23/07/2026
নেদারল্যান্ডসের একটা গ্রিনহাউসে টমেটোর চারা সপ্তাহে এক ফুট করে বাড়ে। বাইরে সেখানে মেঘলা আকাশ, শীত, রোদের দেখা নাই। টমেটো ফলানোর জন্য এর চেয়ে বাজে জায়গা কল্পনা করা কঠিন।
তবু এই দেশ টমেটো ফলায় পৃথিবীর গড়ের বারো গুণ। এক একর কাচের ঘরে যত লেটুস হয়, খোলা মাঠের দশ একরেও তত হয় না।
দেশটা ছোট। আয়তনে বাংলাদেশেরও ছোট। তার পরও, আমেরিকার ঠিক পরেই, পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম কৃষিপণ্য রপ্তানিকারক এই নেদারল্যান্ডস, বছরে একশো চল্লিশ বিলিয়ন ডলারের বেশি। যেই আমেরিকা এক নম্বরে, তার চাষের জমি নেদারল্যান্ডসের প্রায় দুইশো গুণ।
কীভাবে সম্ভব হলো?
এর উত্তর মাটির উর্বরতায় নাই, আবহাওয়ায় তো নাই-ই। উত্তরটা একটা বীজের ভেতরে, এবং সেই বীজের দাম শুনলে থমকে যেতে হয়।
➖
এক কেজি হাইব্রিড টমেটোর বীজের দাম এক কেজি সোনার চেয়ে বেশি।
সোনার কেজি যখন চল্লিশ হাজার ইউরোর ঘরে, তখন ওলন্দাজ কোম্পানির বানানো সেরা টমেটো-বীজের কেজি আশি হাজার ইউরো। প্রায় দ্বিগুণ। এক-একটা বীজের দাম পড়ে প্রায় এক ইউরো।
মানুষ এই বীজ চুরি করে, সোনা চুরির মতো। ইউরোপে পুলিশ এমন চক্র ধরেছে, যারা নামী কোম্পানির প্যাকেটে ভরে নিম্নমানের সবজি-বীজ বেচত।
এই বীজ দামি কেন? কারণ এর ভেতরে যা আছে, সেটা মাটি না, পানি না বা রোদ না। এর ভেতরে আছে কয়েক দশকের গবেষণা। কোন জিন রোগ ঠেকায়, কোনটা ফলন বাড়ায়, কোনটা ফলফলাদি জাহাজে দুই সপ্তাহ টাটকা রাখে।
ফলে নেদারল্যান্ডস আসলে ঠিক অর্থে টমেটো বেচে না। বেচে ওই জ্ঞানটা, কিন্তু বীজের খোলসে ভরে। পৃথিবীর সবজি-বীজ বাণিজ্যের এক-তৃতীয়াংশের বেশি শুরু হয় এই এক দেশ থেকে।
এটা যে সম্ভব হয়, এর পেছনেও একটা সংখ্যা আছে, এবং সংখ্যাটা অস্বস্তিকর রকমের পরিষ্কার।
উত্তর-পশ্চিম ইউরোপ আর উচ্চ-আয়ের এশিয়ার দেশগুলি তাদের কৃষি-জিডিপির প্রায় সাড়ে চার শতাংশ ঢালে কৃষি গবেষণায়। অন্যদিকে বাংলাদেশ ঢালে শূন্য দশমিক তিন আট শতাংশ।
আন্তর্জাতিক খাদ্যনীতি গবেষণা সংস্থা আইএফপিআরআইয়ের সর্বশেষ হিসাব এটাই। ভাগ করে দেখেন। প্রায় বারো গুণের ফারাক।
তারা গবেষণায় ঢালে আমাদের বারো গুণ। আর তাদের টমেটো ফলে আমাদের বারো গুণ। এটাকে কাকতাল বলা যায় না। কারণ এটাই সূত্র।
এগিয়ে থাকা দেশগুলি বছরের পর বছর ধরে টাকা ঢেলেছে একটা জিনিসের পেছনে, সেটা জ্ঞান। গবেষণা, জাত, পদ্ধতি। বাংলাদেশ টাকা ঢেলেছে জিনিসের পেছনে। যন্ত্র, দালান, আমদানি।
➖
প্রথমে দেখা যাক, বাকিরা কী বানাচ্ছে।
ওই নেদারল্যান্ডসেই ফিরি। বীজ ছাড়াও তাদের আরেকটা কারবার আছে। সেটা হলো, তারা পানি পরিমাপ করে প্রতি ফোঁটায়।
