18/06/2015
শিশুপ্রিয় মহানবী হযরত
মুহাম্মদ (সা.)
এ জেড. এম. শামসুল আলম
শিশুদের সঙ্গে রাসূলুল্লাহ্ (সা.) এর ব্যবহার ছিল
স্নেহপূর্ণ, কোমল এবং বন্ধুসুলভ। তিনি তাদের হাসি
আনন্দে যোগ দিতেন। ছোটদের চপলতায় তিনি কখনও
অসন্তুষ্ট বা বিরক্ত হতেন না। রাসূলুল্লাহ্ (সা.)
তাদের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতেন।
বড়রা সাধারণত শিশুদের কথা মন দিয়ে শোনেনা।
হা, হু, করে যায়। শিশুরা কিন্তু তা বুঝতে পারে।
রাসূলুল্লাহ্ (সা.) তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে
শুনতেন বলে তারা তাঁকে ছাড়তে চাইতোনা।
হযরত আনাস (রা.) বর্ণনা করেন, আমি একদিন
রাসূলুল্লাহ্ (সা.) এর সাথে পথ চলছিলাম। পথের
পাশে একদল ছেলে খেলা করছিলো। রাসূল (সা.)
তাদের কাছে থেমে গেলেন এবং সালাম
জানালেন। পথ চলার সময় অন্যদেরকে বিশেষ করে
শিশুদেরকে সালাম জানানো নবী করিমের অভ্যাস
ছিলো।
সাহাবী জাবের বিন সামুরা (রা.) তাঁর
বাল্যকালের একটি ঘটনার বর্ণনা দেন। ছোট সময়
তিনি একদিন রাসূলুল্লাহ্র (সা.) পেছনে সালাত
(নামাজ) আদায় করছিলেন। সালাত পেশ করে
রাসূলুল্লাহ (সা.) ঘরের দিকে রওনা হন। জাবের বিন
সামুরাও পিছে পিছে তাঁকে অনুসরণ করেন।
কিছুপথ অতিক্রম করার পর হঠাৎ একদল শিশু এসে
রাসূল (সা.) কে ঘিরে ধরলো। জাবের বিন সামুরাও
(রা.) তাদের সঙ্গে যোগ দিলেন। রাসূল (সা.) সব
শিশুকে আদর করলেন। হাত মুসাফা করলেন, মাথায়
হাত বুলালেন এবং বাজের বিন সামুরাকেও আদর
করলেন।
শিশুদেরকে দেখাবার জন্য আনয়ন
সাহাবীরা তাঁদের নিজ এবং আত্মীয় শিশু
সন্তানদেরকে দেখানোর জন্য রাসূলের কাছে নিয়ে
আসতেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা.) তাদের মাথায় হাত
বুলাতেন। নিজের মুখে খেজুর চিবিয়ে ছোট
শিশুদের মুখে দিতেন এবং তাদের জন্য দোয়া
করতেন।
সাহাবিরা উম্মে কায়েসের পুত্র
একদিন প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) খাওয়ার জন্য
বসেছিলেন। কিন্তু খানা তখনও শুরু করেননি। উম্মে
কায়েস বিনতে মুহসিন (রা.) তাঁর শিশু পুত্রটিকে
কোলে করে রাসূল (সা.) এর সাথে দেখা করতে
আসেন।
শিশুটিকে দেখে রাসূল (সা.) খানা ছেড়ে তার
দিকে এলেন। পরম আদরে শিশুটিকে কোলে তুলে
নিয়ে খাবারের স্থানে গিয়ে বসলেন। শিশুটি
নবীর আদর পেয়ে তাঁর কোলেই পেশাব করে
ভিজিয়ে দিলো।
রাসূল (সা.) স্মিত হাসলেন। চেহারায় বিন্দুমাত্র
বিরক্তি প্রকাশ পেলোনা। তিনি কিছু পানি
আনার জন্য একজনকে বললেন। পানি আনা হলে যে
যে জায়গায় পেশাব পড়েছিল সেখানে তিনি পানি
ঢেলে দিলেন। বাগানের ফুল যেমন পবিত্র, মায়ের
কোল থেকে নেয়া শিশুও তেমন পবিত্র।
উটের পিটে দু’শিশু
রাসূলুল্লাহ্ (সা.) যখন কোনো সফর শেষে বাড়ি
ফিরতেন তখন শিশু কিশোরদেরকে তিনি নিজ
সওয়ারীর উপর তুলে নিতেন, তাদেরকে আগে-পিছে
বসিয়ে বাড়ির ভিতরে ঢুকতেন।
একদিন দু’শিশু রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর উষ্ট্রির উপরে
উঠে বসেছে। একজন তাঁর সম্মুখে, আর একজন পিছনে।
যে শিশুটি সামনে বসেছিলো সে পিছনের
শিশুটিকে লক্ষ্য করে বললো, আমি রাসূলুল্লাহ্র
(সা.)-এর সামনে বসেছি, তুই বসেছিস পিছনে।
পিছনের শিশুটিও রাসূলুল্লাহ্ (সা.) কে দু’হাত দিয়ে
ধরে বলে উঠলো আমিতো নবীর গায়ের সঙ্গে মিশে
আছি। সামনের শিশুটি তখন রাসূল (সা.)-এর বুকের
দিকে হেলান দিয়ে বললো, আমি নবীর গায়ে
হেলান দিয়ে বসে আছি।
পিছনের শিশুটি তার ছোট্ট হাত দিয়ে রাসূল (সা.)
