06/05/2019
রমযানের আমল (পর্ব-১)
বিসমিল্লাহ-হির রহ'মানির রহী'ম।
আলহা'মদুলিল্লাহ।
ওয়াস-সালাতু ওয়াস-সালামু আ'লা রাসুলিল্লাহ।
আম্মা বাঅ'দ।
(১) তোওবা এবং রমযানের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুতিঃ
রমযান মাস শুরু হওয়ার পূর্ব থেকেই আপনারা সবাই সমস্ত ধরণের প্রকাশ্য ও গোপনীয় পাপ থেকে তোওবা করবেন, যাতে করে এই রমযানের মূল উদ্দেশ্য তাক্বওয়া অর্জিত হয়। এছাড়া এই রমযানে যেন বেশি বেশি নেক আমল করতে পারেন, নিজের গুনাহ-খাতা মাফ করাতে পারেন, আল্লাহর কাছে বিনীত হয়ে আন্তরিকভাবে দুয়া করতে পারেন, পূর্ণ ক্বুরআন অন্ততপক্ষে একবার বা দুইবার খতম করতে পারেন, তারাবীর নামায পড়তে পারেন তার জন্য তার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুতি নেবেন এবং আল্লাহর কাছে দুয়া করবেন।
রমযানের আরবী রমাদান শব্দটির মূল শব্দ হচ্ছে রমাদ, যার অর্থ হচ্ছে পোড়ানো।
ইমাম কুরতুবী রহি'মাহুল্লাহ বলেন, "রমাদান মাসের নাম রমাদান রাখা হয়েছে কারণ, এই মাস মানুষের গুনাহ সমূহ নেক আমল দ্বারা পুড়িয়ে ফেলে।" তাফসীরে কুরতুবীঃ ২/২৭১।
আ'ল্লামাহ আ'ব্দুল আ'জীজ বিন বাজ রহি'মাহুল্লাহ বলেন, "সমস্ত মুসলমান পুরুষ ও নারীদের জন্য আমার উপদেশ হচ্ছে তারা যেন আল্লাহকে ভয় করে এবং সমস্ত গুনাহ থেকে তোওবা করে রমাদান মাসকে অভিবাদন জানায়।" ফাতাওয়া ইবনে বাজঃ ১৫/৫১।
(২) নতুন চাদ দেখাঃ
যে কোন মাসের শুরুতে নতুন চাদ দেখা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ'লাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহ। সুতরাং, আপনারা মাগরিবের ওয়াক্ত (ঢাকায় আজ ৬ঃ৩০ মিনিটে), এই সময় শুরু হওয়ার ৫-১০ মিনিট পূর্ব থেকে চাদ দেখার চেষ্টা করবেন। এতে সুন্নাহ অনুসরণের জন্য সওয়াব রয়েছে, এমনকি যদিও তা মাস ৩০ দিন পূর্ণ হয়ে পরদিন নতুন মাস শুরু হওয়া নিশ্চিত থাকে। যারা নতুন চাদ দেখতে পারবেন তারা এই দুয়া পড়বেনঃ
اللَّهُ أَكْبَرُ، اللَّهُمَّ أَهِلَّهُ عَلَيْنَا بِالْأَمْنِ وَالْإِيمَانِ، وَالسَّلاَمَةِ وَالْإِسْلاَمِ، وَالتَّوْفِيقِ لِمَا تُحِبُّ رَبَّنَا وَتَرْضَى، رَبُّنَا وَرَبُّكَ اللَّهُ
অর্থঃ আল্লাহ সবচাইতে বড়। হে আল্লাহ! এই নতুন চাঁদকে আমাদের উপর উদিত করুন নিরাপত্তা, ঈমান, শান্তি ও ইসলামের সাথে; আর হে আমাদের রব্ব! যা আপনি পছন্দ করেন এবং যাতে আপনি সন্তুষ্ট হন তার প্রতি তাওফীক লাভের সাথে। আল্লাহ আমাদের রব্ব এবং তোমার (চাঁদের) রব্ব।
উচ্চারণঃ আল্লা-হু আকবার, আল্লা-হুম্মা আহিল্লাহু ‘আলাইনা বিল আমনি ওয়াল ঈমানি ওয়াস্সালা-মাতি ওয়াল-ইসলা-মি, ওয়াত্তাওফীকি লিমা তুহিব্বু রব্বানা ওয়া তারদ্বা, রব্বুনা ওয়া রব্বুকাল্লাহ
তিরমিযীঃ ৩৪৫১; আদ-দারিমী, শব্দ তাঁরই, ১/৩৩৬। আরও দেখুন, সহীহুত তিরমিযী, ৩/১৫৭।