কাচের ঘরের ভেতরে প্রতিটা সারির গোড়া বরাবর সরু পাইপ আছে, সেটাই মাটিতে গোঁজা সেন্সর মেপে দেখে কোথায় কতটুকু ভেজা, আর সেই হিসাবে ঠিক ততটুকুই পানি ছাড়ে।
বাড়তি এক ফোঁটাও না। বালতি উপুড় করে ঢালার অপচয় নাই। এই কারণে তাদের গ্রিনহাউসে পানি লাগে খোলা মাঠের নব্বই শতাংশ কম।
এই ফোঁটায়-পানির প্রযুক্তির নাম ড্রিপ ইরিগেশন, আর এটা এখন আর কাচের ঘরেও আটকা নাই। একশো দশটার বেশি দেশে, পঁচাশি লাখেরও বেশি কৃষকের খোলা জমিতে এই ব্যবস্থা চলছে।
কেনিয়ার শুকনা মাটিতে দেখা গেছে, বালতির বদলে ড্রিপে পানি বাঁচে ষাট শতাংশ, ফলন বাড়ে দেড় গুণেরও বেশি।
ভিয়েতনাম। এই তুলনাটা আলাদা করে জরুরি, কারণ নেদারল্যান্ডস-আমেরিকার গল্প শুনে মনে হতে পারে, ওইসব ধনী দেশের বিলাস। ভিয়েতনাম সেই অজুহাতটা কেড়ে নেয়।
আটাত্তর সালে ভিয়েতনামের ধান উৎপাদন নেমে গিয়েছিল ঐতিহাসিক তলানিতে, বছরে প্রায় ষোলো লাখ টন চাল আমদানি করে দেশ চালাতে হতো। যুদ্ধফেরত, ক্ষুধার্ত, আমাদের চেয়েও বিধ্বস্ত একটা দেশ।
কিন্তু আজকে? এই বছর তাদের কৃষি রপ্তানির লক্ষ্য সত্তর বিলিয়ন ডলার। কাজুবাদামে পৃথিবীতে প্রথম, চাল আর কফিতে দ্বিতীয়, ফল-সবজিতে তৃতীয়।
এই উত্থানের ইঞ্জিন কী ছিল, সেটা তারা নিজেরাই বলে, প্রযুক্তির প্রয়োগ আর প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, বিশেষ করে ধানে।
খেয়াল করেন, ভিয়েতনাম আমাদের মতোই ব-দ্বীপের দেশ। ঘূর্ণিঝড় খায়, বন্যা খায়, চাষির জমি ছোট। ভূগোল এক, ইতিহাসের ক্ষত এক। ফারাক শুধু এইখানে, সংকটের পর তারা বানিয়েছে ব্যবস্থা, আমরা কিনেছি জিনিস।
চীন। যেই ডিজেআই কোম্পানির ড্রোন দিয়ে মানুষ বিয়ের ভিডিও করে, তারাই এখন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কৃষি-ড্রোন বানায়।
২০২৪ সালের শেষে বিশ্বজুড়ে চার লাখ ডিজেআই কৃষি-ড্রোন উড়ছিল। চীনে ফসলে কীটনাশক ছেটানোর তিন ভাগের এক ভাগ এখন হয় ড্রোনে। মানুষের চেয়ে দ্রুত, আর বিষ লাগে অর্ধেক।
আমেরিকা। জন ডিয়ারের ট্রাক্টরে বসানো ক্যামেরা আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সেকেন্ডে বলে দেয়, সামনে যেটা দাঁড়িয়ে আছে সেটা ফসল না আগাছা। বিষ পড়ে শুধু আগাছার গায়ে।
একটা মাত্র মৌসুমে এই যন্ত্র আমেরিকার কৃষকদের বিষ বাঁচিয়েছে তিন কোটি গ্যালন, প্রায় অর্ধেক।
বীজ, ফোঁটার পাইপ, ড্রোন কিংবা বুদ্ধিমান ট্রাক্টর, জিনিসগুলি আলাদা, কিন্তু তলার কাঠামোটা এক। প্রত্যেকটার নিচে এমন একটা জিনিস আছে যেটা চোখে পড়ে না।
