03/07/2016
***ময়মনসিংহ গীতিকার অমর কাব্য গাঁথা ফিরুজ খান দেওয়ানের পালা***
উত্তরে গারো পাহাড়, জয়ন্ত ও খাশিয়ার অসম শৈল শ্রেণীর পদলেহন করে একদিকে সোমেশ্বরী, কংশ অন্যদিকে সুরমা কুশিয়ারার ধারা প্রবাহ ছুটে চলেছে অনবরত। এই ধারা প্রবাহ আর তাদের শাখা-প্রশাখা প্রবেশ করেছে ধনু, ফলেশ্বরী, ভাটেশ্বরী, বরুনী, সুন্ধনা, সুরিয়া আর ঘোড়াউৎরার মত অসংখ্য নদীতে। আর এই নদীগুলো হচ্ছে হাওর অঞ্চলের প্রাণ। এই নদীগুলোরই অন্তর্বর্তী দেশের সাধারণ মানুষের করুণ গাঁথা হচ্ছে ময়মনসিংহ গীতিকা।
নিস্তরঙ্গ জলরাশি, নলখাগড়া আর ইকরার বনে সমাচ্ছন্ন হাওর অঞ্চল। কুড়া পাখীর গুরুগম্ভীর শব্দে নিনাদিত আকাশ আর প্রকৃতির অনুপম সৌন্দর্য ও রূপ মাধুর্যে সুষমামন্ডিত বৈশিষ্ট্যগুলো গাঁথাগুলোকে করেছে সুসংহত, সুবিন্যস্ত আর নাটকীয় মহিমায় সমৃদ্ধ। শুধু তাই নয়, এই কাব্য গাঁথাগুলো এই অঞ্চলের মানুষের ঐশ্বর্যমন্ডিত কালজয়ী বস্তুনিষ্ঠ সাহিত্য সম্পদ হিসেবে দেশে বিদেশে সমাদৃত।
পূর্বকালে কিশোরগঞ্জ এবং নেত্রকোণা জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল পূর্ব ময়মনসিংহ বলে পরিচিতি লাভ করেছিল। পূর্ব ময়মনসিংহই হচ্ছে ময়মনসিংহ গীতিকার স্বাধীন উর্বর ক্ষেত্র এবং গাঁথাগুলোর অভিনয় ক্ষেত্র।
গীতিকাগুলোর আকর্ষণীয় বিষয় হচ্ছে নারীচরিত্র। গীতিকার নারীচরিত্র হৃদয়গ্রাহীরূপে উদ্ভাসিত হয়েছে। এদের প্রেম-নিষ্ঠা-সংযম-সহিষ্ণুতা, তেজস্বিতা, সতীত্ব, পতিব্রতা, আত্মত্যাগ আর ব্যক্তিত্ব যা সহজাত হৃদয়বৃত্তির দিক থেকে অনন্য। এদের বলিষ্ঠ প্রেমের কারণে আত্মবিসর্জিত হৃদয়গ্রাহী বিষাদাত্মক চরিত্রগুলো সৃষ্টি হয়েছে। ঐ চরিত্রগুলোর অন্যতম প্রতিবিম্বগুলোর মধ্যে ‘সখিনা' অন্যতম।
পালাগানে বিচিত্ররূপে উপস্থাপিত সখিনা চরিত্রটি এই অঞ্চলের ইতিহাসসিদ্ধ চরিত্র। ফিরুজ খান দেওয়ানের পালায় ‘সখিনা'কে মনোগ্রাহী রূপে পরিবেশন করা হয়েছে।
ষোড়শ শতকের ভাটি রাজ্যের অধিপতি ঈশা খানের দ্বিতীয় স্ত্রী অলি নেয়ামত খানমের দু'সন্তান আদম খান ও বিরহিম খান। আদম খানের পুত্র ফিরুজ খান। ফিরুজ খানের সাথেই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলের সখিনা।
ঈসা খানের গৌরবে গৌরবান্বিত একজন সাহসী বীর পুরুষ ছিলেন ফিরুজ খান। তাই পালাটি রচিত হয়েছে তার নামেই। ময়মনসিংহ গীতিকার অন্যতম এই পালাগানটি চন্দ্রকুমার দে সংগ্রহ করেছিলেন কিশোরগঞ্জ শহরের রহমান গায়েনের কাছ থেকে। পরবর্তীকালে সাহিত্য ও নন্দনতত্ত্ব বিষয় বিভিন্ন আলোচনায় পালাগানটি বিশেষ স্থান পায়। বিশেষ করে বাংলার শেষ মধ্যযুগে