(৩) তারাবীহর সুন্নত নামাযঃ
রমযানের সবচাইতে বড় একটা সুন্নত হচ্ছে রাতের বেলা তারাবীহর নামায। আপনাদের যার যতটুকু সম্ভব সে অনুযায়ী আন্তরিকতার সহিত ধীরে-সুস্থে তারাবীহর নামায পড়ার চেষ্টা করবেন, ২-১১ বা ১৩ রাকাত। কেউ আরো বেশি পড়তে চাইলে জায়েজ আছে। তারাবীহর নামায এশার পরে প্রথম রাতে পড়া উত্তম, তবে ফযরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত যে কোন সময়ে পড়া জায়েজ। পুরুষের জন্য মসজিদে আর নারীদের জন্য ঘরেই পড়া উত্তম। তবে, আপনার মসজিদে যদি এতো দ্রুত ক্বিরাত পড়ে বা রুকু-সিজদাহ তাড়াতাড়ি করে নামাযের খুশু-খুজু নষ্ট করে ফেলে, তাহলে এমন ইমামের সাথে তারাবীহ পড়বেন না। বাসায় লোকদেরকে নিয়ে জামাতে বা একাকী পড়বেন। আল্লাহর কাছে সেটাই বেশি পছন্দনীয় হবে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে তোওফিক্ব দান করুন।
তারাবীহ সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়েছে এই পোস্টে -
https://m.facebook.com/story/graphql_permalink/?graphql_id=UzpfSTEyNTE2NzgxNzUxNTk3NDoxOTczNDc4MDY5MzUxNTk3
(৪) সাহরী খাওয়াঃ
সাহরী খাওয়া রমযানের গুরুত্বপূর্ণ একটা সুন্নাহ। হাদীস থেকে সাহরীর যেই ফযীলত জানা যায়ঃ
- সাহরী খাওয়ার মাঝে বরকত রয়েছে।
- যারা সাহরী খায় আল্লাহর ফেরেশতাগণ তাদের জন্য রহমতের দুয়া করেন।
- ইহুদী-খ্রীস্টানদের রোযার সাথে আমাদের রোযার পার্থক্য হচ্ছে সাহরী। আমাদের রোযাতে সাহরী আছে তাদের রোযাতে সাহরী নেই।
সুতরাং, আপনারা অলসতা করে কেউ সাহরী খাওয়া বাদ দেবেন না।
(৫) যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী দান-সাদাকা করাঃ
আপনাদের যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী মানুষকে দান-সাদাকা, খাবার খাওয়ানো এবং ইফতারি করানোর চেষ্টা করবেন। এমনকি যার সামর্থ্য নেই তিনি একটা শুকনো খেজুর বা সামান্য কয়েক টাকা দান করেও আল্লাহর কাছে রমযানে দানশীল ব্যক্তির নাম লেখানোর চেষ্টা করবেন।
নবী সাল্লাল্লাহু আ'লাইহি ওয়া সাল্লাম রমযানে সবচাইতে বেশী দান করতেনঃ
আব্দুল্লাহ ইবনু ‘আববাস রাদিয়াল্লাহু আ'নহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আ'লাইহি ওয়া সাল্লাম ধন-সম্পদ ব্যয় করার ব্যাপারে সকলের চাইতে দানশীল ছিলেন। রমাযানে জিবরাঈল আ'লাইহিস সালাম যখন তাঁর সঙ্গে সাক্ষাত করতেন, তখন তিনি আরো অধিক দান করতেন। রমাযান শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রতি রাতেই জিবরাঈল তাঁর সঙ্গে একবার সাক্ষাত করতেন। আর নবী সাল্লাল্লাহু আ'লাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে ক্বুরআন পাঠ করে শোনাতেন। জিবরাঈল যখন তাঁর সঙ্গে সাক্ষাত করতেন তখন তিনি রহমতসহ প্রেরিত বাতাসের চাইতে অধিক ধন-সম্পদ দান করতেন।