একটা গবেষণাগার, একটা ডেটাবেস, একটা জিন-লাইব্রেরি, নিজের মাটির জন্য নিজের হাতে বানানো সমাধান। যন্ত্রটা সেই অদৃশ্য ভিতের উপর দাঁড়ানো একটা ফল, এইটুকুই।
এই মাপকাঠিটা এবার বাংলাদেশে ফেরত আনলে বাস্তবতা বুঝতে পারবেন।
➖
বাংলাদেশও বহু যন্ত্র ইত্যাদি কিনেছে।
২০২০ সালে সরকার নামল তিন হাজার বিশ কোটি টাকার এক প্রকল্পে, নাম "সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ"।
কম্বাইন হারভেস্টার, রিপার, ট্রান্সপ্লান্টার, ভর্তুকি পঞ্চাশ থেকে সত্তর শতাংশ। মাঠে শ্রমিক নাই, তাই যন্ত্র। কাগজে নিখুঁত পরিকল্পনা। তারপর যা হলো, সেটা সরকারের নিজের মুখেই শোনা যায়।
গত নভেম্বরে কৃষি সচিব নিজে বললেন, একটা চক্র যন্ত্রের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে একশো শতাংশেরও বেশি। ভর্তুকিতে বেচা বহু হারভেস্টারের হদিসই মেলে না। তার নিজের ভাষায়, দুর্নীতির মাত্রা দেখে তিনি স্তম্ভিত।
আইএফপিআরআইয়ের হিসাব আরও নির্দিষ্ট।
এই প্রকল্পে পঁয়ত্রিশ হাজারের বেশি যন্ত্র বিলি হয়েছে, যার প্রায় পুরো টাকাই কম্বাইন হারভেস্টারের পেছনে। আর মুষ্টিমেয় কিছু ব্যবসায়ী সরকারি ভর্তুকির টাকায় সেই হারভেস্টার গছিয়েছে আসল আমদানি-দামের দ্বিগুণেরও বেশিতে।
আরেকটা কথা এই হিসাবের বাইরে থেকে যায়। যন্ত্র বিকল হলে সেটা সারানোর লোক কই? সরবরাহকারীদের জেলায় জেলায় সার্ভিস সেন্টার থাকার কথা ছিল, বেশিরভাগেরই নাই।
একটা হারভেস্টার নষ্ট হলে কৃষক সপ্তাহের পর সপ্তাহ বসে থাকে, ফসল মাঠে পাকে, মেকানিক আসে না।
দৃশ্যটা চেনা। যন্ত্র আসে, ভর্তুকি আসে, ফিতা কাটার ছবি আসে। কিন্তু যন্ত্রটা চালানোর, আর ভেঙে গেলে জোড়া দেওয়ার, দ্বিতীয় হাতটা বাংলাদেশ কখনো বানায় না।
➖
তবে যন্ত্রটা যদি অন্তত ঠিক জমিতে বসত, তা-ও একটা কথা ছিল। জমিটাও তো তৈরি না।
একটা সংখ্যায় বোঝাই। এই দেশে প্রতি একশোটা খামারের প্রায় নব্বইটাই এক হেক্টরের ছোট।
গড় খামার আধা হেক্টরের নিচে। আর এই আধা হেক্টরও একটানা এক টুকরা না, ভাঙা তিন-চার টুকরায়, এক টুকরা এই মাঠে তো আরেক টুকরা ওই মাঠে।
এখন একটা কম্বাইন হারভেস্টারের কথা ভাবেন, যেটা ডিজাইন হয়েছে আমেরিকার শত শত একরের এক নাগাড়ের মাঠের জন্য। সেটা এনে বসানো হলো এক টুকরা দশ শতাংশ জমিতে, যার চারদিকে আরও দশজনের দশ টুকরা।
যন্ত্রটা ঘোরানোরই জায়গা নাই।
উন্নত দেশের যন্ত্র বানানো হয়েছে বড় জমির জন্য, এক মালিকের বিশাল এক খণ্ডের জন্য। আমাদের বাস্তবতা তার উল্টা। জমি ছোট, ছড়ানো, আর প্রতি প্রজন্মে ওয়ারিশি ভাগে আরও ছোট হচ্ছে। বাবার এক খণ্ড তিন ছেলের হাতে তিন খণ্ড।
তাহলে কি যন্ত্রটাই এই দেশের জন্য ভুল?
