01/06/2026
সততার ‘খেজুর’ বনাম দশ কোটির ‘নাটক’: জবাবদিহিতা নাকি ড্যামেজ কন্ট্রোল?
রাজনীতিতে একটা বহুল প্রচলিত প্রবাদ আছে—"চুরি বিদ্যা বড় বিদ্যা, যদি না পড়ে ধরা।" কিন্তু যখন বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়ে ক্ষমতার অলিন্দে বসা কেউ এই চেনা বৃত্তে আবর্তিত হন, তখন সাধারণ মানুষের মোহভঙ্গ ঘটে। সম্প্রতি হাসনাত আব্দুল্লাহর নিজ উপজেলার জন্য দশ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ এবং তা নিয়ে তৈরি হওয়া জলঘোলা পরিস্থিতি আমাদের সেই রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
প্রশ্নটা খুব সহজ এবং সোজা—আশপাশের অন্যান্য উপজেলায় যেখানে সরকারি বরাদ্দ মাত্র ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা, সেখানে কোন দৃশ্যমান বা অদৃশ্য ক্ষমতার বলে একটি নির্দিষ্ট উপজেলায় ১০ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়ে যায়? এই প্রশ্নের মুখে যখন কোনো সৎ উত্তর থাকে না, তখন খুব চেনা এক আলগা যুক্তি সামনে আনা হয়—"এটা তো সব রাজনীতিবিদই করে, নিজের এলাকার উন্নয়ন কে না চায়?"
কিন্তু সাধারণ মানুষ আজ জানতে চায়, যদি পুরোনো আমলের সুবিধাবাদী রাজনীতিবিদদের মতোই ক্ষমতার জোরে নিজ এলাকায় কোটা বা বিশেষ সুবিধার পাহাড় গড়তে হয়, তবে আপনাদের সাথে সেই পুরোনো ব্যবস্থার পার্থক্যটা কোথায়? আপনারা কি সাধারণ মানুষকে এতই ‘ভুদাই’ ভাবেন যে, নৈতিকতার ছবক দিয়ে পেছনের দরজা দিয়ে ক্ষমতার মধু খাবেন, আর মানুষ তা মুখ বুজে সয়ে নেবে?
সবচেয়ে বড় তামাশাটা মঞ্চস্থ হলো গতকাল। সোশ্যাল মিডিয়ায় যারা এক কাপ চা কিংবা কয়েকটা খেজুরের খরচের নিখুঁত হিসাব দিয়ে নিজেদের ‘মহাপুরুষ’ প্রমাণ করতে দিনরাত ব্যস্ত থাকেন, তারা এই দশ কোটি টাকার বরাদ্দের ব্যাপারে এতদিন কেন মুখে কুলুপ এঁটেছিলেন? গতকাল জেলা প্রশাসক যদি এই বৈষম্যের খতিয়ান এবং বরাদ্দের ব্যাপারটা জনসমক্ষে নিয়ে না আসতেন, তবে কি আজ এই তথাকথিত ‘সততার প্রমাণ’ বা ফেসবুক লাইভের নাটক দেখতে পেতাম আমরা? কখনই না। জেলা প্রশাসক সত্যটা সামনে এনে দেওয়াল পিঠ ঠেকিয়ে দিয়েছেন বলেই আজ বাধ্য হয়ে ড্যামেজ কন্ট্রোলের জন্য এই সাফাই গাইতে হচ্ছে। প্রশাসন চেপে না ধরলে এই কালা মাগুরদের পেটের কথা কি কোনোদিন বের হতো?
আজ বৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বলে, সাধারণ মানুষের আবেগকে পুঁজি করে যারা আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন, তাদের চামচামি বা চাটচাটি করার লোকের অভাব নেই। কিন্তু ন্যূনতম সাধারণ জ্ঞান থাকা যেকোনো মানুষ বোঝে—এই বরাদ্দ কোনো নিয়মতান্ত্রিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় আসেনি, এসেছে ‘প্রভাব’ আর ‘দালালি’র জোরে।
সাধারণ মানুষের বুদ্ধিমত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার দিন শেষ। ইতিহাস সাক্ষী, ক্ষমতার মদে চুর হয়ে যারা চোরের সাফাই গায়, তাদের পতন অনিবার্য। আজ হোক বা কাল—হাসনাত, সারজিস, মাহফুজ কিংবা মাসুদদের জবাবদিহিতার কাঠগড়ায় দাঁড়াতেই হবে। বৈষম্য তাড়ানোর গল্প শুনিয়ে যারা নতুন করে বৈষম্যের সাম্রাজ্য গড়ছেন, তাদের মুখোশ উন্মোচিত হতে খুব বেশি সময় লাগবে না। ক্ষমতার মধু চিরস্থায়ী নয়, এটা যত দ্রুত তারা বুঝবেন, ততই মঙ্গল।