29/05/2016
কাইকারটেক নৌকার হাট জমে উঠেছে
Tuesday, 17 May 2016 00:27
ডান্ডিবার্তা রিপোর্ট
বর্ষায় বাড়ির চারপাশে থইথই পানি, গেরস্ত বাড়ির মানুষের কোথাও যেতে নৌকাই একমাত্র ভরসা। মাছ শিকার, চরাঞ্চল ও বিল এলাকার মানুষের যাতায়াতের জন্য প্রতি বর্ষায় কদর বাড়ে নৌকার। তাই বর্ষা শুরু হওয়ার আগেই গ্রামের মানুষ নৌকা কিনতে ভিড় করেন কাইক্কারটেকে। নদী পথের বাহন হিসেবে একটা সময় কাঠের তৈরী নৌকার অনুপস্থিতি কল্পনা করা যেত না। তখন এ বাহনকে চালিয়ে নেওয়ার জন্য কাঠের তৈরী বৈঠা আর বাঁশের লগির ব্যবহার হতো। সময়ের পরিবর্তন আর প্রযুক্তির উৎকর্ষ সাধনের ফলে নৌ পথের এ বাহনটিতে এসেছে নানা পরিবর্তন। বর্তমানে নৌকায় ইঞ্জিনের ব্যবহার চলে এসেছে। গ্রামগঞ্জের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন হলেও এখন অনেক গ্রাম রয়েছে যেখানে যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে নৌকাই একমাত্র বাহন। এ বাহনকে কেন্দ্র করে আজও বসে নারায়ণগঞ্জে ঐতিহ্যবাহী নৌকার হাট। এখনও ক্রেতারা হাটে ভিড় জমায় তাদের পছন্দের নৌকাটি ক্রয় করে নেওয়ার জন্য। এমনিই একটি হাটের দেখা মিলবে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলার মোগরাপাড়া ইউনিয়নের ব্রহ্মপূত্র নদের তীর ঘেষে কাইক্কারটেক এলাকায়। প্রতি রোববার এ হাট বসে। এটি কাইক্কারটেক হাট নামেই পরিচিত। স্থানীয়দের মতে ঐতিহাসিক কাইকারটেক নৌকার হাটটি প্রায় দুই’শ থেকে আড়াইশ বছরের অধিক পুরাতন হবে। তবে কেউ এর সঠিক ইতিহাস বলতে পারেনি। নৌকা ব্যবসায়ীদের মতে বাংলা সনের জৈষ্ঠ থেকে আশ্বিণ এ পাঁচ মাস খাল বিল ও নদ-নদীতে পানি ভরপুর থাকে বিধায় এ সময়টাতেই নৌকার হাটে ক্রেতাদের ভিড় থাকে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ এখানে আসে। সরেজমিন কাইক্কারটেক নৌকার হাটে গিয়ে দেখা গেছে নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ ও কুমিল্লা জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে ব্যবসায়ীরা কাঠের নৌকা ইঞ্চিন চালিত ট্রলারের মাধ্যমে সরবরাহ করে হাটে পসরা সাজিয়ে বসেছে। নারায়ণগঞ্জসহ আশে পাশের জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে ক্রেতারাও ভিড় করছে তাদের পছন্দের নৌকাটি ক্রয় করে নিয়ে যাওয়ার জন্য। ব্যবসায়ীরা নৌকার আকার ও কাঠের ব্যবহারের উপর ক্রেতাদের কাছে আড়াই হাজার থেকে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত দাম হাকছে। ক্রেতারাও একটু সাশ্রয়ে কিনার জন্য এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে অন্য ব্যবসায়ীর কাছে ছুটছেন। চাম্বল, কড়ই, তুলা, কৃষ্ণচুরা নাকি লোহা কাঠের তৈরী নৌকা সে ব্যাপারেও নিশ্চিত হচ্ছেন ক্রেতারা। এসময় বিক্রেতা ও ক্রেতার মাঝে মধ্যস্থতা করতেও দেখা গেছে অনেককে। মধ্যস্থতা করার মাধ্যমে নৌকা বিক্রি করে দিলেই মিলছে নির্দিষ্ট সন্মানি । ব্যবসায়ীরা মুন্সিগঞ্জ জেলার গজারিয়া থানার ফুলতলা গ্রামের ময়ালদের কাছ থেকে (নৌকা তৈরী মিস্ত্রী ও মাইকারি বিক্রেতা) নৌকা সরবরাহ করেন। এছাড়া বিক্রমপুর, আড়াইহাজার ফুলদী, বন্দরের লাঙ্গলবন্দ, সোনারগাঁও উপজেলার কলতাপাড়াসহ বিভিন্ন জেলা উপজেলা থেকে নৌকা সরবরাহের মাধ্যমে এ হাটে বিক্রী করে থাকে। তাদের মতে চাম্বল, কড়ই, তুলা, কৃষ্ণচুরা ও লোহা কাঠের নৌকা হয়ে থাকে। কাঠের ব্যবহার ও নৌকার আকারের উপর প্রতটি কোষা নৌকার দাম পড়ে আড়াই হাজার টাকা থেকে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত। চাঁদপুর জেলার বেলতলি গ্রামের প্রায় ৬৮ বছর বয়সি নৌকা ব্যবসায়ী আব্দুস সালাম জানান, তিনি ৪০ বছর যাবত হাটে নৌকা বিক্রি করে আসছেন। এর আগে তার বাবা খোরশেদ আলীও এ পেশায় জড়িত ছিলেন। তার মতে দিন দিন ক্রেতার উপস্থিতি কমে আসায় প্রায় সময়ই তাদেরকে লোকসান গুনতে হয়। এক একটি নৌকার সরবরাহ খরচ পরে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। তিনি আরো জানান অবিক্রিত নৌকা ফেরত নিতে গেলে তাদেরকে অতিরিক্ত লোকসান গুনতে হয়। তাই তারা অনেক সময় লোকসান দিয়ে নৌকা বিক্রি করে থাকেন। তার মতে কাইকারটেক নৌকার হাটটি বৃহত্তম হাট। এছাড়াও মুন্সিগঞ্জের মতলব থানার ছিরার চর এলাকায় নৌকার হাট বসে। নৌকা কিনতে আসা মুন্সিগঞ্জের যুগনী ঘাট গ্রামের কৃষক মো: বাদশা মিয়া জানান, নিজের জমির পাশাপাশি অন্যের ফসলি জমি নাডি রেখে (এক বছরের জন্য বন্দক রেখে) গৃহস্থি কাজে ও গরু বাছুর লালন পালনের জন্য নৌকার প্রয়োজন হয়। তাই তিনি ৫হাজার টাকায় একটি নৌকা ক্রয় করেছেন। সোনারগাঁও উপজেলার জামপুর ইউনিয়নের কলতাপাড়া গ্রামের মাছ ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তারও এসেছেন নৌকা কিনতে। সাধ্যের দামে পছন্দের নৌকাটি ক্রয় করার জন্য হাটের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটছেন তিনি। তার মতে আগের মতো খাল বিলে মাছ পাওয়া যায় না। তাই উচ্চ মূল্যে নৌকা কিনে তার লাভ নেই বলে জানান।