সহজ উত্তর, হ্যাঁ। কিন্তু সহজ উত্তরটাও আরেকটা ফাঁদ। সমস্যাটা যন্ত্রেও না, মালিকানায়। আমরা ধরে নিয়েছি, যন্ত্র মানে যন্ত্রটা কিনতে হবে, আর ছোট জমির চাষি সেটা কিনতে পারে না বলেই যন্ত্র তার নাগালের বাইরে।
ঠিক এই ধরে-নেওয়াটা ভারত উল্টে দিয়েছে।
➖
ভারতেও ছিয়াশি শতাংশ কৃষক ছোট আর প্রান্তিক। জমি সেখানেও ছোট, ছড়ানো। তাহলে ভারত ড্রোন-ট্রাক্টর কাকে দিয়ে চালায়?
ভারত ব্যক্তির হাতে যন্ত্র তুলে দেয়নি। ভারত যন্ত্রটাকে ভাড়ায় খাটিয়েছে।
"নমো ড্রোন দিদি" প্রকল্পে সরকার পনেরো হাজার ড্রোন দিচ্ছে গ্রামের নারীদের স্বনির্ভর দলকে, আশি শতাংশ ভর্তুকিতে। এই নারীরা ড্রোন কেনেন না ঠিক, তারা ড্রোন-সেবা বেচেন।
একজনের জমিতে ড্রোন উড়িয়ে বিষ ছেটান, ঘণ্টা হিসাবে ভাড়া নেন, পরের জমিতে যান। যেই কৃষক নিজে ড্রোন কেনার কথা কল্পনাও করতে পারত না, সে ঘণ্টার ভাড়ায় সেই যন্ত্রের সেবা পায়।
জমি ছোটই থাকল। কিন্তু যন্ত্রটা ভাগ হয়ে সবার নাগালে চলে আসলো।
এর পেছনে দাঁড়িয়ে আছে ভারতের এক বিলিয়ন ডলারের জাতীয় কৌশল, "ডিজিটাল এগ্রিকালচার মিশন" আর "এগ্রিস্ট্যাক"। স্যাটেলাইট, আবহাওয়া, মাটি, ফসলের ডেটা এক ছাদের নিচে।
ভাড়ার মডেলের চেয়েও কম চোখে পড়ে ভারতের আরেকটা জিনিস, সেটা আকাশের খবর।
"গ্রামীণ কৃষি মৌসম সেবা" নামের এক ব্যবস্থায় ভারতের আবহাওয়া দপ্তর প্রতিটা জেলার জন্য পাঁচ দিনের পূর্বাভাস বানায়। বৃষ্টি, তাপমাত্রা, বাতাস, আর্দ্রতা, এবং সেই পূর্বাভাসের সাথে জুড়ে দেয় ফসলভিত্তিক পরামর্শ, কবে বুনবেন, কবে সেচ, কবে স্প্রে।
এই পরামর্শ পৌঁছায় প্রায় দুই কোটি বিশ লাখ কৃষকের কাছে, তাদের নিজের ভাষায়।
খরচের হিসাবটাও শুনে রাখতে পারেন। এই সেবার বছরের বরাদ্দ ছিল পঁয়তাল্লিশ কোটি রুপির মতো, আর হিসাব করে দেখা গেছে কৃষকের বাড়তি ফলন আর বাঁচানো সার-কীটনাশক মিলিয়ে সুফল প্রায় পনেরো হাজার কোটি রুপি।
এক টাকা ঢেলে তিনশো টাকার বেশি ফেরত। পৃথিবীর কোনো হারভেস্টার-ভর্তুকি এই রিটার্ন দেয় না।
আমাদেরও একটা আছে, নামটা পর্যন্ত সুন্দর। বামিস। বাংলাদেশ এগ্রো-মেটিওরোলজিক্যাল ইনফরমেশন সার্ভিস। চৌষট্টি জেলার জন্য সপ্তাহে দুইবার পরামর্শ বানায়।
পৌঁছায় ত্রিশ হাজার "লিড ফার্মার"-এর কাছে। ভারতে দুই কোটি বিশ লাখ, আমাদের ত্রিশ হাজার। সাতশো গুণের ফারাক, একই উপমহাদেশে, একই মৌসুমি বাতাসের নিচে।
