেতে ওঠা, বইয়ের ব্যাগ কাঁধে ফেলে মুক্ত বাতাসে হাঁটা—সবকিছুর সূচনা ঘটে ওই একটিমাত্র ধ্বনির মাধ্যমে।
কিন্তু বছর পেরিয়ে গেলে, জীবন তার গতিপথে আমাদের যখন নিয়ে যায় বহুদূর, তখন সেই একঘেয়ে ঘণ্টাধ্বনি হয়ে ওঠে হৃদয়ের সবচেয়ে কোমলতম স্মৃতি। তখন মনে হয়—কখনো কি আর বাজবে সেই ঘণ্টা? আমরা কি আর ফিরে পাব সেই ছুটির ঘণ্টার পর বন্ধুর হাসি, শিক্ষকের স্নেহের দৃষ্টি, কিংবা স্কুলবাড়ির ছায়াঘেরা বারান্দা?
এই ঘন্টার শব্দ হয়তো ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু তার রেশ থেকে যায় হৃদয়ের গভীরে—চিরকাল, চিরস্মরণীয়।
নিকলী পরিক্রমা