বীরাঙ্গনা নারী নানা আলোচনায় বিচিত্র দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পেয়েছে গীতিকাটি। নিঃসন্দেহেই কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোণা অঞ্চলের উৎকৃষ্টতম লোকসাহিত্য-পালাগীতিকা এবং কাহিনীর জনপ্রিয়তার দরুন একদিকে সাধারণ মানুষের মনোরঞ্জন অন্যদিকে সাহিত্যশৈলীতে ইতিহাসের বক্তব্য পরিবেশিত হয়েছে। এরপর কাহিনীটি জার্মান ভাষায় অনূদিত হয়ে বিশ্বমঞ্চেও প্রবেশ করেছে। বড় কথা হচ্ছে ফিরুজ খান দেওয়ানের পালায় ভাটি অঞ্চলের একজন বীরাঙ্গনা নারীর প্রতিমূর্তিরূপে নারীত্বের সর্বাঙ্গীন সৌন্দর্যের প্রতীকরূপে প্রতিভাত হয়েছেন সখিনা।
সপ্তদশ শতাব্দীর শেষদিকে ভাটি রাজ্যের অধিপতি ঈসা খানের অধস্তন পুরুষদের সাথে বাংলার শেষ পাঠান বীর খাজা ওসমান খান লোহানীর অধস্তনদের মধ্যে সম্পর্কটি ছিল অপেক্ষাকৃত জটিল। কারণ, ঈসা খানের পুত্র মুসা খান মোগল সেনাপতি ইসলাম খান চিশতীর নিকট আত্মসমর্পণ করার পর তার সন্তানগণ মোগলদের সাথে থাকা ওসমান খান লোহানীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল বিভিন্ন রণাঙ্গনে তারই টানাপোড়েনে ক্রমশ শত্রুতার সৃষ্টি হয় বাংলার স্বাধীনতা রক্ষার অতন্দ্রপ্রহরী এই দু'টি বংশের অধস্তন পুরুষদের মধ্যে।
গীতিকায় উপস্থাপিত চরিত্রগুলোর কার্যকলাপ বহুমাত্রায় তাদের সহজাত আচরণের বিপরীতধর্মী এবং সম্ভবত এই কারণেই সখিনা কর্তৃক স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে পিতৃতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধাচরণের বিষয়টিকে কাহিনীটির কেন্দ্রবিন্দু করা হয়েছে। আর এজন্যই বীরাঙ্গনা নারীর চরিত্র চিত্রায়নে গাঁথা কাব্যটি প্রাণধর্মে সজীব হয়ে উঠেছে। শুধু তাই নয়, সখিনার বীরাঙ্গনা চরিত্রের পাশাপাশি দুঃসাহসী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে স্বামীর জন্য পিতা শত্রুকে পরাজিত করার প্রত্যয়ে আপন প্রতিভার দীপ্তময় হয়ে উঠেছে। যেমন বলা হয়েছে-
মানা না করিয়ো মাগো বিদায় দেও মোরে।
রণে জিত্যা স্বামী লইয়া আইবাম আমি ঘরে।।
নচিব যদি বোরা হয় মা রণে যদি মরি।
স্বামীর যোগ্যা রণে মরতে দুঃখু নাইযে করি।।
সোয়ামীর লাইগ্যা আমি তেজিবাম জান
বিদায় কালেতে মাগো জানাই সালাম।।
পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে ‘সখিনা' এই অঞ্চলের ইতিহাস সিদ্ধ-নারী। তিনি বাংলার শেষ পাঠানবীর খাজা ওসমান খান লোহানীর ৩য় অধস্তন খাজা ওমর খান লোহানীর একমাত্র কন্যা। খাজা ওসমান খান লোহানী বর্তমান মৌলভীবাজারের দুলস্বপুরে মোগলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত অবস্থায় নিহত হলে সম্রাট জাহাঙ্গীর খাজা ওসমান খান লোহানীর পুত্র মোবারেজ খানকে কেল্লাতাজপুর অঞ্চলের জায়গীর প্রদান করেন। মোবারেজ খানের মৃত্যুর পর তার পুত্র ওমর খান সম্রাটের পক্ষ থেকে এ অঞ্চলেই জায়গীর প্রাপ্ত হয়ে তাজপুর দুর্গেই অবস্থান করেন।
বাংলার সুলতানী আমলের উল্লেখযোগ্য দুর্ভেদ্য দুর্গ তাজপুর কামরূপ সামন্তরা প্রথমে এই দুর্গটি নির্মাণ করেছিল মৃন্ময় পদ্ধতিতে। বাংলার স্বাধীন সুলতানগণ-- এই দুর্গটিকে ইটের প্রাচীর দ্বার সুরক্ষিত করে।
দুলম্বপুরের যুদ্ধের পর থেকেই ঈসা খানের বংশ এবং যাহা ওসমান খান লোহানীর বংশের অধস্তনদের মধ্যে বৈরীভাবের সৃষ্টি হয়। ফলে জঙ্গলবাড়ী দুর্গের অধিপতি আর তাজপুর দুর্গের অধিপতির মধ্যে সদ্ভাব সৃষ্টি হয়নি কোন দিন।
ফিরুজ খান জানতে পারেন ওমর খানের কন্যা সখিনার কথা। ফিরুজ খান ভুলে যান তাদের মধ্যে পূর্ব শত্রুতার বিষয়টি। জঙ্গলবাড়ী দুর্গ থেকে বিবাহের প্রস্তাব প্রেরণ করা হয় তাজপুর দুর্গে।
ফিরুজ খান কর্তৃক প্রেরিত একজন ওজির ওমর খানের নিকট ফিরুজ খানের বিবাহের প্রস্তাব পেশ করার পর তাজপুর অধিপতি ওমর খানের প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি কাব্যগাঁথায় বলা হয়েছে এভাবে--
এই কথা শুনিয়া ওমর খাঁর গোস্বা হইল মনে
কহিতে লাগিল পরে সভার সদনে।।
কাফেরের ওজি জঙ্গলবাড়ীর দেওয়ান।
রোজা নামাজ ছাড়া যেইনা মুছলমান
না মুছলমান পাঠাইল সাদির কারণ
এই না দুঃখ সহে দেখ ওজির নাজিরগণ
বেইজ্জত করিলা আমায় সেইত কাফেরে
উচিৎ শাস্তি দিলাম আমি ভাইব্যা চিন্তা তারে।
অর্থাৎ ফিরুজ খান কর্তৃক প্রেরিত ওজিরকে অপমান করে তাজপুর দুর্গ থেকে বের করে দিলে ওজির ফিরে আসেন জঙ্গলবাড়ী। ফিরুজ খান সব শুনে সিদ্ধান্ত নেন তাজপুর অভিযানের। গীতিকায় বলা হয়েছে-- এভাবে
এই কথা শুনিয়া মিয়ার গোসা হইল ভারি।
শহরে বাজারে ডঙ্কা মারে তাড়াতাড়ি\
ডাঙ্কা মারিল দেওয়ান ফৌজের কারণ।
কালুকা যাইতে হইবে করিবারে রণ\
ফৌজদারগণ যত এই কথা শুনিয়া
পলকে আইল যত ফৌজ যে লইয়া\
সাজাইয়া রণের ঘোড়া হইল সোয়ার।
পন্থে মেলা দিল সবে করি মারমার\
পরের দিনেতে সাহেব ফৌজ যে লইয়া।
কেল্লা তাজপুর শহরে মিয়া দাখিল হইল গিয়া\
দেওয়ান বাড়ি ফৌজে ঘিরিয়া লইল।
ঘটিতে ধরিয়া মিয়া দেওয়ানরে খেদাইল\
খেদাইল ওজির নাজীর যত লোকজন।
তারপর মিয়া অন্তর বাড়ি করিল গমন\