আর বামিস বানানো হয়েছে একটা প্রকল্পের অধীনে, বিশ্বব্যাংকের টাকায়। মানে জ্ঞানের এই অবকাঠামোটুকুও আমরা বানাই দাতার প্রকল্পে। প্রকল্পের একটা মেয়াদ থাকে। মেয়াদ ফুরালে কী থাকে, সেই প্রশ্নটা কেউ করে না।
এইখানে সততার খাতিরে একটা কথা বলা দরকার, নইলে ভারতকে বাড়িয়ে দেখা হবে। এই পুরো ডিজিটাল কাঠামো দাঁড়িয়ে আছে জমির দলিলের উপর। যার দলিল আছে, সে পরিচয় পায়, ঋণ পায়, বিমা পায়, ভর্তুকি পায়।
ভারতের বিরাট সংখ্যক বর্গাচাষি আর ভূমিহীন চাষি, যাদের নিজের নামে দলিল নাই, তারা এই পুরা ব্যবস্থার বাইরে পড়ে থাকে। ডিজিটাল নকশাটা পুরানো বৈষম্যটাকেই নতুন করে সিল মেরে দেয়।
তবু, ভুল-শুদ্ধে, ভারত অন্তত একটা টেবিল পেতেছে। যন্ত্র কার কাছে যাবে, ডেটা কার হাতে থাকবে, দর কে কষবে, প্রশ্নগুলি অন্তত জিজ্ঞেস করেছে।
আমরা প্রশ্নটাই করি নাই।
➖
এইবার সবচেয়ে গভীর সংকটে আসি। যেই সংকট যন্ত্রের না, বীজের।
মাথায় আছে নিশ্চয়ই, নেদারল্যান্ডসের গল্পটা শেষ পর্যন্ত একটা বীজের গল্প ছিল? উন্নত দেশগুলি সবচেয়ে বেশি পাহারা দেয় তাদের বীজ। কারণ বীজই আসল সার্বভৌমত্ব। যার হাতে বীজ, আগামী ফসলটা তার হাতে।
আমাদের বীজের খাতাটা খুলি। প্রথম পাতাতেই একটা তারিখ চোখে পড়ে।
বাংলাদেশ রাইস রিসার্চ ইনস্টিটিউট, বিআরআরআই, পঞ্চাশ বছরে একশোর বেশি ধানের জাত বানিয়েছে। শুনতে গর্বের। কিন্তু বাস্তবে বোরো মৌসুমে দেশের ধানি জমির প্রায় সত্তর শতাংশ দখল করে আছে মাত্র দুইটা জাত, বিআরআরআই ধান আটাশ আর ধান ঊনত্রিশ।
দুইটা জাতই বাজারে এসেছিল ১৯৯৪ সালে।
মানে আজ আমরা যেই ভাত খাই, তার বীজের বয়স তিরিশ বছর পার। যেই মানুষ এই ধান প্রথম মাঠে লাগিয়েছিল, তার নাতি এখন বিদেশে শ্রমিক। আর জাত দুইটা এখন কৃষি-বিজ্ঞানীদের ভাষায় "ক্ষয়িষ্ণু"।
ধান আটাশে পোকা আর রোগ বেশি ধরছে, ধান ঊনত্রিশে হানা দিচ্ছে নেক ব্লাস্ট। ২০১৬ সালে এই ব্লাস্ট রোগেই উত্তরবঙ্গে এই দুই জাতের বড় ধরনের ফলন-ধস হয়েছিল, রাতারাতি খেত সাদা হয়ে গিয়েছিল।
বিআরআরআই নতুন জাত বানায় নাই, এমন না। বানিয়েছে, রোগ-সহনশীল, বেশি-ফলনের, ধান আটাশি, ঊননব্বই, বিরানব্বই। কিন্তু সেগুলি কৃষকের মাঠ পর্যন্ত পৌঁছায় না।
কেন পৌঁছায় না, এই প্রশ্ন করলে গোটা সংকটের ম্যাপ আপনার সামনে স্পষ্ট হবে।
নতুন জাত কৃষককে চিনিয়ে দেওয়ার, হাতে ধরে বুঝিয়ে দেওয়ার কাজটা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের। এই অধিদপ্তরের একজন মাঠকর্মীর ভাগে পড়ে প্রায় দুই থেকে আড়াই হাজার কৃষক। একজন মানুষ দুই হাজার কৃষকের কাছে গিয়ে নতুন বীজ বোঝাবে, কবে?
