29/06/2024
মধু কবির ধারের হিসাব...
মাইকেল মধুসূদন দত্ত পঞ্চকোটের চাকরি ফেলে কলকাতায় ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গে পুরোনো সমস্যাগুলোও কবির সঙ্গে ফিরে আসে। ফিরে আসেন পাওনাদারেরাও। বস্তুত, পঞ্চকোটে থেকে রিক্তহস্তে ফিরে আসায়, তাঁর সমস্যা বরং আরও জটিল হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে বকেয়া বাড়ি-ভাড়া নিয়ে তিনি চরম বিপদে পড়েন। এ সময়ে তাঁর অনেক ধার ছিলো–এ কথা না-বলে, বলা উচিত: তিনি ধারের সমুদ্রে হাবুডুবু খাচ্ছিলেন। কৈলাসচন্দ্র বসু( মাইকেলের কেরানী) পুরোনো মনিবের দুর্দশা সম্যকভাবে উপলব্ধি করে তাঁকে উদ্ধার করার জন্যে বিদ্যাসাগরের কাছে সনির্বন্ধ আবেদন জানান।
‘মহাশয়ের শ্রীচরণকমলে বিনীতভাবে আমি এই প্রার্থনা করি যে, যেরূপে পারেন, বিপন্ন দত্তজাকে এবারে রক্ষা করিয়া স্বীয় অপার করুণার আরও সুপরিচয় প্রদান করিবেন। ফলতঃ মহাশয়ের অনুগ্রহ ভিন্ন বর্তমানে দত্তজার আর উপায়ান্তর নাই।’
এই চিঠির সঙ্গে তিনি কবির যে-ধারের হিসাব পাঠান, তা থেকে দেখা যায়, তখন তাঁর কাছে বিভিন্ন জন যে-টাকা পেতেন, তার পরিমাণ ছিলো সেকালের মাপে প্রায় অবিশ্বাস্য–৪২ হাজার টাকা। এই টাকার সবটা তিনি সরাসরি ধার করেননি। আসলে, তাঁর পাওনাদারদের মধ্যে কেউ কেউ তাঁর সাবেক কর্মচারী। তা ছাড়া, অনেকের কাছ থেকে তিনি জিনিষপত্র কিনে অথবা পরিসেবা নিয়ে সেসবের দাম শোধ করতে পারেননি। এভাবেই তিনি ধীরে ধীরে ধারের স্রোতে আকণ্ঠ ডুবে গিয়েছিলেন। এই অবস্থায় কৈলাসচন্দ্র বসুর চিঠি যথেষ্ট ছিলো না, স্বয়ং মাইকেলকে সরাসরি হাত পাততে হয় পুরোনো বন্ধু বিদ্যাসাগরের কাছে। নিতান্ত বাধ্য না-হলে তিনি বিদ্যাসাগরের কাছে নতুন করে দয়া ভিক্ষা করতেন না। কারণ তাঁদের সম্পর্ক তখন আগের মতো ঘনিষ্ঠ ছিলো না। তিনি অভিমান করে বিদ্যাসাগরের কাছ থেকে দূরে সরে এসেছিলেন।
অপর পক্ষে, এক কালের দরদী বিদ্যাসাগরও মাইকেলের ব্যাপারে খুব তিক্ত এবং বিরক্ত হয়েছিলেন। বঙ্গ সমাজের অত্যুজ্জ্বল তারকা হলেও, বিষয়বুদ্ধি-বর্জিত কবিকে আর্থিক ব্যাপারে ভরসা করা যায় না এবং তিনি সকল সংশোধনের ঊর্ধ্বে – বিদ্যাসাগর এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে এসেছিলেন। বিদ্যাসাগর তাঁর সম্পর্কে কী ধারণা পোষণ করেন, তা ভালো করে জানা সত্ত্বেও, কবি সেই অপমান গায়ে না-মেখে করুণ আবেদন জানালেন তাঁর কাছে। কারণ তাঁর এ সময়ের বিপদ এবং প্রয়োজন ছিলো মান-অপমানের ঊর্ধ্বে।
‘আপনি আমার সবচেয়ে বড়ো উপকারী এবং বন্ধুদের মধ্যে সবচেয়ে মহান। আপনি নিজেই যখন অমন খারাপ অবস্থায় আছেন, তখন আপনাকে আমার বিষয় নিয়ে বিরক্ত করে স্বার্থপরতার পরিচয় দিচ্ছি। আমার এ অপরাধ ক্ষমা করুন। কিন্তু আপনি যাঁর নাম ধারণ করছেন, তিনি ছাড়া আমাকে সাহায্য করার মতো আর কেউ নেই । আপনার নাম শুনে এখন আমার বেশির ভাগ পাওনাদার আমার সুবিধের কথা বিবেচনার করার জন্যে একমত হয়েছেন। এখন প্রচণ্ড তুফানের মধ্যে রক্ষা পাওয়ার মতো এক টুকরো ভূমি আমি সামনে দেখতে পাচ্ছি। এই অবস্থায় আমি যখন চিন্তা করি যে, মাত্র দু হাজার টাকার জন্যে এসবই হারাতে হবে এবং আমাকে ডুবে মরতে হবে, তখন আমি মরমে মরে যাই। আমার পুরোনো বন্ধু