ফিরুজ খান যখন তাজপুর আক্রমণ করেন তখন ওমর খান প্রথমদিকে আক্রমণ প্রতিহত করার চেষ্টা করলেও যুদ্ধে পরাজিত হন তিনি। ঐতিহাসিকভাবে বিষয়টি সত্য যে, ওমর খান যুদ্ধে পরাজিত হবার পর ফিরুজখান সখিনাকে প্রথমে অপহরণ করেন এবং তার সম্মতিতেই জঙ্গলবাড়ি দুর্গে উভয়ে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।
এদিকে উমর খানের পরাজয় অন্যদিকে কন্যাকে অপহরণের পরিশোধ নেবার জন্য দিল্লীতে সম্রাট জাহাঙ্গীরের নিকট প্রতিকার প্রার্থনা করেন। সম্রাট জাহাঙ্গীর ঢাকার সুবাদারকে নির্দেশ দিলেন ওমর খানকে সাহায্য করার জন্য এবং ফিরুজ খানকে উচিৎ শিক্ষা দেবার জন্য।
ওমর খান মুঘল সৈন্যদের সহায়তায় অভিযান নিয়ে আসে ফিরুজ খানের বিরুদ্ধে। প্রচন্ড যুদ্ধে পরাজিত হন ফিরুজ খান, সেইসাথে তিনি বন্দীও হন।
রণপ্রত্যাগত বিজয়ী স্বামীর গলায় জয়মাল্য পরাবার জন্য যে সখিনা অপেক্ষা করছিলেন, সেই সখিনা শুনলেন স্বামীর পরাজয়ের বার্তা। গীতিকায় বলা হয়েছে এভাবে-
শুন শুন দরিয়া আরে কহি যে তোমারে
তুল্যা আন চাম্পা গোলাপ মালা গাথিবারে\
লড়াই জিত্যা আইলে স্বামী মালা দিবাম গলে।
অজুর পানি তুইল্যা রাখ সোনার গুইছালে\
আবের পাঙ্ঘা আইন্না রাখ শয্যার উপরে।
রণ জিত্যা আইলে স্বামী বাতাস করতাম তারে\
কান্দিয়া দরিয়া বান্দী কহিতে লাগিল
এতদিনে কন্যা আপনার নচিব বোরা হইল।
বাহু হইতে খুল কন্যা বাজুবন্ধ তার।
গলা হইতে খুল কন্যা হীরামনের হার\
পাও হইতে খুল কন্যা নোউর পাঞ্জনী।
কোমর হইতে খুল কন্যা ঘুংঘুর ঝুনঝুনি\
শোন শোন বিবি আরে কইযে আপনেরে
আপনার স্বামী হইল বন্দী তাজপুর কারে।
এই কথা শুনিয়া বিবি উট্যা খাড়া হইল।
আসমান ভাঙ্গিয়া যেন শিরেতে পড়িল\
যে হোক সে হউক দরিয়া আমার কথা ধর।
শীঘ্র করি রণের ঘোড়া আন্যা খাড়া কর\
আমার স্বামীরে বন্দী করে শরীলের কত জোর।
সাজাও দেখি রণের ঘোড়া গেল কতদূর\
স্বামীর জন্য পিতার বিরুদ্ধে কন্যার যুদ্ধ যাত্রা। এককথায় বলা যায় সখিনা তার সহজাত-প্রবৃত্তির কারণে সার্থক উদ্ভাবনী শক্তি বলে বিপদ মুক্তির মানসে দুঃসাহসী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে এবং শত্রুকে পরাজিত করার জন্য আপন প্রতিভায় দীপ্তময় হয়ে উঠেছে। হৃদয়ের অপ্রতিরোধ্য গতিতে কিংবা সচেতন ক্রিয়ায় অনুভূতির সুগভীর তীব্রতায় বীরঙ্গনা সখিনা তেজস্বী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে।
সখিনা অমিত বিক্রমে যুদ্ধ করছিল পিতার বিরুদ্ধে। যুদ্ধের বিবরণটি গীতিকায় উপস্থাপন করা হয়েছে এভাবে-
সেপাই ফৌজদার যত আগে পাছে যায়।
পায় পাছানিতে ধুলা আসমানে উড়ায়\
দিনের পথ বাইয়া তারা এক দন্ডে যায়।
এই না সে কেল্লাতাজপুর সামনে দেখা যায়\
বাপ হইয়া দেখ দুষমন হইল।
ঘেরাও করিতে কেল্লা বিধি হুকুম দিল\
