31/08/2015
রাধাগোবিন্দ চন্দ্র
পর্ব ২
জন্ম, কর্ম ও শিক্ষা:
যশোহর জেলার বকচর গ্রামে ১৬ই জুলাই ১৮৭৮ সালে রাধাগোবিন্দের জন্ম। তিনি যশোর জিলা স্কুলের ছাত্র ছিলেন। স্কুলের গতানুগতিক পড়ালেখার চাইতে রাতের আকাশের প্রতি তাঁর আকর্ষণ ছিল বেশী। স্কুল তাই শিকেয় উঠে। তৎকালীন সময়ে তিনি জিলা স্কুল হইতে এন্ট্রাস পরীক্ষায়ও অংশগ্রহণ করেন, কিন্তু পরীক্ষায় অকৃতকার্য হন। ১৯০০ সালের দিকে ২২ বৎসর বয়সে যশোহর কালেক্টরেট অফিসের ১৫ টাকা বেতনের সামান্য কেরানির চাকরি গ্রহণ করেন।
রাধাগোবিন্দের জ্যেতির্বিজ্ঞান চর্চা যেভাবে শুরু:
শিশু বয়স থেকেই রাধা রাতের আকাশের সঙ্গী ছিলেন। তারারা তাঁকে ঘুম পাড়িয়েছে। তারারা তাঁর ঘুম ভাঙ্গিয়েছে। রাধা যখন ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র ছিলেন তখন তাঁর পাঠ্যপুস্তক ছিল ‘চারুপাঠ তৃতীয় ভাগ’। এই বইয়ে অক্ষয়কুমার দত্তের প্রবন্ধ ‘ব্রহ্মান্ড কি প্রকান্ড’ পাঠ করেই রাধাগোবিন্দ জ্যেতির্বিজ্ঞানী হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। তারা কি, গ্রহ কি, বিশ্বের সীমানা কি, এসব নানাবিধ প্রশ্ন তখন তাঁর মনে। তিনি তাঁর আত্নজীবনীমূলক পান্ডুলিপিতে এ সম্পর্কে লিখেছেন, ‘অক্ষয় কুমার দত্তের চারুপাঠ তৃতীয় ভাগ পড়িয়া, নক্ষত্রবিদ হইবার জন্যে আর কাহারো বাসনা ফলবর্তী হইয়াছিল কিনা জানি না, আমার হইয়াছিল। সেই উদ্দাম ও উশৃঙ্খল বাসনার গতিরোধ করিতে আমি চেষ্টা করি নাই।”
১০ বছর বয়সে রাধাগোবিন্দ চন্দ্র যশোর জিলা স্কুলে ভর্তি হন। এ সময় থেকেই বকচরের একতলা বাড়ির ছাদে সন্ধ্যার পর পরই রাধা আকাশ দেখা শুরু করেন। কিন্তু প্রাথমিকভাবে এ কাজে তাঁকে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। কেননা নক্ষত্র গ্রহ সম্পর্কে তাঁর খুব বেশী ধারণা ছিল না। এই সময় রাধার এক আত্নীয়’র বন্ধু এ্যাডভোকেট কালীনাথ এগিয়ে আসেন। কালীনাথের নেশা ছিল জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চা। তিনি এ সম্পর্কে ‘তারা’, ‘ভূগোলচিত্রম’ ও ‘পপুলার হিন্দু’ অ্যাস্টনমি’ নামে কয়েকটি গ্রন্থ লিখেছিলেন। রাধা গ্রন্থগুলো পাঠ করে জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্পর্কে একটি ধারণা লাভ করেন। এক পর্যায়ে কালীনাথ বাবুর কাছ থেকে একটি স্টার ম্যাপ ধার করে নিয়ে রাধা নক্ষত্রবিদ্যার অনুসন্ধান শুরু করেন। এরপর চিঠির মাধ্যমে রাধার সঙ্গে পরিচয় হয় শান্তিনিকেতনের ব্রাহ্মচর্যাশ্রমের বিজ্ঞান ও গণিতের শিক্ষক জগদানন্দ রায়ের সঙ্গে। এ দু’ জনের মধ্যে আকাশ চর্চার যাবতীয় বিষয় চিঠিতে আলাপ আলোচনা হতো। বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় জগদানন্দ রায় রাধার চিঠি মুদ্রণের ব্যবস্থা করতেন।
একান্তভাবে, নিজের চেষ্টায় বকচর গ্রামের ১৪ বছরের কিশোর রাতের আকাশের তারামন্ডলীকে চিনে ফেললো। কিন্তু নক্ষত্র চেনার কাজে দরকার প্রতি মাসের তারকা-ম্যাপ। দিনভর চাকরি আর রাত হলেই ধৈর্য্য ধরে আকাশ পর্যবেক্ষণ। এমনও রাত গেছে তিনি ঘুমাননি একটুও।
১৯১০ সালে রাধাগোবিন্দ চন্দ্র খালি চোখে হ্যালির ধুমকেতু পর্যবেক্ষণ করলেন অনেকদিন ধরে। অভ্যাসমত একটি খাতায় তিনি তার পর্যবেক্ষণ লিখে রাখতেন। খালি চোখে ধূমকেতু দেখেও রাধা তার যে রহস্য উন্মোচন করেছিলেন তা প্রবাসী পত্রিকায় ছাপা হতো। হ্যালির ধূমকেতু দেখার পরই রাধা ‘ধুমকেতু’ নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন। এই গ্রন্থে তিনি ধুমকেতু সম্পর্কে নানা পৌরাণিক আধুনিক ব্যাখ্যা ছাড়াও নিজের চোখে দেখা হ্যালির ধুমকেতু বিস্তারিত বর্ণনা করেন।
