21/02/2026
প্রেস বিজ্ঞপ্তি
ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২৬ |
পার্বত্য চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ
আদিবাসীদের মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতের দাবীতে পিসিপি ও এইচডব্লিউএফ'র সমাবেশ
২১শে ফেব্রুয়ারি ২০২৬, মহান আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ও শহীদ দিবস উপলক্ষে খাগড়াছড়িতে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ ও হিল উইমেন্স ফেডারেশনের উদ্যোগে র্যালী, পুষ্পমাল্য অর্পন ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
"আদিবাসীদের মাতৃভাষায় শিক্ষার অধিকার, সংরক্ষণ ও বিকাশে সোচ্চার হোন", "পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি মোতাবেক স্ব-স্ব মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত কর"- এই স্লোগানে সকাল ৯ ঘটিকার সময় সদরের মহাজন পাড়াস্থ সূর্যশিখা ক্লাব প্রাঙ্গণ থেকে র্যালী আকারে বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে সকল ভাষা শহীদদের স্মরণে শহীদ মিনারে পুষ্পমাল্য অর্পন করেন পিসিপি ও হিল উইমেন্স ফেডারেশনের নেতৃবৃন্দ। পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির পক্ষ থেকেও পৃথকভাবে পুষ্পমাল্য অর্পন করা হয়।
পুষ্পমাল্য অর্পনের পর জেলা দায়রা জজ ও মেজিস্ট্রেট আদালতের সামনের ফটকে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপন কমিটি -২০২৬ ও পিসিপি কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুমতি বিকাশ চাকমার সঞ্চালনায় সভাপতিত্ব করেন ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপন কমিটি-২০২৬ যুগ্ম আহ্বায়ক সুকেশ চাকমা।
বক্তারা বলেন, ভাষা আন্দোলনের আজ ৭৪ বছর পূর্ণ হয়েছে কিন্তু বাংলাভাষী ব্যতীত এদেশের অন্যান্য ভাষাভাষীদের ভাষা আজ বিলুপ্তির পথে। যে দেশে ভাষার জন্য মানুষ প্রাণ দিয়েছে, সে দেশে অন্য ভাষাগুলো বিলুপ্তির পথে যা অত্যন্ত হতাশার। বাংলা ভাষাভাষী মানুষদের ভাষার জন্য আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান জানিয়ে ও পৃথিবীর সকল মাতৃভাষাগুলো রক্ষাসহ বিকাশ সাধনের লক্ষ্যে ইউনেস্কো ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ২১ শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছে।
১৯৯৭ সালে সরকার এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তির খ খন্ডের ৩৩নং ধারার খ উপধারার ২ নং অনুচ্ছেদে মাতৃভাষার মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষার বিষয়টি উল্লেখ থাকলেও চুক্তির ২৮টি বছর অতিক্রান্ত হচ্ছে কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীদের এখন পর্যন্ত নিজেদের মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারেনি সরকার। বাজেট বরাদ্দ না থাকায় যে তিনটি মাতৃভাষায় বই বিতরণ করা হয় সে সকল বিষয়ে পাঠদানের জন্য শিক্ষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়নি। পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল জাতিগোষ্ঠীর স্ব-স্ব মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা পাঠদানের বিষয়ে। পাশাপাশি দীর্ঘ বছর যাবত ধরে সমতলের আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীদের মাতৃভাষায় পাঠদানের বিষয়েও পিসিপি বলে আসছে।
বাংলাদেশে মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট থাকলেও আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীদের মাতৃভাষা সংরক্ষণ ও বিকাশ সাধনের বিষয়ে কোন পদক্ষেপ চোখে পড়েনা। যা কার্যত অথর্ব হইয়ে রয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। স্বৈরাচারী হাসিনার আমলে ২০১৭ সালে আদিবাসীদের পাঠ্যপুস্তক হাতে হাসিনার হাস্যজ্জ্বল ছবি আমরা দেখেছি কিন্তু আদৌতে শুধুমাত্র পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি জাতিগোষ্ঠীর ভাষায় (চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা) ও সমতলের দু'টি জাতিগোষ্ঠীর ভাষায় (গারো ও