10/07/2026
ফুটবল বিশ্বকাপ উন্মাদনা: কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে মুসলিম উম্মাহ?
Al-itisam
اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ وَحْدَهُ وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلٰى مَنْ لَّا نَبِيَّ بَعْدَهُ
মানুষ মহান আল্লাহর শ্রেষ্ঠতম সৃষ্টি। মহান আল্লাহর অন্য সকল সৃষ্টির স্বাধীনতা অনেক সীমাবদ্ধ। পশু-প্রাণী থেকে শুরু করে ফেরেশতা পর্যন্ত সবাই মহান আল্লাহর নির্ধারিত একটি সীমার মধ্যেই চলাফেরা করে। শুধু মানুষকে অতিরিক্ত স্বাধীনতা প্রদান করা হয়েছে। পাশাপাশি অতিরিক্ত জ্ঞানও প্রদান করা হয়েছে। আর এই যোগ্যতার কারণে পৃথিবীর দায়িত্বও মানুষের উপর ন্যস্ত করা হয়েছে। পৃথিবীর সকল কিছু মানুষের অধীন করে দেওয়া হয়েছে। মানুষের জ্ঞান যেন তার স্বাধীনতাকে মহান আল্লাহর অনুগত রাখে এবং মানুষ যেন পৃথিবীর দায়িত্বশীল হিসেবে পৃথিবীতে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করে—এটিই মহান আল্লাহর চাওয়া।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, শয়তান মানুষকে তার এই মূল উদ্দেশ্য থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে চায়। মানুষের জীবনের মহৎ উদ্দেশ্যকে সামান্য বিনোদন ও খেলাধুলার মধ্যে সীমাবদ্ধ করতে চায়। যেন মানুষ অন্য পশু-প্রাণীর মতো পৃথিবীতে একটি সীমাবদ্ধ দাসের জীবনযাপন করে। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত খাওয়া ও ফুর্তি করা ছাড়া তার আর কোনো করণীয় নেই। আর শয়তান তার এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য মানুষকে মৃত্যুর কথা ভুলিয়ে রাখতে চায়। তাকে নেশা, জুয়া, খেল-তামাশা ইত্যাদিতে এমনভাবে উন্মত্ত করে ফেলে যে, মানুষ নিজের বিবেকবোধের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে এবং মৃত্যু-পরবর্তী চিন্তা ভুলে যায়।
তবে শয়তানের এই প্রজেক্টে যুগে যুগে বাধা হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন নবী-রাসূলগণ। যাঁরা মানুষকে শত বিনোদনের মধ্যেও পরকালের কথা স্মরণ করাতেন। মানুষ সৃষ্টির প্রকৃত উদ্দেশ্য স্মরণ করাতেন। সেই ধারাবাহিকতায় এই দায়িত্ব এখন উম্মাতে মুহাম্মাদীর উপর। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, উম্মাতে মুহাম্মাদীর একটি বড় অংশ আজ শয়তানের ষড়যন্ত্রের বেড়াজালে নিজেকে ধরা দিয়েছে। যার অন্যতম জ্বলন্ত উদাহরণ ফুটবল বিশ্বকাপ।
খেলাধুলা ইসলামে অবশ্যই জায়েয। তবে খেলাধুলা কখনোই জীবনের উদ্দেশ্য বা জীবনের পেশা হতে পারে না। মানুষের দায়িত্ব খেলাধুলার চেয়েও অনেক মহৎ। খেলাধুলা কখনোই টাকা উপার্জনের মাধ্যম হতে পারে না। যে খেলায় শারীরিক কোনো পরিশ্রম নেই, সেগুলোও জুয়ার অন্তর্ভুক্ত। আর এই সকল হারামের উপস্থিতি থাকে বিশ্বকাপে। একদিকে খেলার প্রতি মুহূর্তের উপর চলে জুয়া ও বাজি। যেমন, শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই প্রায় ২ কোটি ৫ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি মোট ১.৮ বিলিয়ন ডলার বাজি ধরে থাকেন বলে American Gaming Association বিশ্বকাপ টুর্নামেন্ট শুরুর আগে অনুমান করেছে।
২০২৫ সালের মে মাসে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ—CID—অনলাইন জুয়া ও বেটিংয়ের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী অভিযান শুরু করে। CID জানায়, জুয়ার লেনদেনে সম্পৃক্ততার প্রমাণসহ এক হাজারের বেশি মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস এজেন্ট শনাক্ত করা হয়েছে। সংস্থাটি আরও সতর্ক করেছে, সহজে অর্থ উপার্জনের আশায় অনেকে আসক্ত হয়ে আর্থিকভাবে নিঃস্ব হচ্ছে; অপরাধ, পারিবারিক সহিংসতা এবং আত্মহত্যার মতো ঘটনাও ঘটছে।
