01/02/2024
শিরোনাম - ( স্বাস্থ্য ব্যবস্থা )
আপনি বা রোগী কেন সরাসরি ঔষধ , পরীক্ষা করতে টাকা খরচ কেন করবে ?
শুধু চিকিৎসা খরচ ইনসুরেন্স কোম্পানি দিবে, আর রোগীর স্বাস্থ্য বীমা থাকবে।যদি আসলেই স্বাস্থ্য বীমা থাকতো - তাহলে অনেকগুলো সমস্যা সাথে সাথে সমাধান হয়ে যেতো।যেমন চিকিৎসক অল্প পরীক্ষা দিলে, রোগী বলতো - কেন এত কম পরীক্ষা দিচ্ছেন, আমার সারা শরীর চেক-আপ করুন। ভালো আছি কিনা বলুন। অথবা বলতো এত সস্তা ঔষধ কেন লিখছেন?
দামি দামি, ভাল ঔষধ লিখুন।
চলুন সবার অভিযোগগুলো পর্যালোচনা করি -
১) চিকিৎসক রোগীদের সময় দেয় না। কিন্তু বেশির ভাগ রোগী, সেই চিকিৎসকদের কাছেই যান, যিনি ১০০-২০০ রোগী দেখেন। আর এত রোগী দেখতে গেলে আসলেই কি সময় দিয়ে দেখা সম্ভব?
যদি বলেন, চিকিৎসক কেন এত রোগী দেখবে? অথচ চেম্বারে রোগী কম দেখতে চাইলে, অনেক জায়গায়ই মারামারি হওয়ার সম্ভাবনা আছে। এদেশের একটি বিশাল শ্রেণীর মানুষ তৈরি হয়েছে - যারা সর্দি/ঠান্ডা লাগলেই অধ্যাপক ছাড়া রোগী দেখিয়ে মনে শান্তি পায় না। আবার কেউ কেউ আরেক কাঠি সরেস। কিছু হলেই ভারত দৌড়ায়। এর সহজ সমাধানও আছে। শুধু কঠোর ভাবে রেফারেল সিস্টেম চালু করা। অর্থাৎ একজন রোগী চাইলেও, যে কাউকে দেখাতে পরাবে না। এমন সহজ সমাধান থাকার পরও, কারো চোখে পড়ে না - আসলে সমস্যাটা কোথায়?
২) একটি রোগ পরিপূর্ণ ডায়াগনোসিস করে চিকিৎসা করতে গেলে যে পরিমাণ পরীক্ষা করার দরকার হয় ,এতগুলো পরীক্ষা করলে, এই জাতি ডাক্তারকে সোজা কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে।আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়, এই পরীক্ষা করার টাকা যদি রোগীর পরিবারকে না দিতে হতো - তাহলে নিশ্চিত কেউ পরীক্ষায় বাঁধা প্রদান করতো না।এছাড়াও Routine test বলে কিছু পরীক্ষা মেডিকেলে বিদ্যমান। যার অর্থ কোন কারণ না থাকলেও, কিছু পরীক্ষা অবশ্যই করা উচিৎ। উদাহরণ হিসাবে একটা পরীক্ষার কথাই বলছি। কারো বয়স ৪০ বছর বা উর্ধ্বে হলে অবশ্যই ECG করানো যেকোন চিকিৎসকের দায়িত্ব। এমনই অনেক পরীক্ষা আছে যাকে Routine test বলে।যদি রোগীর নিজের পকেট থেকে এইসব পরীক্ষার ব্যয় বহন করতে না হতো - তাহলে কি আসলেই চিকিৎসক অযাচিত পরীক্ষা করায়, এমন অপবাদ রোগীরা দিতো?