জাত জন্মায় গবেষণাগারে। কিন্তু সেই জাত মাঠে বয়ে নেওয়ার দ্বিতীয় হাতটা বাংলাদেশ বানায় নাই। হুবহু হারভেস্টারের গল্প। যন্ত্র আসলো, মেকানিক আসলো না। জাত আসলো, সেটা মাঠে নেওয়ার লোক আসলো না।
➖
আর যেই বীজ ঘরে বানানো যায় না, সেটা আসে বিদেশ থেকে। এইখানে খাতাটা রীতিমতো অন্ধকার।
দুই দশক আগে এই দেশের বেশিরভাগ বীজ আসত হয় কৃষকের নিজের গোলা থেকে, নয় সরকারি বিএডিসি থেকে। আজকে ছবিটা উল্টে গেছে পুরো।
ভুট্টার বীজের নব্বই থেকে পঁচানব্বই শতাংশ আমদানি। সবজির বীজের প্রায় ষাট শতাংশ, বাঁধাকপি-ফুলকপি-ব্রোকলি-বিটের বীজ তো প্রায় পুরোটাই বিদেশি।
তেলবীজের পঁচাশি থেকে নব্বই, ডালের বীজের আশি শতাংশ আমদানি। এমনকি পাটের বীজ, আমাদের সেই সোনালি আঁশের বীজ, তার তিন-চতুর্থাংশের বেশি আসে ভারত থেকে।
তালিকাটা একবার নিজের প্লেটের সাথে মিলিয়ে দেখেন। ভাত, ডাল, তেল, সবজি, মাছের ফিড, প্রায় প্রতিটার বীজের নিয়ন্ত্রণ অন্য কারও হাতে। কালকে দাম বাড়লে, সরবরাহ বন্ধ হলে, রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা এলে, আমাদের হাতে দর কষার কিছু নাই।
ব্রডশিট আগে ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব নিয়ে লিখতে গিয়ে একটা মাপকাঠি দাঁড় করিয়েছিল। সেই ভাড়া বাসার গল্প। ভাড়া থাকা মানেই পরাধীনতা না।
পরাধীনতা শুরু হয় সেই দিন, যেদিন বাড়িওয়ালা টের পায়, এই ভাড়াটের যাওয়ার আর কোনো জায়গা নাই। বীজের বেলায় আমরা ঠিক সেই ভাড়াটে। যার যাওয়ার জায়গা নাই।
➖
এতক্ষণ যা বললাম, তার নিচে দিয়ে আরও একটা সংকট বইছে, নিঃশব্দে। পানির সংকট।
শুকনা মৌসুমের বোরো ধান আমাদের সবচেয়ে বড় ফসল, মোট চালের অর্ধেকের বেশি এই এক মৌসুমের। আর এই বোরোর প্রায় আশি শতাংশ পানি টেনে তোলা হয় ভূগর্ভ থেকে, নলকূপে। বছরের পর বছর, প্রকৃতি যা ফেরত দেয় তার চেয়ে বেশি।
তার ফল দেখা যাচ্ছে রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ-নওগাঁর শুকনা লাল মাটিতে। গত ডিসেম্বরে সরকার এই অঞ্চলের পঁচিশটা উপজেলাকে "পানি-সংকটাপন্ন" ঘোষণা করে বোরো চাষ কমাতে বলল।
কারণ, কর্তৃপক্ষের হিসাবেই, এখানে বৃষ্টির নয় শতাংশও ভূগর্ভে ফেরে না, অথচ তোলা হয় তার চেয়ে ঢের বেশি।
মানে আমরা যেই পদ্ধতিতে ভাত ফলাই, সেই পদ্ধতিটাই মাটিটাকে মরুভূমি বানাচ্ছে।
ঠিক এইখানে নেদারল্যান্ডসের সেই ফোঁটায় ফোঁটায় পানির গল্পটা ফিরে আসে। যেই ড্রিপ কাচের ঘরে পানি বাঁচায় নব্বই শতাংশ, কেনিয়ার শুকনা মাঠে ষাট, সেটা কি আমাদের জন্য ভাবা যায় না? যায়।
কিন্তু আমরা ভাবি না। আমরা কিনি ডিজেল পাম্প, বছরে সাড়ে চারশো কোটি লিটার ডিজেল পুড়িয়ে, বিপুল ভর্তুকি গুনে, ভূগর্ভের শেষ পানিটুকু টেনে তুলি।
আমরা যেই যন্ত্র কিনি, সেটা সংকটটা বাড়ায়। আর যেই জ্ঞান সংকটটা কমাত, সেটা কিনি না।