একদিকে যেমন জুয়ায় আসক্ত যুবসমাজ, অন্যদিকে স্বাভাবিক দর্শক হিসেবেও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা খেলা দেখতে ও খেলা নিয়ে অযথা তর্ক-বিতর্কে প্রচুর সময় নষ্ট করে থাকে। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বড় স্ক্রিন লাগিয়ে ধুমধাম করে খেলা দেখার আয়োজন হয়ে থাকে। অথচ যারা আজকের বিশ্বের মোড়ল, তাদের বিশ্ববিদ্যালয়—যেমন হার্ভার্ড, অক্সফোর্ড ও ক্যামব্রিজে—এই ধরনের কোনো চিত্র দেখা যায় না। বরং ইয়াহূদী সমাজে এর উল্টো চিত্রই দেখা যায়।
বিশ্বের মোট জনসংখ্যার মাত্র ০.২ শতাংশ ইয়াহূদী। অথচ ১৯০১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত মোট নোবেল পুরস্কারের ২২ শতাংশ পেয়েছেন ইয়াহূদীরা। পদার্থবিদ্যায় ২৪ শতাংশ, চিকিৎসাবিজ্ঞানে ২৬ শতাংশ, অর্থনীতিতে ৪০ শতাংশ। অন্যদিকে মুসলিমরা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ২৫.৮ শতাংশ। কিন্তু বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারের মাত্র ২.৩৮ শতাংশ পেয়েছেন মুসলিমরা। দেড়শ কোটি মানুষের বিপরীতে মাত্র মুষ্টিমেয় বিজ্ঞানী। এই সংখ্যা লজ্জার নয়, এটি সতর্কতার সংকেত।
ইয়াহূদীরা সামাজিক ও পারিবারিকভাবে প্রচুর পরিমাণে শিক্ষাকেন্দ্রিক। অথচ আফসোস করে বলতে হয়, বাংলাদেশের বাড়িতে বাড়িতে বিশ্বকাপের বিভিন্ন দেশের পতাকা ঝুলছে। গাযার শিশুগুলোর গায়ে তার প্রিয় খেলোয়াড়ের জার্সি শোভা পাচ্ছে। ক্ষুধার্ত পেটে তারাও মেতে উঠছে বিশ্বকাপ উন্মাদনায়। অথচ ঠিক তার উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে ইয়াহূদী ও খ্রিষ্টান সমাজে। এই যদি হয় এই উম্মতের অবস্থা, তাহলে মুক্তি কোথায়?
যে সমাজে ৩৯ দিনের একটি ফুটবল টুর্নামেন্ট জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে, সেখানে কতটুকু আলোচনা হয় জ্ঞান, গবেষণা, দাওয়াহ, সমাজ নির্মাণ নিয়ে? যে তরুণ রাত তিনটায় গোল দেখে চিৎকার করে, সে কি বিকেল চারটায় লাইব্রেরিতে বসে? যে পরিবার একসঙ্গে বিশ্বকাপ দেখে, সে পরিবারে কুরআনের তেলাওয়াত কতক্ষণ?
ইসলামের স্বর্ণযুগে মুসলিম বিজ্ঞানীরা বীজগণিত আবিষ্কার করেছেন, অপটিক্স লিখেছেন, মানচিত্র এঁকেছেন, হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেছেন। ইবনু সিনা, আল-বিরুনী, ইবনুল হাইসাম—তাঁরা সময় নষ্ট করেননি। তাঁরা দেখেছিলেন কুরআনের সেই আহ্বান—‘পড়ো, তোমার রবের নামে’।
সেই আহ্বান আজও বলবৎ। প্রশ্ন হলো, আমরা শুনছি কি?
বিশ্বকাপের হইচই যখন থামবে, মাঠের ঘাস শুকিয়ে যাবে, বিজয়ীর উল্লাস মিলিয়ে যাবে—তখনও থাকবে সেই একই প্রশ্ন: উম্মাহ কোথায় যাচ্ছে? কোন খাতে তার সময়, মেধা ও শক্তি ব্যয় হচ্ছে? যে জাতি নিজের ইতিহাস ভুলে অন্য দেশের দলের জয়ে মাতে, সেই জাতির নিজস্ব বিজয়ের দিন কবে আসবে?
একটি ম্যাচের জয়-পরাজয়ে যদি আমাদের ঘুম হারিয়ে যায়, একটি বিদেশি দলের পতাকা টানাতে যদি আমাদের অস্বাভাবিক অর্থ ব্যয় হয়, ফজরের ছালাত, পড়াশোনা, পরিবার এবং দায়িত্ব যদি পিছিয়ে যায়, সামাজিক সমস্যার চেয়ে খেলোয়াড়ের ইনজুরি যদি আমাদের বেশি বিচলিত করে, তাহলে থামতে হবে।
প্রশ্ন করতে হবে— আমরা বিনোদন করছি, নাকি ধীরে ধীরে বিনোদনের দাসে পরিণত হচ্ছি? (প্র. স.)