10/05/2022
জয়রামপুরের সাথেও শের শাহ সুরী র স্মৃতি জড়িত
শের শাহ সূরীর সংস্কার ও কৃষকবান্ধব চরিত্র
শের শাহর প্রকৃত নাম ছিল ফরিদ খান, পিতা হাসান খান। পিতা তাঁর এক দাসিকে বিবাহ করে জ্যেষ্ঠ পুত্রের প্রতি উদাসিন হয়ে পড়েন। পিতা-পুত্রের মন কষাকষি রোধে কয়েকজন পারিবারিক বন্ধু ও আত্মীয় মধ্যস্থতা করেন। শুভাকাঙ্খিদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় পিতা-পুত্রের মিলন হলে পিতা হাসান পুত্রকে সাসারাম ও খাওযাসপুত্র পরগণার শাসনভার দিলেন। শাসনভার দেওযার আগে পুত্র ফরিদ খানের তরফ থেকে পিতা একটি পত্র পান। মনে করা হয় এই পত্রের মর্মো্দ্ধার করেই পিতা পুত্রর উপর সন্তুষ্ট হন। আমরাও দেখতে পাই শের শাহ নামক ভবিষ্যত ভারত সম্রাটের মানবিক দিকটি।
ন্যায়ই রাজ্যের প্রধান শক্তি এবং উন্নতির মূলমন্ত্র। অন্যায় বড় ভয়ঙ্কর ও দূষিত বস্তু। তা শাসন ব্যবস্থাকে জীর্ণ করে দেয় ও রাজ্যের ধ্বংস ডেকে আনে। আমি জেনেছি যে, আপনার এমন কিছু আত্মীয় আছে যারা এই দুই পরগণায় জমি পেয়েছেন এবং তাঁরা স্থানীয় প্রজাদের উপর অন্যায় করে যাচ্ছেন। আমি তাঁদের ভালোরকমের পরামর্শ দিয়ে সংশোধনের চেষ্টা করব। কিন্তু যদি তাঁরা আমার হুকুমের পরোয়া না করেন তাহলে তাঁদের উপযুক্ত দন্ড দেব যাতে তাঁরা সৎকর্ম করার শিক্ষা লাভ করতে পারেন। যদি আপনি আমাকে এ ব্যাপারে পূর্ণ অধিকার না দেন এবং আমার প্রচেষ্টায় হ্স্তক্ষেপ করেন তাহলে আমি আমার কর্তব্যপালনে সক্ষম হব না।
ফরিদ খান যে দুটি পরগণার বার পেলেন। সেই দুটি পরগণা বাংলা সীমান্তবর্তী হলেও বাংলার প্রবেশের প্রচলিত পথে ছিল না। রাজমহলের পাশ দিয়ে পুরনো পথ বাদ দিয়ে এই পথেই ইখতিয়ারউদ্দিন মহম্মদ বখতিয়ার খালজি বাংলায় প্রবেশ করেন। ত্রয়োদশ শতকের মতই ষোড়শ শতকেও এলাকাটি ছিল পাহাড়-জঙ্গলাকীর্ণ। চের ও সাওর নামক অনার্য আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় ভোজপুরি পারমার রাজপুতরা রাজত্ব করত। মুসলিমরা এদেরই হটিয়ে রাজত্ব বিস্তার করে। তবে কৃষিকার্যে ব্যাপৃত অধিকাংশ মানুষই ছিলেন হিন্দু। তারা ছিল ক্ষত্রিয় ও আহির শ্রেণির। পাহাড়-জঙ্গলাকীর্ম এলাকাটি ছিল অত্যাচারি চোর-ডাকাতদের আশ্রয়স্থল, যাদের অত্যাচারী জমিদাররা সাধারণ কৃষকদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করত। স্বাভাবিকভাবেই অধিবাসীরা কোন নিয়মকাণুন মানত না, ছিল উচ্ছৃঙ্কল।
