22/03/2026
বই: বেতার-টেলিভিশন-গ্রামোফোন শিল্পী বাউলকবি আব্দুল মজিদ তালুকদার: জীবন ও সংগীত
লেখক: অধ্যক্ষ মোঃ গোলাম মোস্তফা
প্রকাশনা: অয়ন প্রকাশন, বইমেলা ২০২৬
পৃষ্ঠা: ২০৮
বাংলার লোকসংগীত ঐতিহ্যের এক অনন্য ধারক-বাহক বাউলকবি আব্দুল মজিদ তালুকদারকে নিয়ে রচিত এই গ্রন্থটি শুধু একটি জীবনীগ্রন্থ নয়; এটি মূলত এক বিস্মৃতপ্রায় সাংস্কৃতিক ইতিহাসের দলিল। অধ্যক্ষ মোঃ গোলাম মোস্তফা অত্যন্ত যত্ন, নিষ্ঠা ও গবেষণার ভিত্তিতে এই গ্রন্থটি রচনা করেছেন—যা পাঠককে একই সঙ্গে আবেগ, ইতিহাস ও সংগীতের জগতে নিয়ে যায়। লেখক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা তথ্য, স্মৃতি ও দলিল সংগ্রহ করে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনী নির্মাণের চেষ্টা করেছেন, যা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।
গ্রন্থটি শুরু হয়েছে একটি গভীর অনুভবসমৃদ্ধ ভূমিকার মাধ্যমে, যেখানে লেখক মজিদ তালুকদারের জীবনদর্শন, সংগীতভাবনা ও সামাজিক প্রভাবের একটি সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরেছেন। এরপর ধারাবাহিকভাবে তাঁর জন্ম, শৈশব, শিক্ষা, বাউল সাধনায় প্রবেশ, সংগীতচর্চা, ব্যক্তিজীবন, রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে তাঁর ভূমিকা ইত্যাদি বিষয় বিশদভাবে আলোচিত হয়েছে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, বইটিতে মজিদ তালুকদারের শিল্পীজীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো—যেমন সর্বভারতীয় কৃষক সম্মেলনে সংগীত পরিবেশন, অল ইন্ডিয়া রেডিও ও বাংলাদেশ বেতারে কাজ, গ্রামোফোনে গান রেকর্ড করা, ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ-প্রেরণাদায়ী গান রচনা—ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
এই গ্রন্থের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো এর গবেষণামূলক গভীরতা। লেখক শুধু তথ্য সংগ্রহেই থেমে থাকেননি; বরং বিচ্ছিন্ন, হারিয়ে যাওয়া দলিল, ডায়েরি, চিঠিপত্র, লোকমুখে প্রচলিত তথ্য—সবকিছু মিলিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র নির্মাণের চেষ্টা করেছেন। তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন যে, সংরক্ষণের অভাবে অনেক তথ্য হারিয়ে গেছে, তবুও তাঁর এই প্রচেষ্টা অত্যন্ত মূল্যবান। গ্রন্থটিতে মজিদ তালুকদারের গানকে শুধু সংগীত হিসেবে নয়, বরং একটি সামাজিক দলিল হিসেবে দেখা হয়েছে। তাঁর গানে গ্রামীণ জীবন, মানবিক সম্পর্ক, ধর্মীয় দর্শন, রাজনৈতিক চেতনা—সবকিছুই প্রতিফলিত হয়েছে। লেখক দেখিয়েছেন, কীভাবে তাঁর গান কবিতার গুণে সমৃদ্ধ এবং শব্দ, সুর ও ভাবের সমন্বয়ে এক অনন্য শিল্পরূপ লাভ করেছে।
ভাষা সহজ, সাবলীল এবং প্রাঞ্জল। গবেষণাধর্মী হলেও বইটি একঘেয়ে নয়; বরং গল্পধর্মী বর্ণনার কারণে পাঠক সহজেই মজিদ তালুকদারের জীবনযাত্রার সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারেন। গ্রামীণ আবহ, বাউল সংস্কৃতি এবং সময়ের পরিবর্তন—সবকিছু জীবন্ত হয়ে ওঠে লেখকের বর্ণনায়। লেখক নিজেই উল্লেখ করেছেন যে, পূর্ণাঙ্গ তথ্যের অভাব থাকতে পারে। তবে এই সীমাবদ্ধতা বইটির সামগ্রিক গুরুত্বকে খুব বেশি প্রভাবিত করে না। বরং এই ধরনের গবেষণার ক্ষেত্রে এটি স্বাভাবিক বলেই মনে হয়।
এই গ্রন্থটি বাংলাদেশের লোকসংগীত ও বাউলধারার গবেষণায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। এটি শুধু একজন শিল্পীর জীবনী নয়, বরং একটি সময়, একটি সংস্কৃতি এবং একটি সৃজনশীল ঐতিহ্যের দলিল। ভবিষ্যৎ গবেষক, সংগীতপ্রেমী এবং সংস্কৃতিবিদদের জন্য বইটি অত্যন্ত মূল্যবান। “বেতার-টেলিভিশন-গ্রামোফোন শিল্পী বাউলকবি আব্দুল মজিদ তালুকদার: জীবন ও সংগীত” বইটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—লোকসংস্কৃতির ভান্ডারে এখনো অনেক অমূল্য রত্ন লুকিয়ে আছে, যা সংরক্ষণ ও গবেষণার মাধ্যমে সামনে আনা জরুরি। এই বই সেই প্রয়াসের একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। লোকসংগীতপ্রেমী, গবেষক ও সংস্কৃতিমনস্ক পাঠকের জন্য বইটি অবশ্যপাঠ্য।
হাসান ইকবাল
২২ মার্চ ২০২৬, আটপাড়া, নেত্রকোণা