12/10/2025
ময়মনসিংহ বিভাগ নিয়ে ভাবনা
লিখেছেন মারুফ আহমেদ অন্তর
ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ ও টাঙ্গাইল—এই তিন জেলা নিয়ে বিভাগের দ্বন্দ্বটা এখন আর কোনো “মিষ্টি তর্কে” সীমাবদ্ধ নেই। বিভাগের বাইরে থাকা দুটি জেলার অনেক মানুষের ময়মনসিংহের প্রতি এতটা বিরূপ মনোভাব রয়েছে—এটা আগে কখনো জানতাম না। আজ সত্যিই অত্যন্ত দুঃখিত ও অপমানিত বোধ করছি।
যারা এই বিভাগের অংশ হতে না চেয়ে আন্দোলন করছে, তাদের কেন জোর করে যুক্ত করতে হবে? বিভাগভুক্ত হলে কি তাদের চারপাশে কাঁটাতারের বেড়া টানা হবে? আলাদা দেশ হয়ে যাবে নাকি ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হবে? ঢাকায় যেতে, থাকতে, ঘুরতে বা চিকিৎসা নিতে কি পাসপোর্ট লাগবে?
ময়মনসিংহ বিভাগ হওয়ার আগে আমার বিশ্বাস ছিল—আমরা “বৃহত্তর ময়মনসিংহ”, এক প্রাণের মানুষ। কিন্তু বিভাগ গঠনের সময় প্রথম বুঝেছিলাম, ওরা আসলে আমাদের সঙ্গে থাকতে চায় না। তখন ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ, কিশোরগঞ্জ-টাঙ্গাইলে রাষ্ট্রপতি, মন্ত্রী, এমপি—সবই ছিল উচ্চ পর্যায়ের প্রভাবশালী মানুষদের হাতে। ভেবেছিলাম, হয়তো রাজনৈতিক ইগো বা প্রভাবের কারণে এমনটা হয়েছে। কিন্তু পরে বুঝলাম, আসলে ঐ দুই জেলার সাধারণ মানুষও বিষয়টা চায়নি।
বাস্তবতা হলো—এই দেশে ১৯৪৭ সালে সবাই পাকিস্তান চায়নি, ১৯৭১ সালে সবাই মুক্তিযুদ্ধও চায়নি। নির্বাচনে ১০০% মানুষ কোনো দলকেই চায় না—না আওয়ামী লীগ, না বিএনপি, না জাতীয় পার্টি, না জামায়াত। কিন্তু বলা যায়, প্রায় ১০০% কিশোরগঞ্জ ও টাঙ্গাইলের মানুষ ময়মনসিংহ বিভাগের অংশ হতে চায়নি। তারা কেন চায়নি, সেটা তাদের বোঝা ও মর্জি—কিন্তু তাদের সেই মতামতকে অবশ্যই সম্মান দেওয়া উচিত।
আমার মনে হয় না, ময়মনসিংহের কেউই জোর করে কিশোরগঞ্জ ও টাঙ্গাইলকে নিজের সঙ্গে রাখতে চায়। এটা তো কোনো উপনিবেশ স্থাপনের বিষয় নয়—যেখানে কাউকে শোষণ বা নিপীড়ন করা হবে। তবুও বিষয়টি আমাকে কষ্ট দিয়েছে। বুঝেছি, “বৃহত্তর ময়মনসিংহ” অনেকটা ভারতের মতো—যেখানে মানুষ একে অপরের নাম শুনলেও কেমন দূরত্ব তৈরি করে ফেলে। সেই থেকেই আমার কাছে “বৃহত্তর ময়মনসিংহ” শব্দটি মূল্যহীন হয়ে গেছে।
তবুও এখনো মানুষে মানুষে কিছু সৌহার্দ্য রয়ে গেছে। কিন্তু যদি ঘৃণার এই ভাষা আরো ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে ভবিষ্যতে একে অপরের সঙ্গে কথা বলা, আত্মীয়তা রাখা—সবকিছু নিয়েই মানুষ দশবার ভাববে।
এগুলো আমার ব্যক্তিগত আবেগের কথা। এখন আসল বিষয়ে আসি।
দেশের পাহাড়ি অঞ্চলগুলো এমনিতেই সংবেদনশীল, তার মধ্যে সমতলে—বিশেষ করে চট্টগ্রাম বিভাগের সমতল ও মধ্যাঞ্চলে—এমন বিভাজন জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হতে পারে। শিক্ষা, চাকরি, বাণিজ্য, আত্মীয়তা, চিকিৎসা—এইসব কারণে মানুষ এক জেলা থেকে অন্য জেলায় যাতায়াত করে; এমন আবেগঘন বিভাজন তাদের নিরাপত্তাকেও হুমকির মুখে ফেলতে পারে, এমনকি রাষ্ট্রের অখণ্ডতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তাই আগুনে ঘি না ঢেলে, কিশোরগঞ্জ ও টাঙ্গাইলের মানুষের আবেগকে সম্মান জানিয়ে এই বিষয়টি এখানেই শেষ করা উচিত।
আর যদি কেউ বিভাজনের পথে এগোয়, তাহলে পরবর্তীতে আঞ্চলিক উন্নয়ন, বাজেট, জনসংখ্যা, রাজস্ব—সবকিছুই আলাদা হিসাব করতে হবে। এর ফলে বৈষম্য ও বিদ্বেষ আরও বাড়বে। ইতিমধ্যে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে, যা আমাদের রাষ্ট্রকে উন্নতির বদলে উল্টোদিকেই নিয়ে যাবে।