কে জড়িয়ে দরে বললো, আমি রাসূল (সা.) কে দু’হাত
দিয়ে জড়িয়ে ধরেছি। সামনের শিশুটি এবার বলার
জন্য কিছু পেলনা। রাসূলুল্লাহ্ (সা.) তার গাযে হাত
রাখলেন। শিশুটি আরো আনন্দিত হলো।
মদীনার শিশু কর্তৃক অভ্যর্থনা।
হিজরতের পর মরু প্রান্তর অতিক্রম করে পথশ্রান্ত
মহানবী (সা.) উপস্থিত হলেন মদিনার উপকণ্ঠে কুবা
পল্লীতে। মদিনার নারী পুরুষ তাঁকে খোশ আমদেদ ও
সম্বর্ধনা দেয়ার জন্য স্থানে স্থানে ভিড়
করছিলো। কেউ গাছের উপর উঠেও তাঁর উট দেখার
চেষ্টা করছিলো। তিনি যে উটে চড়ে কুবা হয়ে
মদিনায় প্রবেশ করেন তার নাম ছিল আল কাসওয়া।
একই উটে প্রিয় নবী (সা.) পিছনে বসেছিলেন শ্রেষ্ঠ
সাথী হযরত আবু বকর (রা.)। পথ দেখিয়ে এনেছিলেন
আবদুল্লাহ্ বিন উরাইকিত নামক একজন অমুসলিম।
কাফিরদের ঘোষিত ১০০টি উট পাওয়ার লোভে
তিনবার তাঁদের আক্রমণ করেছিল সুরাকা বিন
মালিক।
কুবায় রাসূলুল্লাহ্ (সা.) বনি আম বংশের কুলসূম ইবনে
হাদাম এবং সাদ ইবনে খাইসামার অতিথি ছিলেন।
কুবায় প্রিয় নবী (সা.) চৌদ্দ দিন অবস্থান করে
মদিনায় যাত্রা করেন। (বুখারী) দিনটি ছিল
শুক্রবার।
এদিন রাসূলুল্লাহ্ (সা.) কুবা পল্লী ত্যাগ করে
মদিনার দিকে অগ্রসর হয়ে বানুনা উপত্যাকায় বনি
সালেম ইবনে আওফ মহল্লায় তশরিফ আনেন এবং ঐ
মহল্লায় জুমার নামাজ আদায় করেন। এটা ছিল
ইসলামের ইতিহাসের প্রথম জুমার নামাজ।
বনি সালেম মহল্লা থেকে রাসূল (সা.) মদিনায়
রওনা হন। মদিনাবাসীরা নবী (সা.) আগমনের খবর
এর মাঝেই পেয়ে গিয়েছিলো।
মদিনার বয়স্ক নারী-পুরুষের সাথে শিশুরাও প্রিয়
নবী (সা.) কে দেখার জন্য পথের পাশে ভিড়
করেছিলো। ‘আল্লাহু আকবার’, রাসূলুল্লাহ্ (সা.)
এসেছেন। ‘আল্লাহু আকবার, মুহাম্মদ (সা.) এসেছেন।’
‘আল্লাহু আকবার, জান্নাতের নেয়ামত মদিনায়
এসেছেন, শান্তির দূত আমাদের মাঝে এসেছেন।’ এ
সমস্ত কথা বলে তাঁর জন্য অপেক্ষমান জনতা আনন্দ
প্রকাশ করছিলো।
রাসূলুল্লাহ্ (সা.) উটনী (কাসওয়া) বনি মালিক
ইবনে আন নাজ্জারের দু’টি এতিম বালক সুহাইল ইবন
আমার (রা.) এবং সাহল ইবনে আমারের (রা.) উট
বাঁধার এবং খেজুর শুকোবার স্থানে বসে
পড়েছিলো। সুহায়ল (রা.) ও সাহল (রা.) এর
অভিভাবক ছিলেন আসাদ ইবনে জুবারা (রা.)। দশ
স্বর্ণ মুদ্রা দিয়ে এ জমি ক্রয় করা হয়েছিল। মুদ্রা
দিয়েছিলেন হযরত আবু বকর (রা.)।
অন্যদের সাথে সাথে শিশুরাও বলছিলো ‘‘ইয়া
মুহাম্মদ (সা.) সালামু আলাইকা’’, ইয়া রাসূলুল্লাহ্
(সা.) সালামু আলাইকা।’’ শিশুদের সমবেত সুললিত
কণ্ঠধ্বনি মহানবী (সা.) এর বেশ ভাল লাগলো।
তাদের আনন্দে তিনিও আনন্দিত হলেন এবং উট
থেকে তাদের কাছেই নেমে গেলেন। তাদের হাত
ধরলেন, মাথায় হাত রাখলেন, চিবুক ধরে আদর
করলেন।
অন্যদের সাথে সাথে বনি নাজ্জারের শিশু-
কিশোরীরা কবিতা আবৃত্তি করে, রাসূলুল্লাহ্কে
খোশ আমদেদ জানায়। তাদের কবিতার একটি বাক্য
ছিলো- আমরা নাজ্জার গোত্রের মেয়ে, কি
সৌভাগ্য আমাদের, মুহাম্মদ (সা.) আমাদের
প্রতিবেশী। রাসূলুল্লাহ্ আবু আইয়ুব আনসারীর (রা.)