আড়াই দিন হইল রণে কেউ না জিতে হারে।
আগুন লাগাইল বিবি কেল্লাতাজ পুর শরে\
বড় বড় ঘর দরজা পুইড়া হইল ছাই।
রণে হারে বাসসার ফৌজ সরমের সীমা নাই\
এমন সময় শুনে সবে কোন কাম হইল।
তাজপুর তারা আস্যা নফর সালাম জানাইল
আপোষনামা লইয়া আইলাম দেখা করিবারে।
জঙ্গল বাড়ির নফর আমি জানাইযে তোমারে\
ফিরুজ খান দেওয়ান মোরে দিলাইন পাঠাইয়া।
খবর কহিতে তোমায় শুন মন দিয়া\
যার লাইগ্যা জ্বলে আগুন জঙ্গলবাড়ি শরে।
তালাক দিয়াছে দেওয়ান সেই সখিনারে।
জনশ্রুতি রয়েছে। ফিরুজখানকে যখন তাজপুর দুর্গে বন্দী করা হয়েছিল তখন সখিনা পুরুষের বেশ ধরে এবং সিপাহসালার হয়ে অজস্র সৈন্য নিয়ে ছুটে গিয়েছিলেন স্বামীকে উদ্ধার করে আনার জন্য। যুদ্ধ তখন চলছিল। সখিনার জয় হবে এমন সময় ওমর খান কূট কৌশলের আশ্রয় নিল। মিথ্যা তালাকনামা লিখে সখিনাকে বিভ্রান্ত করল ওমর খান। আর মিথ্যে তালাকনামাটি দেখে বীরঙ্গনা সখিনার কুসুম কোমল স্থানটিতে আঘাত পেল মারাত্মকভাবে। সমরাস্ত্র সজ্জিত বীরঙ্গনা মুহূর্ত মাত্র স্তব্ধ হয়ে ফিরুজ খানের নামমুদ্রাঙ্কিত বর্জ্জন পত্রের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে সংজ্ঞাশূন্য হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল এবং মৃত্যুবরণ করল। যুদ্ধটি সম্ভবত তাজপুর দুর্গের অতি নিকটে কুমড়ি নামক স্থানে সংঘটিত হয়েছিল। কারণ কুমড়িতেই সখিনার সমাধি অবস্থিত।
গীতিকায় ইতিহাসসিদ্ধ এই কাহিনীটি আমাদের গ্রাম্য কবির স্বভাবসুলভ সাদামাটা ভাষায় বর্ণিত হয়েছে। যা আমাদের হৃদয় মনকে খুব সহজেই আকৃষ্ট করে। নিরাভরণ অকৃত্রিম কাব্য ভাষায় উদ্ভাসিত হয়েছে।
বাংলার ৫টি রাজ্যের দুটি অভিজাত পরিবারের প্রতিচ্ছবি গীতিকার ছত্রে ছত্রে বিম্বিত করেছেন। কূটকৌশলের আশ্রয় নিয়ে অসম্ভবকে সম্ভব করার প্রয়াস চালালেও তার জন্য যে উমর খানকে অস্বাভাবিক মূল্য দিতে হয়েছে গীতিকা থেকে তা সহজেই অনুধাবন করা যায়।
এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে গাঁথা কাব্যটি ইতিহাস স্নাত হলেও জীবনধর্ম সাহিত্য-মূল্য নির্ধারণেও আমাদের হৃদয়তন্ত্রীতে ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করেছে।
এই কথা শুনিয়া মিয়ার গোসা হইল ভারি।
শহরে বাজারে ডঙ্কা মারে তাড়াতাড়ি\
ডাঙ্কা মারিল দেওয়ান ফৌজের কারণ।
কালুকা যাইতে হইবে করিবারে রণ\
ফৌজদারগণ যত এই কথা শুনিয়া
পলকে আইল যত ফৌজ যে লইয়া\
সাজাইয়া রণের ঘোড়া হইল সোয়ার।
পন্থে মেলা দিল সবে করি মারমার\
পরের দিনেতে সাহেব ফৌজ যে লইয়া।
কেল্লা তাজপুর শহরে মিয়া দাখিল হইল গিয়া\