এবং রক্ষক হিসাবে আপনি কি চাইবেন যে, আমার সর্বনাশ হোক? আপনি যদি রাজীবের সঙ্গে দেখা করে আপনার প্রদীপ্ত বাকপটুতা দিয়ে আমার প্রতি তাঁর পুরোনো ভালোবাসা জাগিয়ে তুলতে পারেন, তা হলে তিনি আপনার কথা না-শুনে পারবেন না–যদিও জানি আমার প্রতি তাঁর ভালোবাসা এখন লজ্জা এবং দুঃখের কাছে নতি স্বীকার করেছে। তাঁর কাছে দু হাজার টাকার ধার কি? আমার বাড়িওয়ালা আর এক মুহূর্তও দেরি করতে রাজি নয়। তা ছাড়া, আমার ছোটোখাটো পাওনাদারেরাও আমার বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে। দু হাজার টাকা পেলে আমি বেঁচে যাবো। তা হলে আমি অবিলম্বে আরও ছোটো একটা বাড়িতে চলে যাবো এবং খুব কম টাকাতে সংসার চালাতে চেষ্টা করবো। আমার আগামী কাল বিকেলের মধ্যেই এই টাকাটা দরকার। তা না হলে আমার ভাগ্যে আছে পালানো অথবা তার চেয়েও খারাপ কিছু। আমি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি যে, আমার এই চিঠি যেন আপনার কোমল অন্তরে একটি ভঙ্গহৃদয়ের আর্তির মতো শোনায়।’
এ চিঠিতে যে-রাজীবের কথা উল্লেখ করেছেন, তিনি কাশিমবাজার মহারানী স্বর্ণময়ীর এস্টটের দেওয়ান। বিধবাবিবাহ বাবদে যে-ঋণে জড়িয়ে পড়েছিলেন, তা থেকে অব্যাহতি পাওয়ার জন্যে ১৮৬৯ সালে বিদ্যাসাগর এঁরই মাধ্যমে মহারানীর কাছে তিন বছরের জন্যে বিনা সুদে সাড়ে সাত হাজার টাকা প্রার্থনা করেন। রাজীবলোচন মহারানীর অনুমতি নিয়ে এই টাকা দিয়েছিলেন। তিনি আরও বলেছিলেন, বিদ্যাসাগর যখন পারবেন তিনি যেন তখন টাকা শোধ দেন। রাজীবের দয়ালু হৃদয় এবং তার সঙ্গে বিদ্যাসাগরের ঘনিষ্ঠতার কথা মাইকেল জানতেন। সেই সূত্রে তাঁর কাছ থেকে ঋণ জোগাড় করে দেবার অনুরোধ জানান।
মাইকেলের ধারের হিসাব:
বড়বাজারের লালা ৮৫০০; কালীচরণ ঘোষ ৫০০০; উমেশচন্দ্র বসু ও মুনসির মিহি আনা (শেষের নামটির বানান ঠিক নেই) ৫০০০; টালিগঞ্জের মথুর কুণ্ডু ৪০০০ (এর কাছ থেকে বিলেত যাবার আগেও ধার করেছিলেন); ঈশ্বরচন্দ্র বসু কোং ৩৫০০ (কবির প্রকাশক); বহুবাজারের গোবিন্দচন্দ্র দে ৩০০০; দ্বারকানাথ মিত্র ২৫০০ (হাইকোর্টের বিচারপতি); মতিচাঁদ বন্দ্যোপাধ্যায় ২০০০; খিদিরপুরের হরিমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় ১৬০০ (এক সময়ে বাড়ির দাম বাবদ এঁর কাছে কবি কিছু টাকা পেতেন); বেনারসের রাজা ১৫০০; শ্যামবাজারের প্রাণকৃষ্ণ দত্ত ১১০০; গোপীকৃষ্ণ গোস্বামী ১০০০ (এঁর মামলা করেছিলেন); চাকরের বেতন ৭০০: গমেজ সাহেব ৫০০; মানভূম ৫০০; ট্রেডস অ্যাসোসিয়েশন ৫০০; মনিরুদ্দীন ৪০০; বাড়ি বাড়া ৩৯০; আমিরন আয়া ২০০; কেদার ডাক্তার ২০০; চন্দননগরের রাজেন্দ্র দত্ত ডাক্তার ২০০: বিশ্বনাথ লাহা ১০০: দে কোং ১০০ টাকা।(মাইকেলের বংশ তালিকা। এই তালিকা তৈরি করা হয়েছে ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরিতে রক্ষিতে এন/১ এবং এন/২ সিরিজের এক্লোসিয়াষ্টিকাল পেপার্সের ওপর ভিত্তি কেরে। কেবল ব্যাজিল প্যাট্টিক এবং জেনিফার ডাটনের নাম সুরেশ মৈত্রর বই থেকে নেয়া। এই তালিকা সম্পূর্ণ নয়। মাইকেলের জীবনীর জন্যে এর চেয়ে বিস্তারিত তালিকার প্রয়োজন নেই। তাঁর প্রপৌত্রসহ বেশির ভাগ বংশধরগণ এখন অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস করেন।)