10/06/2023
সিরাজুল আলম খান দুইটি ঐতিহাসিক ভূমিকার জন্য বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
প্রথমত,
পূর্ববাংলায় সকল পাকিস্তান বিরোধী প্রপাগাণ্ডা চালিয়ে জনমনে ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মনকে স্বাধীনতা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করেছিলেন বামপন্থীরা এবং মাওলানা ভাসানী। কিন্তু বাংলাদেশের বামপন্থীরা ঠিক ইউরোপের বামপন্থীদের মতো নন। ইউরোপীয় বামপন্থীরা কয়েকটি দর্শনের ভেতর থেকে চিন্তাভাবনা করে বামপন্থাকে বা মার্কসবাদকে বেছে নিয়েছেন। বাংলাদেশে ইউরোপীয় দর্শনের চর্চা খুব আগ্রহী এক দুজন বিরল দর্শনাগ্রোহী মানুষ ছাড়া কেউই করেন নি। অন্যদিকে ভারতীয় দর্শনের গভীর ও সমৃদ্ধ উত্তরাধিকার থেকেও বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত বৃটিশ আমল থেকে বিচ্ছিন্ন। তাই মার্কসের চিন্তাধারাকে নানাধাঁচের চিন্তার ভেতরে তুলনামূলক পর্যালোচনায় গ্রহন করার মতো জ্ঞান বা শিক্ষা এদের ছিলোনা। এদের কাছে বামপন্থা ছিলো প্রগতিশীলতার এক বিকল্পহীন দার্শনিক অবলম্বন।তাই মার্কসবাদ এখানে জনপ্রিয়তা লাভ করে দ্রুত। আর এদেরকে সেই অবলম্বনটি উপহার দিয়েছিলো রাশিয়া তথা প্রগতি প্রকাশনী। পৃথিবীর প্রায় সব অ-ইউরোপীয় দেশের জন্যেই একথা সত্য।
আর মার্কসবাদ এখানে সরবরাহ করেছিলো রাশিয়া ও তার প্রগতি প্রকাশনী। তাই ওই দেশটিকে এরা নিজেদের চিন্তার মুক্তি দাতার সম্মান দিত। কিন্তু রাশিয়ার বেশিরভাগ এশিয়ায় থাকলেও দেশটি ইউরোপীয়, সাদা,ভাইকিংস। তাই চীনের প্রাচ্যীয় পটভূমিতে বিপ্লব করে নতুন মুক্তিদাতা হয় মাওয়ের চীন। এইজন্য এই দুই শক্তির ঝামেলা লাগার পর বামেরা বাংলাদেশে দুইভাগ হয়ে যায়। মূল কমিউনিস্ট পার্টি বা বিভক্ত দুইধারা, মানে রুশ পন্থী আর চীন পন্থী কমিউনিস্ট পার্টি, এদের কারোই বাংলাদেশের স্বাধীনতা নিয়ে কোন ইচ্ছা, পরিকল্পনা কিছুই ছিলো না। যদিও ভাষা আন্দোলনের পরে তাদের ব্যপক সাংস্কৃতিক কার্যক্রম এবং বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলনে অগ্রনী ভূমিকা স্বাধীনতার ক্ষেত্র প্রস্তুত করে। ১৯৫২ সালের পর থেকে বাংলাদেশের বেশিরভাগ ক্যাম্পাসের ছাত্র সংসদ ছিলো ছাত্র ইউনিয়নের দখলে। ছাত্র ইউনিয়নের কাজের ফলে মধ্যবিত্তশ্রেণীর থেকে ৪০এর দশকের ইসলামী জাতীয়তাবাদী জোশ বিলুপ্ত হয়ে যায়। অবশ্য এর গ্রাউন্ড ৫২এর ভাষা আন্দোলন আর যুক্ত ফ্রন্ট গঠনেই তৈরি হয়ে গেছিলো। কৃতিত্ব একা ছাত্র ইউনিয়নের না।
সিরাজুল আলম খানের প্রথম ভূমিকা হচ্ছে তিনি সমাজতান্ত্রিক চিন্তার হয়েও বুঝতে পেরেছিলেন কমুনিস্টদের দিয়ে স্বাধীনতা হবেনা। এরা মূল শক্তি হলে আমরা এখনো বেলুচিস্তান হয়ে থাকতাম; কারণ এরা কখনোই বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেনি। আর দলীয় কাঠামোতে এরা এতোটাই ফ্যাসিস্ট যে নতুন কোন স্বাপ্নিকের স্বপ্ন গ্রহনের সক্ষমতাও এদের নেই। এজন্য এদের উপর ভরসা করে মাওলানা ভাসানী বেশিদূর এগুতে পারেন নি। সিরাজ আওয়ামীলীগে যোগদেন।আওয়ামিলীগে ছয়দফা বাস্তবায়ন না হলে স্বাধীনতা আসতো না। কারণ মুজিব কখনোই পাকিস্তান বিরোধী নেতা ছিলেন না, তিনি পশ্চিম পাকিস্তানিদের একজন পছন্দের নেতাই ছিলেন। কিন্তু ছয়দফা আসলে পাকিস্তানিদের বাধ্য করেছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে সামরিক অভিযানে যেতে। আর সিরাজুল আলম খানের নিউক্লিয়াস ভূমিকা না নিলে ছয়দফা বাতিল হয়ে যেতো আওয়ামীলীগে কারণ ওই দলের বড় সংখ্যক নেতারাই ছয়দফার বিরোধিতা করে। সিরাজ ছাত্রলীগের ভেতরে নিউক্লিয়াস বানিয়েছিলেনই বাংলাদেশ স্বাধীন করার জন্য। আওয়ামীলীগ হচ্ছে মুসলিমলীগারদের পার্টি। আর মুসলিমলীগারদের ভেতরে ছিলো তিন টাইপের লোক,১। মধ্যবিত্ত শহুরে উকিল-শিক্ষক-ব্যবসায়ী ; ২। গ্রামের জোতদার বা জমিদারি হারানো অভিজাত ৩। ছাত্র।
