01/06/2026
দেওয়ানী মামলা কেন এত দিন ধরে চলে?
দেওয়ানী মামলা (Civil Case) সাধারণত জমি-জমা, সম্পত্তি, চুক্তি, উত্তরাধিকার, দখল, সীমানা বিরোধসহ বিভিন্ন ব্যক্তিগত অধিকার সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য করা হয়। বাংলাদেশে অনেক দেওয়ানী মামলা বছরের পর বছর চলতে দেখা যায়। এর পেছনে বিভিন্ন আইনগত, প্রশাসনিক ও বাস্তব কারণ রয়েছে।
১. মামলার সংখ্যা বেশি, আদালত কম
বাংলাদেশে দেওয়ানী মামলার সংখ্যা অনেক বেশি, কিন্তু সেই তুলনায় বিচারক ও আদালতের সংখ্যা কম। ফলে এক আদালতে হাজার হাজার মামলা জমে থাকে এবং প্রতিটি মামলার শুনানির জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়।
২. বারবার সময় (Adjournment) নেওয়া
অনেক ক্ষেত্রে বাদী বা বিবাদী পক্ষ বিভিন্ন কারণে বারবার সময় প্রার্থনা করে। আদালত কখনও কখনও সেই আবেদন মঞ্জুর করলে মামলার কার্যক্রম বিলম্বিত হয়।
৩. সাক্ষী উপস্থিত না হওয়া
দেওয়ানী মামলায় সাক্ষীর বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সাক্ষী নির্ধারিত দিনে আদালতে উপস্থিত না হলে নতুন তারিখ দিতে হয়, ফলে মামলা দীর্ঘায়িত হয়।
৪. জমির কাগজপত্র ও রেকর্ড জটিলতা
জমি সংক্রান্ত মামলায় দলিল, খতিয়ান, পর্চা, নকশা, নামজারি, খাজনার রসিদসহ বিভিন্ন নথি যাচাই করতে হয়। অনেক সময় এসব নথিতে অসঙ্গতি থাকলে বা বিভিন্ন অফিস থেকে তথ্য আনতে হলে মামলা দীর্ঘ হয়।
৫. জরিপ ও কমিশন রিপোর্ট
অনেক জমি সংক্রান্ত মামলায় আদালত স্থানীয় তদন্ত বা কমিশনার নিয়োগ করে জমি পরিমাপ ও রিপোর্ট নিতে পারেন। এই প্রক্রিয়ায়ও অনেক সময় লাগে।
৬. আপিল ও পুনর্বিবেচনার সুযোগ
দেওয়ানী মামলায় নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল, রিভিশন বা অন্যান্য আইনগত প্রতিকার নেওয়ার সুযোগ থাকে। ফলে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হতে অনেক বছর লেগে যেতে পারে।
৭. পক্ষগুলোর ইচ্ছাকৃত বিলম্ব
কিছু ক্ষেত্রে কোনো পক্ষ মামলার নিষ্পত্তি বিলম্বিত করার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন আবেদন, আপত্তি বা নতুন মামলা দায়ের করে। এতে মূল মামলার অগ্রগতি ধীর হয়ে যায়।
৮. নথি সংগ্রহে বিলম্ব
সরকারি অফিস, ভূমি অফিস, সাব-রেজিস্ট্রি অফিস বা অন্যান্য প্রতিষ্ঠান থেকে প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ করতে অনেক সময় লাগতে পারে।
৯. আইনজীবী পরিবর্তন বা অনুপস্থিতি
মাঝপথে আইনজীবী পরিবর্তন, অসুস্থতা বা অনুপস্থিতির কারণেও শুনানি পিছিয়ে যেতে পারে।
১০. বিচারিক প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপ
একটি দেওয়ানী মামলায় সাধারণত—
মামলা দায়ের
সমন জারি
লিখিত জবাব
ইস্যু নির্ধারণ
সাক্ষ্য গ্রহণ
জেরা
যুক্তিতর্ক
রায়
ইত্যাদি ধাপ সম্পন্ন করতে হয়। প্রতিটি ধাপে নির্দিষ্ট সময় লাগে।
মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য করণীয়
১. সব কাগজপত্র শুরুতেই সঠিকভাবে প্রস্তুত করা।
২. নির্ধারিত তারিখে আদালতে উপস্থিত থাকা।
৩. অপ্রয়োজনীয় সময় প্রার্থনা না করা।
৪. সাক্ষীদের সময়মতো হাজির করা।
৫. আদালতের নির্দেশ দ্রুত পালন করা।
৬. আপস-মীমাংসার সুযোগ থাকলে তা বিবেচনা করা।
দেওয়ানী মামলা দীর্ঘদিন চলার প্রধান কারণ হলো মামলার জট, প্রমাণ সংগ্রহের জটিলতা, বারবার সময় নেওয়া, সাক্ষী ও নথির সমস্যা এবং আপিলের সুযোগ। তবে সঠিক প্রস্তুতি, প্রয়োজনীয় নথি সংরক্ষণ এবং আদালতের নির্দেশনা যথাসময়ে অনুসরণ করলে মামলার অযথা বিলম্ব অনেকাংশে কমানো সম্ভব।