দক্ষিণাঞ্চলে ঠিক তখন উল্টা দিক থেকে আসছে লবণ। সমুদ্র উঠছে বছরে তিন মিলিমিটার, নোনা পানি ঢুকছে খেতে।
বিশ্বব্যাংকের গবেষণা বলছে, ২০৫০ সালের মধ্যে উপকূলের যেসব উপজেলায় মাটির লবণাক্ততা একটা মাত্রা ছাড়াবে, সেখানে উঁচু-ফলনের ধানের উৎপাদন কমে যাবে সাড়ে পনেরো শতাংশ। জমি এক ইঞ্চিও নড়বে না, শুধু নোনা হয়ে যাবে।
খুলনা-সাতক্ষীরার বহু কৃষক এরই মধ্যে ধান ছেড়ে চিংড়ির ঘেরে ঢুকেছে, কারণ ধান আর হয় না।
উত্তরে পানি ফুরাচ্ছে, দক্ষিণে পানি নোনা হচ্ছে। দুই দিক থেকেই জমিটা ছোট হয়ে আসছে।
আর মাঝখানে আকাশও দিন দিন খেয়ালহীন হচ্ছে। অসময়ের বৃষ্টি, হঠাৎ খরা, আগাম বন্যা। যেই দেশের কৃষি সবচেয়ে বেশি আবহাওয়ার হাতে বন্দি, সেই দেশেই আকাশের খবর পৌঁছায় সবচেয়ে কম কৃষকের কাছে।
➖
এই পুরো হিসাবটার একটা মানুষ-দিক আছে, যেটা বাদ দিলে গল্পটা নিছক সংখ্যা থেকে যায়।
একটা জরিপ বলছে, দক্ষিণ-পশ্চিমের কৃষক পরিবারের তরুণদের মাত্র বিয়াল্লিশ শতাংশ এখনো সরাসরি চাষে যুক্ত। বাকিরা শহরে, নয়তো বিদেশে।
গ্রামে এমন পরিবারের সংখ্যা বেড়েই চলেছে, যেখানে কেউ চাষ করে আর কেউ চাষের বাইরের কাজ ধরেছে, ২০০০ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে এই হার তেইশ থেকে ঊনচল্লিশ শতাংশ। আর সবচেয়ে কম বয়সীদের ভেতরে এই সরে যাওয়ার হার সবচেয়ে বেশি।
সোজা কথায়, তরুণরা চাষ ছাড়ছে। মাঠে থাকছে বৃদ্ধ কৃষক। আর বৃদ্ধ কৃষক, স্বাভাবিকভাবেই, নতুন জাত, নতুন যন্ত্র, নতুন পদ্ধতি নিতে সবচেয়ে অনিচ্ছুক।
তরুণরা কেন ছাড়ছে, তার একটা উত্তর কক্সবাজারের উখিয়ার এক তরুণের গল্পে আছে। আলী আহমেদ, তেইশ বছর, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। বাড়ির চারপাশের ধানক্ষেত তার চোখে একটা অন্ধ গলি, বাবা-মায়ের সেই কোমর-ভাঙা খাটুনির ভবিষ্যৎ, আর কিছু না।
তারপর একদিন সে গ্রামে যন্ত্রের একটা প্রদর্শনী দেখল। যেখানে বাকিরা দেখল একটা মেশিন, আলী দেখল একটা ব্যবসা। সত্তর শতাংশ ভর্তুকিতে একটা রিপার আর দুইটা ট্রান্সপ্লান্টার কিনল। আজ সে নিজে উদ্যোক্তা, ষাট একর জমিতে যন্ত্র-সেবা দেয়।
আলীর গল্পটা সুন্দর, এবং সত্য। কিন্তু খেয়াল করেন, আলী চাষে ফিরল কেন। কারণ চাষটা হঠাৎ তার কাছে একটা ব্যবসা হয়ে উঠল, একটা মর্যাদা হয়ে উঠল। যন্ত্রটা তাকে সেই মর্যাদা দিল।
তাহলে যন্ত্র জরুরি, তর্ক নাই। সমস্যা হলো, যন্ত্রই যথেষ্ট না। আলীর মতো একজন সফলের পাশে দাঁড়িয়ে আছে হাজারটা আলী, যারা হারভেস্টার কিনতে গিয়ে দ্বিগুণ দাম দেয়, যাদের যন্ত্র নষ্ট হলে সারানোর লোক নাই, যারা ভর্তুকির টাকা তুলতে গিয়ে দালালের হাতে পড়ে।
একজন আলীকে দেখিয়ে পুরো ব্যবস্থার ছবি আঁকা যায় না।
➖
তাহলে সব মিলিয়ে হিসাবটা কী দাঁড়াল?
