10/07/2025
বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমি, বিপিএ নামেই বেশি পরিচিত, রাজশাহীর সারদায় প্রমত্তা পদ্মার কোল ঘেষে মাথা উচু করে দাঁড়িয়ে থাকা এক আজব কারখানা । জায়গাটাকে "আজব কারখানা" বললাম কারণ সেখানে বহু লোকের স্বপ্ন গড়ে , আবার কারও কারও স্বপ্ন ভেঙে ধুলোয় মিশে যায়। এক ভীতু দুর্বল তরুণ যুবক যেখানে দায়িত্ববান শক্তিশালী পুরুষে পরিণত হয়, খুবই আইন্ডারকনফিডেন্ট টাইপের মানুষও যেখান থেকে বের হয় মাথা উচু করে, দুনিয়া জয় করার আত্মবিশ্বাস নিয়ে। কারো কারো কাছে বিপিএ শুধুই এক অধরা স্বপ্ন, কারো কাছে না পাওয়ার আক্ষেপ, আবার কারও কাছে তার লক্ষ্যে পৌছাবার সিড়ি, যা সে বেয়ে চলেছে অথবা সফলভাবে পার করে এসেছে।
বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমিতে মৌলিক প্রশিক্ষন কোর্স নামে একটা বিষয় আছে। সকল এএসপি প্রবেশনার, শিক্ষানবিশ সার্জেন্ট, এস আই ক্যাডেট অফিসাররা তাদের এক বছরের ট্রেনিং লাইফের পুরোটা সময় সেখানে কাটায় যেন তারা বেসিক পুলিশিং লাইফ সম্পর্কে পরিপূর্ণ ধারণা পায়। মৌলিক প্রশিক্ষণ ট্রেনিং শেষে এএসপি প্রবেশনার এবং শিক্ষানবিশ সার্জেন্ট অফিসাররা তাদের নিজের ইউনিটে ফেরত চলে যায় । সেই সুবাদে আমারও বিপিএতে যাওয়া হয়েছিল।
বিপিএতে আমার রুম ছিলো শহীদ কাঞ্চন ভবনের দুই তলায়। রুমের বারান্দা দিয়ে একপাশে তাকালে দেখতাম ডাচ পন্ড, চেমনি মেমরিয়াল হল, আরেকপাশে বিপিএর প্রধান গেট যেখান থেকে বারংবার চাইতাম বের হতে। আমরা যখন এসেছিলাম তখন ভাদ্র মাস ছুই ছুই ছিল, কাকফাটা রোদ আর সারদার পিঠ পুরে যাওয়া গরম বাতাসের সাথে কালেভদ্রে আকাশ বেয়ে নামতো ঝুম বৃষ্টি , আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে, নিজের হাতে বানানো গ্লুকোজ-লেবুর জুস খেতে খেতে চেমনি মেমরিয়াল হলের নিকটের ডাচ পন্ডের দিকে তাকিয়ে দেখতাম। মাঝে মাঝে ভাবতাম, পৃথিবীও এত সুন্দর হয় বুঝি !
এই গ্লুকোজ আর লেবু মেশানো জুস বানিয়ে খেতাম এটা ভেবে যে এই জুস বোধহয় এই ফিজিক্যাল হার্ডশিপের মধ্যে একটু শক্তি জোগাবে । এক বছর পর এখন আর তেমনটা মনে হয় না। এখন মনে হয়, শক্তি গায়ে থাকে না, শক্তি থাকে মনে। মানুষের মনের জোরই তাকে দিয়ে অসাধ্য সাধন করায়, গায়ের জোর না। গায়ের জোরেই যদি সব হয়ে যেত তবে মুসা ইব্রাহীমের আগে চট্টগ্রামের বিখ্যাত আব্দুল জব্বারের বলীখেলার চ্যাম্পিয়নই এভারেস্ট জয় করতো ।
প্রথমবারের মতো ঘরের ছেলে ঘর ছেড়ে এসেছিল , বাসার কথা খুব মনে পড়ছিলো। তার উপর অলটাইম দৌড়ের উপরেই থাকতাম, মন খারাপ করার সময়টুকুও ছিল না। সকাল ৪ টা থেকে রাত ৯ টা অব্দি ব্যাস্ত কড়া সিডিউলের ৬ ঘন্টা ফিজিক্যাল ট্রেনিং আর ৬ ঘন্টার 'ল' ক্লাস শেষে বিছানায় শুয়ে আব্বু আম্মুর কথা ভাবতাম। প্রচন্ড কষ্টের ওই সময়টুকুতে তখন এরাই ফোন দিত। সেবারই আমার প্রথমবারের মতো মনে হল আমি আমার বাবা-মাকে প্রচন্ড ভালবাসি। এর আগে-পরে আর কখনো আমি নিজের আব্বু-আম্মুকে যে এতটা ভালোবাসি বুজতে পারিনি। তাদেরকে কখনোই এ কথাটা বলতেও পারিনি। 'ভালোবাসি' বলাটা মোটেও কঠিন কিছু না , তবে ভালোবাসার মানুষকে 'ভালোবাসি' বলার চেয়ে কঠিন হয়তোবা দুনিয়াতে আর কিচ্ছু নেই !
সারদায় সবচাইতে খারাপ সময়টা ছিল প্রথম তিন মাস। শারীরিক এবং মানসিক দুইভাবেই নিজেকে গড়া লাগছে এই তিন মাসে। প্রতিটাদিন ব্যাগ গুছাতাম বাড়ি চলে যাব। যাকগে , হার্ড রুটিন ফলো করতে করতে আমাদের পুলিশের মৌলিক প্রশিক্ষন ট্রেনিং অবশেষে শেষ হয়ে আসলো। যে বিপিএ থেকে যাওয়ার জন্য সবাই ছটফট করছিলাম, সে বিপিএ ছেড়ে আসতেই সবার মন খারাপ হচ্ছিলো। কেউ কেউ তো কান্নাও শুরু করলো। প্রাণের ২৬ সার্জেন্ট ব্যাচের পরিচিত মুখদের সবাইকে বিদায় দিয়ে ঢাকাগামী বাস হানিফ এক্সপ্রেসে চেপে বসলাম। সারদা থেকে ঠিক করে দেয়া বাসের জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখতে থাকলাম, সারদা ছেড়ে যাচ্ছি। যে সারদা ছেড়ে যাওয়ার জন্য সবসময় মন ছটফট করত আর এখন কেন যেন মনের অজান্তে সারদার জন্যেই চোখের কোন বেয়ে পানি গড়িয়ে পরতে লাগল।
২ বছর পেরিয়ে গেছে , নিজ নিজ ইউনিটে যোগদানের পর শিক্ষানবিশ পিরিয়ডও শেষের পথে। এখনও আমার প্রায়ই মনে হয়, বড় হতে পারলাম কোথায় ! আমি যেন এখনও সেই ছোট্ট নবীন সার্জেন্ট মামুন বুট পড়ে সারদার মাঠে দৌড়াচ্ছি যাকে মিরুল ওস্তাদজীরা প্রতিনিয়তই হাতে কলমে পুলিশ হওয়ার মন্ত্র কানের মধ্যে ঢুকিয়ে দিত, যার বুকে হাজারো স্বপ্ন একদিন অনেক বড় হওয়ার, মানুষের মতো মানুষ হওয়ার! 👮♂
sgt. Mamunur rashid