প্রথম দুই অংশের কেউই আসলে স্বাধীনতা চাইবেনা। সিরাজ তৃতীয় অংশটিকে বেছে নিয়ে এদের ভেতরেই গঠন করেন নিউক্লিয়াস; ছাত্রলীগের ভেতরে এমন এক গ্রুপ যারা স্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ চায়। সিরাজুল আলম খানের পরিকল্পনা কাজ করেছিলো। আওয়ামীলীগের নেতা কর্মীরা কখনোই স্বাধীনতা চায়নি, ষাটের আন্দোলনকে স্বাধীনতার দিকে টেনে নিয়ে এসেছে ছাত্রলীগ। আর ছাত্রলীগের ভেতরে থেকে ছাত্রলীগকে এই পথে ঠেলে দিয়েছে সিরাজের নিউক্লিয়াস। এটাই তার প্রথম ভূমিকা। তিনি নিউক্লিয়াস গঠন করে এই ভূমিকা না নিলে আওয়ামীলীগ পশ্চিম পাকিস্তানিদের সাথে আপোষ-রফা করে ক্ষমতায় বসে যেতো। এ কারণে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা।
দ্বিতীয়ত,
সিরাজের নেতৃত্বে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির আবির্ভাব হয়। তিনি তার নিউক্লিয়াস নিয়ে আওয়ামিলীগ থেকে বেরিয়ে আওয়ামীলীগ সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যান। এই রাজনৈতিক শক্তিটির অনেক ভুলভ্রান্তি ছিলো। কিন্তু এটির একটি অদ্ভুৎ রাজনৈতিক অবস্থান ছিলো। এটি ছিলো, জাতীয়তাবাদী, সমাজতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক এবং সরকার অমন নির্মম দমন-পীড়ন করে, রক্ষীবাহিনী গঠন করে খুন খারাপি শুরু করার আগ পর্যন্ত সমাজতান্ত্রিক। না, জাসদ লেনিনবাদী ছিলো না কিন্তু সমাজতান্ত্রিক ছিলো। এবং জাসদ ছিলো বাংলাদেশের উপর ভারতীয় সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে কার্যকর শক্তি। জাসদের একটি রাজনৈতিক লক্ষ্যও বাস্তবায়িত হয়নি। এবং দলটি বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
সিরাজুল আলম খান যেই দুইটি কারণে ইতিহাসে স্মরণীয় হবেন দুইটিতেই তিনি ব্যর্থ। প্রথমত, তিনি চেয়েছিলেন স্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ। বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক হয়নি। স্বাধীনও হয়নি; বাঙালী শাসক গদিতে বসাই স্বাধীনতা নয়। সেকালে সম্পদ পাচার হত পশ্চিম পাকিস্তানে আর এখন কানাডার বেগম পাড়ায়।এই ব্যর্থতায় ইতিহাসের মার, সিরাজের দায় এখানে নেই।
দ্বিতীয়ত জাসদ ব্যর্থ, তারা সমাজতন্ত্র আনতে পারেনি। তারা বিলুপ্ত হয়ে গেছে৷ এই ব্যর্থতায় তার অনেক ভুলই দায়ী। ষাটের দশকে তিনি যতোটা সফল সংগঠক ছিলেন, সত্তুরের পরিবর্তিত বাস্তবতায় ও প্রেক্ষাপটে তাঁর পরিকল্পনাগুলো আর কাজ করেনি। তার সিদ্ধান্তগুলো ভুল প্রমাণ হয়েছে।
তিনি ব্যর্থ পরাজিত হয়ে নীরবে আজ মারা গেছেন। কিন্তু তার ব্যর্থতা, শুধু তার ব্যর্থতা নয়। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে সাহসী ও যুদ্ধবাজ প্রজন্মের প্রধান নেতা। তার পরাজয় ওই প্রজন্মের ও তাদের স্বপ্নের পরাজয়। তিনি সফল হলে আমরা আজ এক ভিন্ন বাংলাদেশে বসবাস করতাম সন্দেহ নেই।
আজ একজন মহানায়কের প্রস্থান ঘটেছে যিনি ব্যর্থ ও পরাজিত। স্বাধীনতার এক বছরের মধ্যে যখন সবাই বুঝতে পারছিলো যে সবকিছু শেষ হয়ে গেছে, তখন জাসদ নাম নিয়ে আলোকছটার মতো জ্বলে উঠেছিলো সিরাজুল আলম খানের জাসদ। তাঁর পরাজয় শুধু তাঁর ব্যক্তিগত পরাজয় নয়; তিনি পরাজিত হবার সঙ্গে সঙ্গে পরাজিত হয়েছে বাংলাদেশও। এমন পরাজয় মহাকাব্যিক।
লেখা- মহাথেরো মুহাম্মদ