12/05/2025
পুরুষবিদ্বেষী (misandrist) এই সমাজে পুরুষ হয়ে জন্মানোটাই যেন একজন পুরুষের সবচেয়ে বড় অপরাধ। পুরুষ হয়ে জন্মানোর অপরাধে প্রাণ দিতে হল এএসপি পলাশ সাহাকে।
বিয়ে করার পর পুরুষের আত্মাটা মরে যায়, থাকে শুধু দেহটা, সবার চাওয়া পাওয়ার একটা জীবন্ত লাশ হয়ে।
বিবাহিত বাঙালি পুরুষের জলন্ত উদাহরণ হচ্ছেন এএসপি পলাশ সাহা, ডাক্তার আকাশ, পুলিশ সদস্য আব্দুল কুদ্দুস, অ্যাডভোকেট রথীশ চন্দ্র বাবুসোনা, রিফাত শরীফ প্রভৃতি।
রংপুর জেলা জর্জ কোর্টের পিপি, অ্যাডভোকেট রথীশচন্দ্র বাবুসোনাকে ঘুমের ঔষধ খাইয়ে, তাঁর পরকীয়া আসক্ত স্ত্রী স্নিগ্ধা সরকার দীপা, পরকীয়া প্রেমিক কামরুল ইসলামের সহায়তায় শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। হত্যাকান্ডে সহায়তার অভিযোগে কামরুল ইসলামকে গ্রেফতার করে পুলিশ। কিন্তু এর দশমাস পর কারাগারেই রহস্যজনক মৃত্যু হয় কামরুলের। খুনি স্নিগ্ধা তার স্বামীকে খুনের কথা স্বীকার করেছে আদালতে। আদালত স্নিগ্ধাকে ফাঁসির রায় দিয়েছে ২০১৯ সালে। রায়ের ৬ বছর হয়ে গেল, কিন্তু কার্যকর হয়নি।
ডাক্তার মিতু অত্যন্ত ধূর্ততার সহিত উচ্চ কাবিন লিখিয়ে নিয়ে বিয়ে করে ডাক্তার আকাশকে। আকাশ ঘুনাক্ষরেও টের পায়নি উচ্চকাবিন লেখানোর পিছনে মিতুর আসল মতলব। বিয়ের পর থেকেই একের পর এক পরকীয়া এবং ব্যাভিচার চালিয়ে যায় ডাক্তার মিতু। একই সাথে চারজন পুরুষের সাথে অনৈতিক সম্পর্ক থাকার কথা স্বীকার করেন মিতু। স্ত্রী মিতুর চারিত্রিক সমস্যার কথা জানার পরও কিছুই করার থাকে না স্বামী ডাক্তার আকাশের। না পারছে একটা দুশ্চরিত্রার সাথে ঘর করতে, না পারছে ডিভোর্স দিতে।
একদিকে উচ্চকাবিনের বোঝা, আরেকদিকে চোঁখের সামনে দেখতে হচ্ছে অন্য পুরুষের সাথে, নিজ বউয়ের প্রকাশ্যে প্রেমলীলা। মানসিক যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে অবশেষে প্রাণ দিতে হল হতভাগা আকাশকে।
স্ত্রী ও শাশুড়ীর অত্যাচার সইতে না পেরে প্রাণ দিতে হয়েছিল পুলিশ সদস্য আব্দুল কুদ্দুসকে।
বরগুনায় তুচ্ছ ঘটনার জের ধরে, রিফাত শরীফের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি, তাঁর প্রাক্তন প্রেমিক নয়ন বন্ডকে সাথে নিয়ে, পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী স্বামী রিফাত শরীফকে কু'পিয়ে হ'ত্যা করে। তদন্ত ও প্রমাণ সাপেক্ষে আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর মিন্নির বিরুদ্ধে ফাঁসির রায় দেয় মহামান্য আদালত। রায়ের ৫ বছর পার হয়ে গেছে, অথচ এখন পর্যন্ত ফাঁসি কার্যকর হয়নি মিন্নির।
পুরুষবিদ্বেষী এই সমাজে পুরুষ হয়ে জন্মানোটাই যেন একজন পুরুষের সবচেয়ে বড় অপরাধ।
পুরুষ হয়ে জন্মানোর অপরাধে প্রাণ দিতে হল এএসপি পলাশ সাহাকেও।
‘এএসপি পলাশ সাহার গায়ে হাত তোলেন স্ত্রী সুস্মিতা সাহা’ শিরোনামে গত ৭ মে ২০২৫, দৈনিক যুগান্তরে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। যুগান্তরে প্রকাশিত উক্ত সংবাদে বলা হয়...