সাদ্রী) ৩য় শ্রেণী পর্যন্ত বই বিতরণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশে ৫০টির অধিক আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী রয়েছে। যেসকল জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব বর্ণমালা রয়েছে তাদের স্ব-স্ব ভাষায় রাষ্ট্রীয়ভাবে বিদ্যালয়গুলোতে পাঠদান ও যেসকল জাতিগোষ্ঠীর মাতৃভাষায় লিখ্যরুপ নেই তাদের বর্ণমালা উদ্ভাবনের ব্যবস্থা করতে হবে। না হলে সেসকল মাতৃভাষাগুলো হারিয়ে যাবে। অন্যদিকে যেসকল ভাষায় প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ৩য় শ্রেণী পর্যন্ত বই বিতরণ করা হলেও পর্যাপ্ত শিক্ষকের অভাব, প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাব, পৃথক শ্রেণিকক্ষের ব্যবস্থা না থাকা, মাতৃভাষার বিষয়গুলো সাধারণ ক্লাস রুটিনের সাথে অন্তর্ভুক্ত না করায় পাঠদান হয়না। ফলতঃ রাষ্ট্রের সকল জাতিগোষ্ঠীর মাতৃভাষায় পাঠদানের বিষয়টি কার্যত ব্যর্থ হচ্ছে।
তারেক রমানের নেতৃত্বে দেশে নতুন সরকার গঠিত হয়েছে। নতুন সরকারের পক্ষ থেকে শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর কথা বলা হয়েছে, আদিবাসী জনগণকে পেছনে ফেলে শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো সম্ভব নয়। সেজন্য সকল আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর মাতৃভাষায় যথাযথভাবে শিক্ষা ব্যবস্থা প্রণয়ণের জন্য নতুন সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। বক্তারা বলেন, ভাষা একটি জাতির প্রাণ, ভাষা একটি জাতির আত্মপরিচয়। ভাষা বিলুপ্তি মানে জাতিগোষ্ঠীগুলো বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া। সে জন্য বৈচিত্রার এই বাংলাদেশকে রক্ষা করতে সকল ভাষাকে সংরক্ষণের যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
সমাবেশে বক্তারা উপস্থিত ছাত্র-ছাত্রীদের উদ্দেশ্যে আহ্বান রাখেন – নিজেদের অধিকারের বিষয়ে নিজেদেরকেই আগে সচেতন হতে হবে, সে অনুযায়ী নিজেদের প্রস্তুতি নিয়ে প্রয়োজনে লড়াই সংগ্রামের মাধ্যমে অধিকার ছিনিয়ে আনতে হবে।
সমাবেশে উপস্থিত থেকে বক্তব্য রাখেন পিসিপি খাগড়াছড়ি জেলা শাখার সভাপতি জেসলেন চাকমা, কেন্দ্রীয় কমিটির সহ সাধারণ সম্পাদক সুনয় চাকমা, হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মায়া চৌধুরী, পিসিপির কেন্দ্রীয় সভাপতি সুজন চাকমা ঝিমিট, যুব সমিতির কেন্দ্রীয় সভাপতি জ্ঞান প্রিয় চাকমা।
সমাবেশ থেকে পাঁচটি দাবীনামা উত্থাপন করা হয়। দাবীগুলো হলঃ
১। সকল আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা যথাযথভাবে নিশ্চিত করতে হবে।
২। সকল মাতৃভাষার পর্যাপ্ত শিক্ষক, শ্রেণী কক্ষ, সাধারণ ক্লাস রুটিনের সাথে অন্তর্ভুক্ত ও পাঠদানের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।
৩। শিক্ষকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ নিশ্চিতপূর্বক স্ব-স্ব মাতৃভাষায় পাঠদানের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।
৪। ১ম-২য় শ্রেণীর সরকারি চাকরি ও দেশের সকল উচ্চমান সম্পন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আদিবাসীদের ৫% কোটা পুনর্বহাল করতে হবে।
৫। অতিদ্রুত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে হবে।
ঢাকা:
২১ শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে ঢাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ,ঢাকা মহানগর শাখার কর্তৃক সকল ভাষা শহীদদের স্মরণে বিনম্র পুষ্পমাল্য অর্পণ করা হয়।
চট্টগ্রাম: ২১ শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে সকল ভাষা শহীদদের স্মরণে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সকালে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ,আদিবাসী শ্রমজীবী কল্যাণ সমিতি, চট্টগ্রাম মহানগর শাখার যৌথ উদ্যোগে বিনম্র পুষ্পমাল্য অর্পণ করা হয়।
বার্তা প্রেরক:
সুমুতি বিকাশ চাকমা
সদস্য সচীব
২১ শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপন কমিটি-২০২৬
মুঠো ফোন: ০১৫১৭১৮৮৩৪৩