সহীহ বুখারীঃ ১৯০২।
(৬) রমযানের দিনে ও রাতে ক্বুরআন তিলাওয়াত বৃদ্ধি করাঃ
ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু আ'নহা বলেন, আব্বা সাল্লাল্লাহু আ'লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন যে, "জিবরীল প্রত্যেক বছর একবার করে তাঁর উপর ক্বুরআন পেশ করতেন (পড়ে শুনাতেন)। কিন্তু তাঁর ইন্তিকালের বছরে দুইবার ক্বুরআন পেশ করেন।"
উপরোক্ত হাদীসদ্বয় থেকে এই নির্দেশ পাওয়া যায় যে, রমযান মাসে ক্বুরআন পঠন-পাঠন করা, এ উদ্দেশ্যে জমায়েত হওয়া এবং অপেক্ষাকৃত বড় হাফেয বা ক্বারীর কাছে ক্বুরআন পেশ করা (হিফয পুনরাবৃত্তি করা) মুস্তাহাব। আর তাতে এ কথারও দলীল রয়েছে যে, রমাযান মাসে বেশী বেশী করে ক্বুরআন তিলাওয়াত করা উত্তম।
প্রথমোক্ত হাদীস থেকে জানা যায় যে, জিবরীল আ'লাইহিস সালাম মহানবী সাল্লাল্লাহু আ'লাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে রাত্রিতে ক্বরআন পুনরাবৃত্তি করতেন। আর তাতে বুঝা যায় যে, রমাযানের রাতে অধিকাধিক কুরআন তেলাঅত করা মুস্তাহাব। যেহেতু রাতে কোন রকম ব্যস্ততা থাকে না, রাতে ইবাদত করতে মনের উদ্দীপনা সুসংবদ্ধ থাকে এবং হৃদয়-মন ও রসনা কুরআন উপলব্ধি করতে সমপ্রয়াসী হয়। মহান আল্লাহ বলেন,
{إِنَّ ناشِئَةَ اللَّيْلِ هِيَ أَشَدُّ وَطْأً وَّأَقْوَمُ قِيْلاً}
অর্থঃ নিশ্চয় রাত্রি জাগরণ মনের একাগ্রতা ও হৃদয়ঙ্গমের জন্য অতিশয় অনুকূল। সুরা মুযযাম্মিলঃ ৬।
সালফে সালেহীন (অর্থাত সাহাবী, তাবেয়ী ও নেককার লোকেরা) রমযান মাসে বেশী বেশী ক্বুরআন তিলাওয়াত করতেন। তাঁদের কেউ কেউ প্রত্যেক তিন রাতে তারাবীর নামাযে পূর্ণ ক্বুরআন একবার খতম করতেন। কেউ কেউ খতম করতেন সাত রাতে; এঁদের মধ্যে কাতাদাহ রহি'মাহুল্লাহ অন্যতম।
কিছু সালাফ প্রতি দশ রাতে একবার খতম করতেন; এঁদের মধ্যে আবূ রাজা উতারিদী রহি'মাহুল্লাহ অন্যতম। আসওয়াদ রহি'মাহুল্লাহ রমযানের প্রত্যেক দুই রাতে একবার ক্বুরআন খতম করতেন। নাখয়ী রহি'মাহুল্লাহ রমযানের শেষ দশকে দুই রাতে এবং তার পূর্বে তিন রাতে ক্বুরআন খতম করতেন।
রমযান মাস আসলে ইমাম আয-যুহরী রহি'মাহুল্লাহ বলতেন, "এই মাস তো ক্বুরআন তিলাওয়াত এবং মিসকীনদেরকে খাদ্য দান করার মাস।"
ইমাম মালেক রহি'মাহুল্লাহ রমযান মাস আসলে হাদীস পড়া এবং আহলে ইলমদের বৈঠকে বসা বাদ দিয়ে মুসহাফ দেখে ক্বুরআন পড়তে যত্নবান হতেন।
সুফিয়ান সওরী রহি'মাহুল্লাহ রমযান মাস আসলে সকল ইবাদত ত্যাগ করে ক্বুরআন তিলাওয়াত করতে প্রয়াসী হতেন।
লাতায়িলে মায়া'রিফ, ইবনে রজব ১৭২, ১৭৯, ১৮১-১৮২ পৃঃ, কাই নাস্তাফীদা মিন রামাদানঃ ৪৮-৪৯পৃঃ, কাইফা নাঈশু রামাদানঃ ১৭পৃঃ, হাদিয়্যাতু লিস-সায়েমীনঃ ১১পৃঃ।
[সংগৃহীত]