25/05/2022
বাজিছে দামামা বাঁধরে আমামা
শির উঁচু করি মুসলমান
দাওয়াত এসেছে নয়া যমানার
ভাঙ্গা কেল্লায় ওড়ে নিশান
কাজী নজরুল ইসলাম
১১ জ্যৈষ্ঠ ১৩০৬-১২ ভাদ্র ১৩৮৩ বঙ্গাব্দ
বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠতম, জনপ্রিয় ও অগ্রণী বাঙালি কবি কাজী নজরুল ইসলাম। বাংলা সাহিত্যে বিদ্রোহী কবি হিসেবে পরিচিত হলেও তিনি একাধারে একজন কবি, সাহিত্যিক, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, গল্পকার, নাট্যকার, সঙ্গীতজ্ঞ, গায়ক, অভিনেতা, চলচ্চিত্রকার, সাংবাদিক, সম্পাদক, রাজনীতিবিদ, সৈনিক ও দার্শনিক ছিলেন।
অগ্নিবীণা হাতে তার প্রবেশ, ধূমকেতুর মতো তার প্রকাশ। যেমন লেখাতে বিদ্রোহী, তেমনই জীবনে-কাজে "বিদ্রোহী কবি"।
নজরুল এক দরিদ্র মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ইসলাম শেখার মাধ্যমে তাঁর শিক্ষা জীবন শুরু হয়। স্থানীয় এক মসজিদে মুয়াজ্জিন হিসেবে কর্ম জীবনে পদার্পন করেন। কৈশোরে বিভিন্ন থিয়েটার দলের সাথে কাজ করতে গিয়ে তিনি কবিতা, নাটক এবং সাহিত্য সম্বন্ধে সম্যক জ্ঞান লাভ করেন। ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কিছুদিন কাজ করার পর তিনি সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। এসময় তিনি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে অবতীর্ণ হন। প্রকাশ করেন বিদ্রোহী এবং ভাঙার গানের মতো কবিতা; ধূমকেতুর মতো সাময়িকী। জেলে বন্দী হয়ে লিখেন রাজবন্দীর জবানবন্দী।
জাতীয় কবি ইসলামকে ধারন করতেন মন ও মানসে। সাম্য ও অসাম্প্রদায়িকতার মন্ত্র খুঁজতেন ইসলামি আদর্শে। বাংলা কাব্যে তিনি এক নতুন ধারার জন্ম দেন। তিনি অসংখ্য ইসলামী সঙ্গীত তথা গজল রচনা করেন। নজরুল প্রায় ৩০০০ গান রচনা এবং অধিকাংশে সুরারোপ করেছেন যেগুলো এখন নজরুল সঙ্গীত বা "নজরুল গীতি" নামে পরিচিত এবং বিশেষ জনপ্রিয়।
ইসলামের গণভিত্তিকে নজরুল মূল্যায়ন করেছেন এভাবে,-“ইসলামের সত্যিকার প্রাণশক্তি; গণশক্তি, গণতন্ত্রবাদ, সার্বজনীন ভ্রাতৃত্ব ও সমানাধিকারবাদ। ইসলামের এই অভিনবত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব আমি ত স্বীকার করিই, যাঁরা ইসলাম ধর্মাবলম্বী নন, তাঁরাও স্বীকার করেন।”
নজরুলের প্রথম কাব্যগ্রন্থ যেটির জন্য নজরুল সমগ্র বিশ্বসাহিত্যে নজরুল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত সেই “অগ্নিবীণা”র অর্ধেক কবিতাই ইসলামী আদর্শকে লালন করে লেখা কবিতা। এমনকি পরবর্তীতে নজরুল রচনা করেন মহানবী স. এর জীবনী নির্ভর কাব্যগ্রন্থ "মরু ভাস্কর"। এভাবে প্রিয় কবির ইসলাম প্রীতি ফুটে উঠেছে তাঁর কাজ ও কর্মে।
তাছাড়াও নজরুলের অসংখ্য কবিতায় ইসলামের প্রতি তাঁর অনুরাগ ও আবেগও প্রকাশ পেয়েছে। যেমন- “আমি আল্লাহর সৈনিক, মোর কোন বাধা-ভয় নাই। তাঁহার তেজের তলোয়ারে সব বন্ধন কেটে যাই। তুফান আমার জন্মের সাথী, আমি বিপ্লবী হাওয়া ‘জেহাদ’, ‘জেহাদ’, ‘বিপ্লব’, ‘বিদ্রোহ’, মোর গান গাওয়া!”
নজরুলের কবিতা, গান ও সাহিত্য কর্ম মুসলমানদের ঘুমন্ত ইমানকে জাগিয়ে তোলে৷ অসাম্প্রদায়িক চেতনা বিকাশের শিক্ষা প্রদান করে। তার কবিতা ও গান মানুষকে যুগে যুগে শোষণ ও বঞ্চনা থেকে মুক্তির পয়গাম দেয়।
সাম্রাজ্যবাদী ও দখলদার অপশক্তির মূর্তিমান এক আতঙ্কের নাম নজরুল। মূলত ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও আফগানিস্তানের স্বাধীনতা সংগ্রামে নজরুলের প্রত্যেকটি শব্দ এক একটি পারমাণবিক বোমার কাজ করেছে। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা সংগ্রাম নজরুলের কবিতায় দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করেছিলো মুক্তিবাহিনীকে। এমনকি স্বাধীনতা সংগ্রামে রক্তে আগুন ধরা “জয় বাংলা” শ্লোগানটিও নজরুলের কবিতা হতে নেওয়া।
কাজী নজরুল ইসলামকে বাংলাদেশের জাতীয় কবির মর্যাদা দেয়া হয়। তিনি বাংলা সাহিত্য, সমাজ ও সংস্কৃতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব হিসেবে উল্লেখযোগ্য।
তিনি মুক্তিপাগল মানুষের চেতনার উৎস। কবি আমাদের মাঝে আজ নেই। প্রিয় কবি, আপনি মরেও বেঁচে থাকবেন মুমিনের হৃদয়ে। যুগে যুগে চেতনা জাগিয়ে তুলবেন ঘুমন্ত হৃদয়ে।
ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশ-এর পক্ষ থেকে আমরা কবিকে শ্রদ্ধাভরে স্বরণ করছি এবং আল্লাহ'র দরবারে দোয়া করছি, তিনি যেন কবির জীবনের ভূলত্রুটিগুলো ক্ষমা করে জান্নাতুল ফেরদৌসের মেহমান হিসেবে কবুল করে নেন।