৩) নোংরা সরকারি হাসপাতাল। এই অভিযোগ প্রায় সকল ব্যক্তিদের। এমন কি আমারও একই অভিযোগ। কিন্তু এর পিছনে আছে অনেকগুলো কারণ -
ক) হাসপাতালের ধারণ ক্ষমতার প্রায় তিনগুণ রোগী ভর্তি থাকে। অথচ সরকার, বেড সংখ্যা হিসাব করেই টয়লেট এবং অন্যান্য সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা করে। আবার এইসব রোগীদের সাথে থাকে আরো ৪-৫ গুণ বেশী attendance. ফলে এই অতিরিক্ত মানুষের চাপে হাসপাতাল পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
খ) চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের বদলি না হওয়া। এই বিষয়টি অতি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এরা দাদা, বাবা, চাচা, সন্তান দিনের পর দিন একই জায়গায় চাকরি করে যাচ্ছে। ফলে এদের শাসন করা বা বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া প্রায় অসম্ভব। এর প্রধান কারণ, এরা সংঘবদ্ধভাবে হাসপাতালে অনিয়ম করে যায়। রোগী হতে জোরপূর্বক টাকা আদায় এদের শিরায় শিরায় বিস্তৃত। হাসপাতাল প্রশাসন কোন ব্যবস্থা নিলে, একদিনে হাসপাতাল অচল করে দিবে। তখন জনগণই বলবে, হাসপাতাল চালানোর যোগ্যতা নাই হাসপাতাল প্রশাসনের।
এই চতুর্থ শ্রেণীর বদলির ব্যবস্থা থাকলে , হাসপাতালের ৬০ ভাগ সমস্যা অটোমেটিক সমাধান হয়ে যেতো ।
গ) প্রায় ১৫ বছর হাসপাতালে চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী নিয়োগ বন্ধ। ২০০৬ সালে হাসপাতালে যেখানে ৮-৯ জন চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী দেখে এসেছিলাম - সেখানেই ২০১৯ সালে ২-৩ জন কর্মচারী চাকরিরত ছিল (উপজেলা হাসপাতাল)। অবসরে যাওয়ার পর কোন নতুন নিয়োগ না থাকায় এমন হয়েছে।
ঘ) অনেক হাসপাতালেই ৪-৫ হাজার টাকায় (নিজস্ব ব্যবস্থাপণায়) কিছু চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী নিয়োগ দিয়ে কোনমতে হাসপাতাল পরিচালনা করছে। আর তাই এই অল্প বেতনে, কেন এরা চাকরি করে, সবার মনে প্রশ্ন আসে না? আসল সত্য হলো - এরাই রোগীদের জিম্মি করে ট্রলি ঠেলা বা রোগীকে একজায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিতে গেলে, জোরপূর্বক টাকা আদায় করে থাকে। আর কর্তৃপক্ষ দেখেও না দেখার ভান করে থাকে।
ঙ) জনগণের জমিদারী অভ্যাস - যেখানে সেখানে পানের পিক, ময়লা আবর্জনা, থুতু ইত্যাদি ফেলা । কোন চিকিৎসক বা কর্মচারী হাসপাতালে এধরণের অকাজ করে না। তাহলে কে করে, নিজেরা বুঝে নিন।
চ) আগেই বলেছি রোগী ভর্তি থাকে, বেডের অতিরিক্ত ৩-৪ গুণ। আর ঠিক সেই সময়েই চিকিৎসক/সেবিকা এবং অন্যান্য জনবল থাকে - নরমাল বেডের অনুপাতে প্রায় অর্ধেক। ফলে চিকিৎসার মান নিম্নগামী।
ছ) পৃথিবীর যে কয়েকটি দেশে চিকিৎসায় মাথাপিছু ব্যয় সর্বনিম্ন, বাংলাদেশ তারমধ্যে অন্যতম। আর এই ব্যয়ের সিংহভাগ খরচ করে কেনাকাটায়। বাকিটা বুঝে নিন। কারা এর ভাগ নেন - মোট কথা সবাই - হাসপাতাল প্রশাসক, তার বাহিনী , নেতা , সাংবাদিক ইত্যাদি । এটা আবার খুবই সুন্দর একটি ব্যবস্থা - ভাগাভাগি না করে কেউ একা খেতে পারেন না ।
অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের মতই চিকিৎসাও একটি মৌলিক অধিকার। তারপরও যেমন কেউ ফ্রিতে চাইলেও পায় না - ঠিক তেমনই চিকিৎসা মৌলিক অধিকার হলেও, কিছু ব্যয় আজও রোগীদের সরকারি হাসপাতালে বহন করতে হয়।
সব অপ্রতুলতায় , চিকিৎসা চলমান - আলহামদুলিল্লাহ বলেন।