আতিথ্য গ্রহণ করেন।
মহানবী (সা.) শিশুদের জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা
কি আমাকে পছন্দ কর? আমাকে ভালোবাস? শিশুরা
মহানন্দে জবাব দিলো, ‘‘অবশ্যই রাসূলুল্লাহ্ (সা.)।
আমরা আপনাকে পছন্দ করি। আনাকে আমরা
ভালোবাসি।’’ আল্লাহ্র রাসূল (সা.)ও মধূর হাসি
হেসে তাদের দিকে হাত বাড়িয়ে বললেন, আমিও
তোমাদেরকে পছন্দ করি। আমিও তোমাদেরকে
ভালোবাসি।
মক্কার বনু হাশেম কবিলার শিশুদের আনন্দ
আল্লাহ্র রাসূল (সা.) মানুষকে ভালোবাসতেন,
বিশেষ করে শিশুদেরকে, এ ভালোবাসার অনুভূতি
তাঁর কথায় এবং বহু কর্মে প্রকাশিত হয়েছিলো।
মহানবী (সা.) যখন মক্কায় হজ্জ করতে যান, মক্কার
শিশুরাও তাঁর আগমণে আনন্দ প্রকাশ করেছিলো।
বনু হাশেম গোত্রের শিশুদের আনন্দ ছিল সবচেয়ে
বেশি। একস্থানে তিনি নিজের উট থেকে নেমে
যান এবং শিশুদেরকে উটে বসিয়ে দেন। তারা
প্রিয়নবী (সা.)-এর উটে বসে আনন্দ উচ্ছ্বাসে
বিগলিত হয়ে উঠেছিলো।
নিষ্পাপ শিশু
শিশুরা ফিরিস্তাদের ন্যায় নিষ্পাপ। তারা
কোনো ষড়যন্ত্র করে মানুষের ক্ষতি করেনা। অসৎ
চিন্তা তাদের মাথায় আসেনা। তারা মানুষের মনে
কষ্ট দেয়না। তাদের কষ্টে বড়দের মনে কষ্ট হয়। বড়রা
তাদের নিরাপত্তা এবং হেফাজতের জন্যে বেশ
উদ্বিগ্ন হন।
জন্মকালে কত দুর্বল ও অসহায় মানব শিশু। কিন্তু
কালক্রমে হয়ে উঠে কত শক্তিশালী। শিশু ফুটন্ত
গোলাপ নয়; গোলাপ কুঁড়ি। মনিমুক্তা প্রাণহীন।
শিশু বেহেস্ত বিচ্যুত জীবন্ত মনিমুক্তা।
শিশুহীন ঘর
ঘর সাজাতে হলে শিশু প্রয়োজন। যতসব মূল্যবান
আসবাবপত্র দ্বারাই গৃহ পূর্ণ করা হোক না কেন;
একটি শিশু ঘরটিকে যত জীবন্ত, আনন্দময় এবং সুন্দর
করে তোলে, অতি মূল্যবান আসবাবপত্র তার তুলনায়
মূল্যহীন।
শিশু আল্লাহ্র প্রদত্ত নিয়ামত। পরিবারে সন্তান
এলে মানুষের মন উদার হয়। প্রশস্ত হয়।
নিঃস্বার্থভাবে অন্যের জন্যে কিছু করা উত্তম
প্রশিক্ষণের মাধ্যমে হলো শিশু।
স্নেহ, ভালোবাসা, মমতারূপ মানবীয় গুণাবলী
বিকাশ লাভ করে অপত্যস্নেহের মাধ্যমে। সন্তানের
মাধ্যমে মানুষ, দেশ, জাতি এবং সভ্যতায় অবদান
রেখে যায়।
লেখক : সাবেক সচিব, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ
সরকার।