দেওয়ান বাড়ি ফৌজে ঘিরিয়া লইল।
ঘটিতে ধরিয়া মিয়া দেওয়ানরে খেদাইল\
খেদাইল ওজির নাজীর যত লোকজন।
তারপর মিয়া অন্তর বাড়ি করিল গমন\
ফিরুজ খান যখন তাজপুর আক্রমণ করেন তখন ওমর খান প্রথমদিকে আক্রমণ প্রতিহত করার চেষ্টা করলেও যুদ্ধে পরাজিত হন তিনি। ঐতিহাসিকভাবে বিষয়টি সত্য যে, ওমর খান যুদ্ধে পরাজিত হবার পর ফিরুজখান সখিনাকে প্রথমে অপহরণ করেন এবং তার সম্মতিতেই জঙ্গলবাড়ি দুর্গে উভয়ে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।
এদিকে উমর খানের পরাজয় অন্যদিকে কন্যাকে অপহরণের পরিশোধ নেবার জন্য দিল্লীতে সম্রাট জাহাঙ্গীরের নিকট প্রতিকার প্রার্থনা করেন। সম্রাট জাহাঙ্গীর ঢাকার সুবাদারকে নির্দেশ দিলেন ওমর খানকে সাহায্য করার জন্য এবং ফিরুজ খানকে উচিৎ শিক্ষা দেবার জন্য।
ওমর খান মুঘল সৈন্যদের সহায়তায় অভিযান নিয়ে আসে ফিরুজ খানের বিরুদ্ধে। প্রচন্ড যুদ্ধে পরাজিত হন ফিরুজ খান, সেইসাথে তিনি বন্দীও হন।
রণপ্রত্যাগত বিজয়ী স্বামীর গলায় জয়মাল্য পরাবার জন্য যে সখিনা অপেক্ষা করছিলেন, সেই সখিনা শুনলেন স্বামীর পরাজয়ের বার্তা। গীতিকায় বলা হয়েছে এভাবে-
শুন শুন দরিয়া আরে কহি যে তোমারে
তুল্যা আন চাম্পা গোলাপ মালা গাথিবারে\
লড়াই জিত্যা আইলে স্বামী মালা দিবাম গলে।
অজুর পানি তুইল্যা রাখ সোনার গুইছালে\
আবের পাঙ্ঘা আইন্না রাখ শয্যার উপরে।
রণ জিত্যা আইলে স্বামী বাতাস করতাম তারে\
কান্দিয়া দরিয়া বান্দী কহিতে লাগিল
এতদিনে কন্যা আপনার নচিব বোরা হইল।
বাহু হইতে খুল কন্যা বাজুবন্ধ তার।
গলা হইতে খুল কন্যা হীরামনের হার\
পাও হইতে খুল কন্যা নোউর পাঞ্জনী।
কোমর হইতে খুল কন্যা ঘুংঘুর ঝুনঝুনি\
শোন শোন বিবি আরে কইযে আপনেরে
আপনার স্বামী হইল বন্দী তাজপুর কারে।
এই কথা শুনিয়া বিবি উট্যা খাড়া হইল।
আসমান ভাঙ্গিয়া যেন শিরেতে পড়িল\
যে হোক সে হউক দরিয়া আমার কথা ধর।
শীঘ্র করি রণের ঘোড়া আন্যা খাড়া কর\
আমার স্বামীরে বন্দী করে শরীলের কত জোর।
সাজাও দেখি রণের ঘোড়া গেল কতদূর\
স্বামীর জন্য পিতার বিরুদ্ধে কন্যার যুদ্ধ যাত্রা। এককথায় বলা যায় সখিনা তার সহজাত-প্রবৃত্তির কারণে সার্থক উদ্ভাবনী শক্তি বলে বিপদ মুক্তির মানসে দুঃসাহসী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে এবং শত্রুকে পরাজিত করার জন্য আপন প্রতিভায় দীপ্তময় হয়ে উঠেছে। হৃদয়ের অপ্রতিরোধ্য গতিতে কিংবা সচেতন ক্রিয়ায় অনুভূতির সুগভীর তীব্রতায় বীরঙ্গনা সখিনা তেজস্বী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে।