পৃথিবীর কৃষি-পরাশক্তিরা একটা জিনিস ধরে ফেলেছে, যেটা আমরা এখনো ধরিনি। আসল সম্পদ যন্ত্র না। আসল সম্পদ হলো যন্ত্রটা বানানোর, চালানোর, আর নিজের মাটির উপযোগী করে বদলে নেওয়ার জ্ঞান।
নেদারল্যান্ডস বীজ বেচে, আমরা বীজ কিনি। ফোঁটা মেপে পানি বাঁচানোর কৌশল বেচে, আমরা পানি নিঃশেষ করার পাম্প কিনি।
ভিয়েতনাম দুর্ভিক্ষ থেকে উঠে সত্তর বিলিয়নের রপ্তানিকারক, আমরা স্বনির্ভরতায় পৌঁছেও ধারের ভিতে দাঁড়িয়ে। ভারত এক টাকার পূর্বাভাসে তিনশো টাকা ফলায়, আমাদের একজন লোক দুই হাজার কৃষক সামলায়।
কেন কিনি, সেই প্রশ্নটাও এবার করা দরকার। কারণ এটা বোকামি না, এটা হিসাব।
যন্ত্র কেনায় ফিতা আছে, ছবি আছে, এই মেয়াদেই দেখানোর মতো সাফল্য আছে। আর প্রতিটা ক্রয়ে আছে মার্জিন, যেই মার্জিনের ভাগ হারভেস্টার-কেলেঙ্কারিতে আমরা দেখেছি। গবেষণায় এসবের কিছুই নাই।
একটা ধানের জাত বানাতে লাগে দশ-বারো বছর। ততদিনে সরকার বদলায়, সচিব বদলায়, কৃতিত্ব নেওয়ার কেউ থাকে না। একটা মাঠকর্মীর বেতনে কমিশন নাই, একটা জিন-লাইব্রেরিতে ফিতা কাটার কিছু নাই।
ফলে প্রকল্প-রাষ্ট্র প্রতিবার জিনিস বাছে, প্রতিষ্ঠান বাছে না। জ্ঞান হেরে যায় প্রণোদনার কাছে। আর যেটুকু জ্ঞানের অবকাঠামো হয়, ওই বামিসের মতো, সেটাও হয় দাতার প্রকল্পে, দাতার মেয়াদে।
সবচেয়ে অস্বস্তিকর কথাটা তাই এই, কেউ এর হিসাবও রাখছে না। কোন প্রযুক্তি কিনলাম, কোন জ্ঞান বানালাম, কোন নির্ভরতা থেকে বেরোনোর দরজা আছে আর কোনটার গায়ে দেয়াল, এই খতিয়ানটা রাখা কোনো মন্ত্রণালয়ের কাজের মধ্যেই পড়ে না।
এখানে একটা সত্যি কথা না বললে অবিচার হয়। ভাতে আমরা প্রায় স্বনির্ভর, এটা বিরাট অর্জন, ছোট করে দেখার কিছু নাই। দুর্ভিক্ষের দেশ আজ চাল রপ্তানির কথা ভাবে।
কিন্তু সেই স্বনির্ভরতার নিচে পা রেখে দাঁড়ালে দেখা যায়, ভিতটা ধারের। বিদেশি বীজ, নিঃশেষিত পানি, ভাড়া করা যন্ত্র, আর তিরিশ বছরের পুরানা দুইটা জাত।
শেষ প্রশ্নটা তাই এমন, কালকে যদি বীজ বন্ধ হয়, পানি ফুরায়, জাত ভেঙে পড়ে, তাহলে বেরোনোর কোন রাস্তা খোলা আছে?
সবাই কিনেছে দরজা। আমরা কিনেছি যন্ত্র। যন্ত্রের কোনো দরজা থাকে না।
#ব্রডশিট #কৃষি #বাংলাদেশ #প্রযুক্তি #খাদ্যনিরাপত্তা