এহেন জায়গার জায়গিরদার হয়ে ফরিদ খান প্রথমেই আইনশৃঙ্খলার উন্নতির দিকে নজর দিলেন। এটি কার্যকর করতে গিয়ে সবার আগে তিনি নজর দেন কৃষকদের নিরাপত্তা ও আর্থিক স্বাচ্ছল্যের দিকে। কৃষকরা ছিল সব থেকে অত্যাচারিত। সাধারণ সৈলিকেরা কৃষকদের দিয়ে বেগার খাটাতো, অন্যথায় তাদের গৃহ-সম্পদ, স্ত্রী-পুত্রদের লুঠ করত। অভিযোগ জানানোর জন্যে যে মুকদ্দম (পাটোযারী নিযুক্ত খাজনা আদায়কারী দালাল), ও পাটোযারী (জায়গিরদার নিযুক্ত মূল খাজনা আদায়কারী) ছিল তারা সৈনিকদের ঘাটাতো না। কারণ, অধিনস্থ সৈনিকেরা গোলযোগপূর্ণ এলাকায় ছিল তাদের জন্যে লড়াই করার অনুচর।
তিনি বলতেন, ‘কৃষকদের থেকেই দেশের সমৃদ্ধি আসবে। আমি জানি যে, কৃষিকাজ গরিব কৃষকদের উপরই নির্ভরশীল। তাদের অবস্থা যদি খারাপ, তাহলে তারা কিছুই উৎপাদব করতে পারবে না। আর যদি তারা সমৃদ্ধ হয়, তাহলে কৃষি উৎপাদন আরও বাড়াতে পারবে’।
এহেন অরাজক অবস্থার পরিবর্তনে ফরিদ খান কঠোর হলেন। তিনি জানতেন ও বুঝতেনও কৃষকরাই অর্থনীতির বনিয়াদ। তাই কৃষকদের রক্ষার জন্যে তিনি সৈনিক, কৃষক, মুকদ্দম ও পাটোয়ারীদের ডাকলেন। তিনি প্রথমেই পিতা দ্বারা অর্পিত ক্ষমতার কথা উল্লেখ করে বললেন তিনি কর্মচারীদের বহাল ও বরখাস্তের দায়িত্বপ্রাপ্ত এবং এলাকায শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে চান। সৈনিকদের দেশরক্ষার কাজে উৎসাহিত করে কৃষকদের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘আজ আমি তোমাদের আদেশ দিচ্ছি, আজ থেকে ভূমিকর তোমরা আনাজপাতি বা অর্থমূল্যে, যেভাবে ইচ্ছা হয, সেভাবে দিতে পারবে। তোমরা সেই নিয়মমত দাও, যা তোমাদের পক্ষে সুবিধা ও লাভদায়ক’।
ফরিদ খান কর্মচারীদের বললেন, ‘আমি জানি তোমরা কর উসুল করার সময় কৃষকদের সাথে কি রকম দুর্ব্যবহার কর। আমি জরিমানা ও মুহাসিলানা নামক কর নিশ্চিত করে দিয়েছি, এর বাইরে যদি তোমরা অতিরিক্ত কর কৃষকদের কাছ থেকে আদায় কর তাহলে সেই পরিমাণ অর্থ তোমাদের পাওনা থেকে কেটে নেওয়া হবে। একথাও জেনে রাখ যে, এই কর উসুলের হিসাব আমি নিজে তোমাদের সামনে রেখেই করব। আমি কৃষকদের কাছ থেকে কেবল সুনির্দিষ্ট করই উসুল করাব। আর দেখব যে রবি ও খরিফের কর ঠিক সময়েই উসুল করা হয়েছে। কেননা কর বাকি রাখলে পরগণার শাসনব্যবস্থা সুচারুররূপে সম্পন্ন হবে না। এর ফলেই, সরকার, কৃষক ও কর্মচারীদের মধ্যে ঝগড়া হয়। শাসকের কর্তব্য কৃষকের আয়ের উপর ন্যায্য কর ধার্য করা। কিন্তু ন্যায্য কর আদায়ের জন্যে প্রয়োজনে কঠোর হতে হবে। যদি কোন কৃষক ন্যায্য কর দিতে টালাবাহানা করে , তাহলে শাসকদের এমন কঠোর ব্যবহার করা উচিত যে. তা দেখে অন্য কৃষকেরা ভয় পেয়ে যায়’।
