18/03/2016
চট্টগ্রাম: গলায় টিউব লাগানো। নাকে রাইস টিউব। হাতে ক্যানোলা। বাবা-মা মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে অনেক ডাকাডাকির পর হয়তো চোখ খুলে। নয়তো নিস্তেজ পড়ে থাকে। কৃত্রিম শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে লাইফ সাপোর্টে আছে চামেলি। এক দিন, দুই দিন নয়। এভাবে অজ্ঞান অবস্থাতেই চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের ২২ নম্বর ওয়ার্ডের আইসিইউতে কাটাচ্ছেন ছয় মাস।
২০১৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর কলেজ থেকে ফেরার পথে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা শিকার হন চামেলি। একটি যাত্রীবাহী বাস নোয়াখালীর চাড়াভিটা এলাকার বাগানবাড়ির সামনে চামেলিদের সিএনজি অটোরিকশাকে পেছন থেকে ধাক্কা দিয়েছিল। ওই সিএনজি অটোরিকশায় ছিলেন জেঠাতো বোন সাইমা আদনান তান্নিও (২১)। গুরুতর আহত তান্নি তিন দিন পরই চলে যান না ফেরার দেশে। চামেলি ভাগ্যবতী, বেঁচে আছেন। তবে জিন্দা লাশ হয়ে।
চামেলির ভালো নাম রিহাম আফসানা (২০)। মাইজদীর নোয়াখালী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের গণিত বিভাগে সম্মান দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। ২০ বছরের ফুটফুটে মেয়েটি এখন ১২ বছরের কিশোরীর মতো দেখতে। এখন চামেলিকে দেখে কে বলবে, মেয়েটি মধ্য চরকাঁকড়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি এবং এসএসসিতে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছিল। কে বলবে, মেয়েটি সরকারি মুজিব কলেজ থেকে এইচএসসিতেও জিপিএ-৫ পেয়েছিল। সম্মান প্রথম বর্ষে সে কলেজে প্রথম স্থান অধিকার করেছিল।
শনিবার রাতে চামেলির খোঁজখবর নিতে গেলে কথা হয় কর্তব্যরত চিকিৎসকের সঙ্গে। তিনি জানান, দুর্ঘটনায় চামেলির মস্তিষ্কে ইফেক্ট হয়েছে। কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে বর্তমানে তিনি লাইফ সাপোর্টে আছেন। জ্ঞানের লেবেলটা সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক অনেক কম। তবে আগের তুলনায় তার অবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে।
চামেলির বাবা মিজানুর রহমান ও মা জান্নাতুন নেসা সারাক্ষণই মেয়ের দেখাশোনা করছেন। দেখাশোনা মানে আর কি, সময় মতো আনার, মাল্টা, কমলার রস, দুধ, স্যুপ ইত্যাদি তরল খাবার রাইস টিউবে ঢেলে দেওয়া। বাকি সময়টুকু কান্নাকাটি আর মেয়েকে আদর করা। মাথায় হাত বোলানো। এক্সরে, রক্ত পরীক্ষাসহ ওষুধপথ্যের খরচের টাকা জোগাড় করা।
জান্নাতুন বাংলানিউজকে বলেন, দুর্ঘটনার পর পুরোপুরি অচেতন ছিল চামেলি। এ হাসপাতালে ভর্তির এক মাস পর ডান চোখ খুলে সে। তিন মাস পর বাম চোখ খোলে। ডাক্তাররা বলেছেন, চামেলি ভালো হবে। তবে সময় লাগবে।
মিজানুর রহমান বাংলানিউজকে বলেন, আমার মেজ মেয়ে চামেলি। বড় মেয়ে চামেলির কলেজেই স্নাতকোত্তর শ্রেণিতে পড়ছে। ছেলে স্নাতকে পড়ে। ছোট মেয়ে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। চামেলি ছিল সবার চেয়ে মেধাবী। আজ ছয় মাস ধরে হাসপাতালে পড়ে আছি। দুই মেয়েকে তাদের নানার বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছি। উপায় নাই দেখে ছেলেটিকে ঢাকায় পাঠিয়েছি একটি দোকানে কাজ করার জন্যে।
একসময় মিজানুর মধ্যপ্রাচ্যে ছিলেন। যা আয় করেছিলেন তা দিয়ে ২০০৯ সালে দেশে ফিরে বাড়ির পাশেই ছোটখাটো ব্যবসা শুরু করেছিলেন। খেয়েপরে মোটামুটি চলছিল পাঁচ সদস্যের পরিবারটি। একটি দুর্ঘটনা পুরো পরিবারটিকে পথে বসিয়েছে। সবার স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়েছে।
বলতে বলতে চোখের পানি ধরে রাখতে পারলেন না এ বাবা। বললেন, দুর্ঘটনার পরপরই আমরা চট্টগ্রামের ট্রিটমেন্ট হাসপাতালে মেয়েকে ভর্তি করেছিলাম। ১০ দিনে বিল দিয়েছি ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা। এরপর চমেক হাসপাতালে নিয়ে আসি মেয়েকে। এখানকার ডাক্তার-নার্স থেকে শুরু করে আয়া-মাসি সবাই আন্তরিকভাবে দেখাশুনা করছেন চামেলিকে। তাদের কাছে আমরা কৃতজ্ঞ। এ পর্যন্ত ৬ লাখ ৮৬ হাজার টাকা খরচ করেছি। ধার-দেনা করেছি। সহায়-সম্বল সব বিক্রি করেছি। আজও (রোববার) মেট্রো ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে পোর্টেবল এক্স-রে মেশিন এনে মেয়ের এক্স-রে করিয়েছি। চামেলির বাবা ডাক শোনার জন্যেই এতটা পথ পাড়ি দিয়েছি। এখন আমি অসহায়। একজন বাবা হিসেবে মেয়ের চিকিৎসার জন্যে সবার সাহায্য চাই।
বাংলাদেশ সময়: ১১২৪ ঘণ্টা, মার্চ ১৪, ২০১৬
http://www.banglanews24.com/fullnews/bn/473785.html
গলায় টিউব লাগানো। নাকে রাইস টিউব। হাতে ক্যানোলা। বাবা-মা মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে অনেক ডাকাডাকির পর হয়তো চোখ খুলে।