"চট্টগ্রাম র্যাব কার্যালয়ের এএসপি পলাশ সাহার আ'ত্ম'হ'ত্যা'র কারণ জানিয়েছেন তার মেজো ভাই নন্দলাল সাহা। তিনি জানান, পলাশ সাহার গায়ে হাত তোলেন তার স্ত্রী সুস্মিতা সাহা। এর জন্য ক্ষোভে সে আ'ত্ম'হ'ত্যা করে।
বুধবার চট্টগ্রাম র্যাব কার্যালয়ের নিজ অফিস থেকে পলাশ সাহার 'লা'শ' উদ্ধার করা হয়। মৃত পলাশ সাহার লাশের পাশ থেকে একটি চিরকুট পাওয়া যায়। তিনি র্যাব-৭ এ কর্মরত ছিলেন। পলাশ সাহা গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়া উপজেলার তারাশী গ্রামের মৃত বিনয় কৃষ্ণ সাহার ছেলে।
এএসপি পলাশ সাহার মেজো ভাই নন্দ লাল সাহা বলেন, ২ বছর আগে ফরিদপুরের চৌধুরীপাড়ায় পলাশের বিয়ে হয়। বিয়ের ৬-৭ মাস পর থেকে তাদের পারিবারিক কলহ লেগেই থাকত। প্রতিদিন কিছু না কিছু নিয়ে পলাশের স্ত্রী সুস্মিতা সাহা পরিবারে ঝামেলা করত। আমার মা আরতি সাহা পলাশের সঙ্গে চট্টগ্রামে থাকত; এটা পলাশের স্ত্রী মেনে নিতে পারত না। সে সব সময় মাকে গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য পলাশকে চাপ প্রয়োগ করত। পলাশ কিছুতেই মাকে বাড়িতে পাঠিয়ে দিতে চাইত না। সে মা ও তার স্ত্রী দুজনকেই ভালোবাসতো।
তিনি বলেন, বুধবার সকালে সামান্য বিষয় নিয়ে আমার মা আরতি সাহা ও ভাই পলাশ সাহার গায়ে হাত তোলে সুস্মিতা সাহা। এটা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেনি আমার ভাই। আর এ কারণেই আমার ভাই পলাশ সাহা আত্মহত্যা করেছে বলে আমাদের ধারণা।
উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম নগরীর চান্দগাঁও থানার র্যাব-৭ এর চান্দগাঁও ক্যাম্পে কর্মরত স্কোয়াড কমান্ডার সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) পলাশ সাহা অফিস কক্ষে নিজের ব্যবহৃত পিস্তল দিয়ে আত্মহত্যা করেন। বুধবার বেলা ১১টা ৫০ মিনিটের দিকে এ ঘটনা ঘটেছে। এ সময় তার কক্ষ থেকে একটি চিরকুটও উদ্ধার করা হয়। চান্দগাঁও থানার ওসি আফতাব উদ্দিন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
লা'শে'র পাশ থেকে উদ্ধার করা চিরকুটে লেখা আছে- ‘আমার মৃ'ত্যু'র জন্য মা এবং বউ- কেউ দায়ী না, আমিই দায়ী। কাউকে ভালো রাখতে পারলাম না। বউ যেন সব স্বর্ণ নিয়ে যায় এবং ভালো থাকে। মায়ের দায়িত্ব দুই ভাইয়ের ওপর। তারা যেন মাকে ভালো রাখে। স্বর্ণ বাদে যা আছে তা মায়ের জন্য। দিদি যেন কোঅর্ডিনেট করে।’
চিরকুটে করা অছিয়তে স্বর্ণের কথা উল্লেখ করায়, অন্তত এটা অনুমান করা যায় যে, স্ত্রী সুস্মিতা তার স্বামী পলাশের জীবদ্দশায় তাঁর কাছে স্বর্ণ-গহনা দাবি করত, এবং এই ব্যাপারে চাপে রাখত।