কৃছকদের আশ্বস্ত করে ফরিদ বললেন, ‘আপনাদের যতই কষ্ট হওক না কেন, তাদের (খাজনা আদায়কারী) বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে সরাসরি আমাকে বলবেন। কেননা আপনাদের উপর জুলুমকারীদের কখনই আমি ক্ষমা করব না’।
কর্মচারীদের আরও একবার বললেন, ‘কৃষকরাই পরগণার সমৃদ্ধির মূলে্স্রোত, আজ আমি তাদের সমস্তরকম আশ্বাস দিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছি। আমি তাদের সমস্ত হিতের প্রতিই নজর রাখব আর দেখব যে, তাদের যেন কোনরকম অত্যাচারের জন্য কষ্ট সহ্য করতে না হয়। কেননা যদি, কোনো শাসক অত্যাচারী কর্মচারীদের কবল থেকে তাঁর রাজ্যের কৃষকদের রক্ষা করতে না পারেন তাহলে তাদের কাছ থেকে কোনোরকম কর আদায় করার অধিকার তার তাকতে পারে না। আমি জেনেছি যে, এই পরগণা দুটিতে এমন কিছু অত্যাচারী জমিদার ও কর্মচারী আছে যারা কৃষকদের উপর অত্যাচার করে। তারা উসুলকৃত কর রাজকোষে জমা দেয না এবং পরগণার শাসকদের আদেশও অমান্য করে, ডাকলে তারা সামনে এসে উপস্থিত হয় না।
শের শাহর কল্যাণকর রাষ্ট্রের প্রভাবঃ কৃষকদের কাছে উৎপন্ন ফসল দিয়ে ভূমিকর দেওযাটাই মুদ্রার অপ্রতুলতার জন্যে বেশি জনপ্রিয় ছিল। এই ব্যবস্থাটিকে প্রায় আড়াইশো বছর পর ১৭৬৫-তে দেওযানি পেয়ে ইংরেজরা ভেঙে দেয। দেশে পাঠানোর জন্যে মুদ্রার মাধ্যমে কর দেওযার প্রথা চালু করায় বাংলার অর্থনীতি তছনছ হয়ে যায়। ফল হয় ১১৭৬-এর দুর্ভিক্ষ বা মন্বন্তর। শের শাহ জায়গিরদার ও কৃষক উভয়ের মধ্যেই সরাসরি যোগাযোগ রাখেন। সধ্যসত্ত্বভোগি জমিদারী প্রথাকে না ভেঙেও সরাসরি জায়গিরদারের সঙ্গে কৃষকদের যোগাযোগ চলতে থাকা কায়েমি স্বার্থকে আঘাত করে। ইংরেজরা ৫ শালা ব্যবস্থা ও চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে এই কায়েমি স্বার্থকে উসকে দেয়। এরা ছিল ভূমির সঙ্গে সম্পর্কহীন কোলকাতার বাবু যারা নিজেদের আর ইংরেজদের স্বার্থ ছাড়া কিছু বুঝত না, প্রকৃত জমির মালিক কৃষকেরা ছিল ব্রাত্য। ইংরেজ কতৃক শের শাহ প্রবর্তিত প্রথাকে ভেঙে দেওয়ার কুফল আজকের বাংলার তথা ভারতবর্ষ ভোগ করছে।
কলম( চৌধুরী আতিকুর রহমান )
ইতিহাস ঐতিহ্য ১০.০৫.১৮