সখিনা অমিত বিক্রমে যুদ্ধ করছিল পিতার বিরুদ্ধে। যুদ্ধের বিবরণটি গীতিকায় উপস্থাপন করা হয়েছে এভাবে-
সেপাই ফৌজদার যত আগে পাছে যায়।
পায় পাছানিতে ধুলা আসমানে উড়ায়\
দিনের পথ বাইয়া তারা এক দন্ডে যায়।
এই না সে কেল্লাতাজপুর সামনে দেখা যায়\
বাপ হইয়া দেখ দুষমন হইল।
ঘেরাও করিতে কেল্লা বিধি হুকুম দিল\
আড়াই দিন হইল রণে কেউ না জিতে হারে।
আগুন লাগাইল বিবি কেল্লাতাজ পুর শরে\
বড় বড় ঘর দরজা পুইড়া হইল ছাই।
রণে হারে বাসসার ফৌজ সরমের সীমা নাই\
এমন সময় শুনে সবে কোন কাম হইল।
তাজপুর তারা আস্যা নফর সালাম জানাইল
আপোষনামা লইয়া আইলাম দেখা করিবারে।
জঙ্গল বাড়ির নফর আমি জানাইযে তোমারে\
ফিরুজ খান দেওয়ান মোরে দিলাইন পাঠাইয়া।
খবর কহিতে তোমায় শুন মন দিয়া\
যার লাইগ্যা জ্বলে আগুন জঙ্গলবাড়ি শরে।
তালাক দিয়াছে দেওয়ান সেই সখিনারে।
জনশ্রুতি রয়েছে। ফিরুজখানকে যখন তাজপুর দুর্গে বন্দী করা হয়েছিল তখন সখিনা পুরুষের বেশ ধরে এবং সিপাহসালার হয়ে অজস্র সৈন্য নিয়ে ছুটে গিয়েছিলেন স্বামীকে উদ্ধার করে আনার জন্য। যুদ্ধ তখন চলছিল। সখিনার জয় হবে এমন সময় ওমর খান কূট কৌশলের আশ্রয় নিল। মিথ্যা তালাকনামা লিখে সখিনাকে বিভ্রান্ত করল ওমর খান। আর মিথ্যে তালাকনামাটি দেখে বীরঙ্গনা সখিনার কুসুম কোমল স্থানটিতে আঘাত পেল মারাত্মকভাবে। সমরাস্ত্র সজ্জিত বীরঙ্গনা মুহূর্ত মাত্র স্তব্ধ হয়ে ফিরুজ খানের নামমুদ্রাঙ্কিত বর্জ্জন পত্রের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে সংজ্ঞাশূন্য হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল এবং মৃত্যুবরণ করল। যুদ্ধটি সম্ভবত তাজপুর দুর্গের অতি নিকটে কুমড়ি নামক স্থানে সংঘটিত হয়েছিল। কারণ কুমড়িতেই সখিনার সমাধি অবস্থিত।
গীতিকায় ইতিহাসসিদ্ধ এই কাহিনীটি আমাদের গ্রাম্য কবির স্বভাবসুলভ সাদামাটা ভাষায় বর্ণিত হয়েছে। যা আমাদের হৃদয় মনকে খুব সহজেই আকৃষ্ট করে। নিরাভরণ অকৃত্রিম কাব্য ভাষায় উদ্ভাসিত হয়েছে।
বাংলার ৫টি রাজ্যের দুটি অভিজাত পরিবারের প্রতিচ্ছবি গীতিকার ছত্রে ছত্রে বিম্বিত করেছেন। কূটকৌশলের আশ্রয় নিয়ে অসম্ভবকে সম্ভব করার প্রয়াস চালালেও তার জন্য যে উমর খানকে অস্বাভাবিক মূল্য দিতে হয়েছে গীতিকা থেকে তা সহজেই অনুধাবন করা যায়।
এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে গাঁথা কাব্যটি ইতিহাস স্নাত হলেও জীবনধর্ম সাহিত্য-মূল্য নির্ধারণেও আমাদের হৃদয়তন্ত্রীতে ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করেছে।
-মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন শাহজাহান
(সংগৃহীত)