17/08/2026
সন্তানহারা পিতামাতার অসীম শোক পৃথিবীর সবচেয়ে করুণ ও কঠিন বেদনা। এই শোকের কোনো পূর্ণ নিরাময় নেই,হয়তো কখনোই নেই। দুঃখ-কষ্টের ভারে অস্থির হয়ে থাকা হৃদয় থেকে সন্তানকে কখনো ভুলা যায় না।
আমাদের আদরের রাজকন্যা জারা চলে যাওয়ার পর থেকে প্রতিটি ক্ষণে, প্রতিটি নীরবতায়, প্রতিটি নিঃশ্বাসে জারার শূন্যতা আমাকে গ্রাস করে। কখনো কখনো নিজেকে জীবন্মৃত বলে মনে হয়।
আমরা কেউই এই পৃথিবীতে চিরদিন থাকবো না।
মৃত্যু অনিবার্য, এ সত্য আমরা সবাই জানি এবং মেনে নিই।
কিন্তু চোখের সামনে সন্তানের চলে যাওয়ার দৃশ্য, তার অসহায় মুহূর্তগুলো, তার শেষ কথাগুলো যখন মনে পড়ে, তখন হৃদয়ের গভীরে এক অবর্ণনীয় শোকের তাণ্ডব শুরু হয়, যা থামানো যায় না। যুক্তি, দর্শন, ধৈর্য্য-সবকিছুই তখন যেন মুহূর্তের জন্য ম্লান হয়ে যায়।
সবাই যখন আমাকে শান্ত দেখে, তারা জানে না আমার ভেতর দিয়ে এক নিস্তব্ধ প্রলয় বয়ে যায়, যেখানে আমার সবটুকু ধৈর্য্য বারবার পরাজিত হচ্ছে।
অনিদ্রার দীর্ঘ প্রহরগুলোতে আকাশের তারাগুলো আমার নীরব সাক্ষী,যেখানে মেয়ের সাথে আমার গল্পের এক অন্য জগত গড়ে ওঠে। চারপাশের মানুষজন তাদের নিজ নিজ ব্যস্ততায় এগিয়ে চলে, কিন্তু আমার নির্ঘুম রাতের দীর্ঘশ্বাসগুলোতে অন্তর্জগতের পৃথিবীর অনেক রঙই যেন আজ ধূসর ও বিবর্ণ। যে অর্জন, যে সাফল্য-একসময় যা ছিল পরম আরাধ্য, আজ তার সবকিছুই বড্ড তুচ্ছ মনে হয়। কোনো কিছুই যেন আর আগের মতো আমায় টানে না।
জারার স্মৃতি কেবল অবচেতন মনে বয়ে চলা গুমরে কান্না নয়,
এ যেন বুকের গহীনে এক অতল হাহাকার আর অপূরণীয় শূন্যতার জন্ম দেয়। বিষণ্ণতা এ মনকে বুকটাকে ভারী করে তোলে। তবুও সেই স্মৃতিই আবার আমাকে মনে করিয়ে দেয়-
সে আমার জীবনের সবচেয়ে নির্মল ভালোবাসা, সবচেয়ে পবিত্র অধ্যায়।
তার স্মৃতিকে তার মানবীয় গুনাবলী তার মেধাকে বুকে নিয়ে, তার নামে মানুষের জন্য কিছু করে যাওয়াই হয়তো আমার বেঁচে থাকার এক নীরব শক্তি নিঃশব্দ প্রেরনা।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখি, মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) তাঁর সন্তানদের হারিয়েছেন, আব্রাহাম লিংকন তাঁর সন্তানকে হারিয়েছেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, চার্লস ডারউইন, ভিক্টর হুগো, লুই পাস্তুরসহ বহু মহান ব্যক্তি তাদের প্রিয় সন্তানদের মৃত্যুতে গভীরভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। তাঁরা কেঁদেছেন, শোক করেছেন, নিঃসঙ্গ হয়েছেন। কিন্তু তাঁরা শিখিয়েছেন-শোককে অস্বীকার নয়, শোককে অর্থবহ করে তুলতে হয়।
মহানবী (সা.) বলেছেন, “চোখ অশ্রু ঝরায়, হৃদয় ব্যথিত হয়, তবে আমরা এমন কিছু বলব না যা আমাদের রবের অসন্তোষের কারণ হয়।” এই শিক্ষাই আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কান্না দুর্বলতা নয়,এটি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ।
আমার উপলব্ধি হলো-সন্তান হারানোর শোক কাটিয়ে ওঠা যায় না।কেউ প্রার্থনায় শান্তি খুজে পান, কেউ সৃষ্টিশীলতায়, কেউ মানবসেবায়, কেউ স্মৃতিকে বুকে ধারণ করে জীবনের পথ চলেন।
আমাদের মতো সন্তানহারা পিতামাতার জন্য সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা হয়তো এই প্রিয় সন্তানের স্মৃতিকে মানুষের কল্যাণে বাচিয়ে রাখা। যখন কোনো অসহায় মানুষ সাহায্য পায়, কোনো রোগী চিকিৎসা পায়, কোনো বিপদগ্রস্ত পরিবার আশার আলো খুঁজে পায়-তখন মনে হয় আমাদের সন্তানের ভালোবাসা অশরীরী হয়ে পৃথিবীতে বেঁচে আছে।
শোক হয়তো কখনো চলে যাবে না। কিন্তু সেই শোকের ভেতর থেকেও ভালোবাসা, মানবতা ও কল্যাণের আলো ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। আর হয়তো এভাবেই আমাদের প্রিয় সন্তানেরা স্মৃতির আকাশে নয়, মানুষের অন্তরে বেঁচে থাকে।
সকল সন্তানহারা মা-বাবার প্রতি গভীর সহমর্মিতা ও দোয়া।
আল্লাহ আমাদের ধৈর্য্য দান করুন এবং আমাদের প্রিয় সন্তানদের জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করুন।
আমিন।
মোশতাক আহমেদ রুহী