এ সব প্রবন্ধ পড়ে শান্ডি নিকেতনের বিজ্ঞান শিক্ষক জগদানন্দ রায় মুগ্ধ হয়ে চিঠি দিলেন রাধাগোবিন্দকে, পরামর্শ দিলেন একটি দূরবীণ সংগ্রহের। উৎসাহ ও বিভিন্ন সহযোগিতা পেয়ে ১৯১২ সালে জমি বিক্রি করে আর বেতনের টাকা জমিয়ে ২৭৫ টাকায় তিন ইঞ্চি ব্যাসের একটি ছোট্ট দূরবীণ কিনলেন।
এই দূরবীন হাতে পাওয়ার পর রাধার ঘুম হারাম হয়ে যায়। এভাবেই শুরু হল তার নতুন সাধনা। এবারের আগ্রহ-পরিবর্তনশীল তারা। রাতের আকাশে অনেক তারাই দেখা যায় যেগুলোর ঔজ্জ্বলা স্থির নয়। সময়ের সঙ্গে বাড়ে কমে। রাতের পর রাত অসীম ধৈর্যের সঙ্গে রাধাগোবিন্দ এই সব পরিবর্তনশীল তারা পর্যবেক্ষণ করতেন। সামান্য তিন ইঞ্চি দুরবীণ দিয়ে তিনি গড়ে তুললেন এক অমূল্য তথ্য ভান্ডার।
১৯১৮ সালের ৭ই জুন রাধাগোবিন্দ তিন ইঞ্চি ব্যাসের দূরবীণ দিয়ে আকাশের নতুন নক্ষত্র ‘নোভা’ আবিষ্কারের কৃতিত্ব দেখান। এটি রাধার একটি উল্লেখযোগ্য অবদান। তার এই আবিষ্কারের পরই নক্ষত্রের নামকরণ করা হয় ‘নোভা অ্যাকুইলা ত্রি ১৯১৮’। নোভা হচ্ছে কোন তারকার মৃত্যুকালীন অবস্থার বিষ্ফোরণ। সমগ্র এশিয়া মহাদেশে এই নোভা সর্বপ্রথম পর্যবেক্ষণ করার কৃতিত্ব একজন বাঙালির, তিনি হচ্ছেন আমাদের যশোরের কৃতি সন্তান রাধাগোবিন্দ চন্দ্র।
রাধার এই নোভা দর্শন সম্পর্কিত একটি প্রবন্ধ প্রবাসী পত্রিকাগুলোতে গুরুত্ব সহকারে ছাপে। নোভা সম্পর্কে রাধা তাঁর অভিজ্ঞতার কথাও লিখিতভাবে ‘হারভারর্ড অবজারভেটরির’ পরিচালককেও অবহিত করেন। পরিচালক এডওয়ার্ড চার্লস পিকারিং রাধার চিঠি প্রাপ্তির পর তাঁকে নবগঠিত আমেরিকান এসোসিয়েশন অফ ভ্যারিয়েবল স্টারস অবজারভাস (অ্যাভসো) সদস্য মনোনীত করেন। অ্যাভসোর সদস্য হওয়ার পর রাধা ভ্যারিয়েবল স্টার সম্পর্কে নতুন উৎসাহ উদ্দীপনার সঙ্গে আকাশচর্চা শুরু করেন। রাধা বহুরূপী তারার রহস্য উন্মোচন করে ১৯১৯ সাল থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত ৩৭ হাজার ২১৫টি ভ্যারিয়েবল স্টার সম্পর্কে তিনি অ্যাভসোকে তথ্য সরবরাহ করেছেন। এ কারণেই অ্যাভসোর ১৯৪৬ সালে প্রকাশিত অনার রোলে ১০ হাজার ভ্যারিয়েবল স্টার সম্পর্কে পৃথিবীর যে ২৫ জন প্রখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী তথ্য দিয়েছেন তাদের মধ্যে রাধার নামও লিপিবদ্ধ আছে। এছাড়া রাধার এই কাজের জন্য হারবারড অবজারভেটরির পরিচালক বিখ্যাত জ্যেতির্বিজ্ঞানী হারলো শ্যাপলির তাঁকে একটি প্রশংসাপত্র দিয়ে সাধুবাদ জানান। আমেরিকার অ্যাভসো ছাড়াও ব্রিটিশ অ্যাস্ট্রনমিক্যাল এসোসিয়েশন, ফ্রান্সের লিয় অবজারভেটরির বিজ্ঞানীরা রাধার ভ্যারিয়েবল স্টার সম্পর্কে তথ্য জানার জন্য সবসময় অপেক্ষা করে থাকতো। রাধাগোবিন্দের পর্যবেক্ষণ লব্ধ তথ্য প্রকাশ পেতো এসব মানমন্দির প্রকাশিত পত্র-পত্রিকায় এবং তারই সূত্র ধরে তারা নতুন নতুন ভ্যারিয়েবল স্টার সম্পর্কে পর্যবেক্ষণ করতো।
রাধাগোবিন্দের সংগৃহীতের তথ্য সেই কালের ইউরোপ-আমেরিকার যে সব বড় বড় জ্যোতির্বিজ্ঞান সংস্থাগুলো ব্যাবহার করতো তাদের মধ্যে রয়েছে-আমেরিকার হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মানমন্দির, আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন অব ভ্যারিয়েবল স্টার অবজার্ভার, লন্ডনের ব্রিটিশ অ্যাস্টোনমিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন, ফ্রান্সের লিয় মানমন্দির প্রভৃতি। হার্ভার্ডে এখনও তাঁর পর্যবেক্ষণ লব্ধ তথ্য সযত্নে রক্ষিত আছে।
তথ্যসুত্র : কমেন্টে