একজন পুরুষকে তাঁর মৃত্যুর ঠিক পূর্বমুহূর্তেও তার সারাজীবন মাথার ঘাম পায়ে ফেলে শরীরের রক্ত পানি করে উপার্জন করা সম্পত্তি বউ আর মা-বোনের মধ্যে ভাগ বাটোয়ারা করে দিয়ে যেতে হচ্ছে, কারণ এতদিনের দাম্পত্য জীবনে তুচ্ছ বিষয় নিয়ে পরিবারের নারী সদস্যদের মধ্যে প্রতিদিন একটার পর একটা মেয়েলি ঝগড়া মিটমাট করতে করতে সে ভালো করেই বুঝে গেছে যে, তাঁর মৃত্যুর পরেও ওরা ঠিক একই কাজ করবে। এএসপি পলাশ সাহার ধারণাকে সত্যি প্রমাণিত করে দিয়ে এখনো মিডিয়ার সামনে এসে মা আর বউ একে অপরের নামে অভিযোগ করে যাচ্ছে।
মৃত পলাশ সাহার স্ত্রী সুস্মিতা সাহা কালের কন্ঠকে দেওয়া এক ভিডিও সাক্ষাৎকারে তার শাশুড়ী আরতি সাহার বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেন, স্বামী বাজার থেকে মাছ নিয়ে এলে শাশুড়ী নাকি সেই মাছ বউকে কুটতে দিতেন না। শাশুড়ী নিজেই কুটে ধুয়ে রান্না করতেন, এবং আগেই বড় বড় পিসগুলো খেয়ে ফেলতেন। পরে সবাই একসাথে খেতে বসলে ছেলের থালায় বড় পিস দিয়ে নিজে ছোট দেখে একটা পিস নিতেন ছেলের সামনে ভালো সাজার জন্য।
এই ব্যাপারে মিঠুন রায় নামের এক ব্যক্তি বলেন,
পলাশ দাদা যে কতটা মানসিক চাপে ছিলো তা ওনার মা আর বউ এর ভিডিও সাক্ষাৎকারগুলো না দেখলে বুঝতাম না। দুজনেই সমানে সমান। কেউ কারো চেয়ে কম না। এখনকার দিনে বাহিনীতে চাকরি করা যতটা চাপের তা যারা করে তারা জানে, তারপর দিনশেষে মানসিক প্রশান্তির বদলে এমন ছোট ছোট বিষয় নিয়ে যদি বৌ আর মায়ের কাছ থেকে একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ আর পাল্টা অভিযোগ শুনতে হয় তাহলে তার মানসিক অবস্থাটা কোন পর্যায়ে চলে যায় সে-ই ভালো জানেন....
রাহুল গুপ্ত বলেন, মা বলেন আর বউ বলেন, একটাও ভাল না। যদি ভাল হইত তাইলে স্বামী সন্তানের শোকে দুইজনেই নির্বাক থাকতো অন্তত কয়টা দিন,
পাল্টাপাল্টি অভিযোগের প্রলাপ বকতোনা, যেই প্রলাপগুলো পলাশ সাহাকে জীবিত অবস্থায় দুজনের মুখ থেকেই প্রতিনিয়ত শুনতে হতো। একদিকে দায়িত্বের চাপ, অন্যদিকে দিনশেষে মা-বউয়ের পাল্টাপাল্টি নালিশের চাপ, আহা পলাশ স্যার! আপনি জিতেছেন, আপনি নরক থেকে মুক্তি পেয়েছেন।
রিপন মল্লিক বলেন, এই জ্বালা যে শুধুমাত্র পলাশ সাহার ভিতরেই ছিল তা নয়, বরং বাংলাদেশের ৯০% পুরুষকেই ফেস করতে হয় এই জ্বালা। কারো কম, কারো বেশি। আসলে আমরা না পারি বৌ-এর দিকে যেতে না পারি মায়ের দিকে যেতে। এই দুই এর মধো পরে শেষমেষ 'মৃ'ত্যু'।
পুরুষবিদ্বেষী (misandrist) এই সমাজে পুরুষ হয়ে জন্মানোটাই যেন একজন পুরুষের সবচেয়ে বড় অপরাধ। পুরুষ হয়ে জন্মানোর অপরাধে প্রাণ দিতে হল এএসপি পলাশ সাহাকে।
খালিদ মাহমুদ তন্ময়
সংগঠক,
এইড ফর মেন ফাউন্ডেশন
কেন্দ্রীয় সংসদ।