24/06/2017
গীতা হিন্দুধর্মের উপদেশমূলক একটি দার্শনিক গ্রন্থ। গীতা অনুযায়ী হিন্দুধর্ম একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায় বা সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, তা বহুযুগ পার হয়ে মানব সমাজে আবির্ভূত একটি চিরন্তন ধর্ম। গীতায় ব্যবহূত ‘ধর্ম’ শব্দটি নির্দিষ্ট কোনো সম্প্রদায়ের বিশ্বাসকে নির্দেশ করে না। এ শব্দটি দ্বারা এমন একটি বিশ্বাসকে নির্দেশ করা হয়েছে, যা ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষই অনুশীলন করতে পারে। তা হলো মানুষের গুণগত বা পেশাগত ধর্ম। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পূর্বে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে এই ধর্ম পালনের কথাই জোর দিয়ে বলেছেন।
হিন্দুধর্মের অন্যতম মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো ফলের প্রত্যাশা না করে কাজ করা। ভগবদ্গীতায় এ বিষয়টি চমৎকারভাবে বর্ণিত হয়েছে। এ দর্শনের বক্তব্য অনুযায়ী সৃষ্টি রক্ষার্থেই মানুষকে সমাজের প্রতি অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে হবে। কাজ না করলে সৃষ্টি লোপ পাবে। তবে মানুষকে এ কাজ করতে হবে কোনো প্রকার পুরস্কারের প্রত্যাশা না করে। যখন কোনো কাজ পুরস্কার বা প্রতিদানের প্রত্যাশায় করা হয় তখন তা বন্ধনের উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়। অপরদিকে ব্যক্তিক লাভালাভের প্রত্যাশা না করে কোনো কাজ করা হলে তা মোক্ষ লাভের কারণে পরিণত হয়। মানুষ তখন আর ব্যক্তিগত লোভ-লালসা বা পুরস্কারের প্রত্যাশায় আবদ্ধ থাকে না, তখন সে বিশ্বের সকলের সঙ্গে নিজেকে এক করে দেখতে শেখে।
এ বিষয়টি স্বভাবতই একটি প্রশ্নের অবতারণা করে যে, যদি কেউ ব্যক্তিগত লাভালাভের কথা চিন্তা না করে কোনো কাজ করে এবং তার ফলাফলের দ্বারা ব্যক্তিগতভাবে উপকৃত হতে না চায়, তাহলে উক্ত ফলাফলে কে লাভবান হবে? এর উত্তরে গীতায় বলা হয়েছে যে, সকল কাজের ফল ঈশ্বরে সমর্পণ করতে হবে। গীতার মতে ঈশ্বর সর্বভূতে, অর্থাৎ সকল জীব ও জড়ে বিরাজমান। এ দুটি মতবাদকে একত্রে বিবেচনা করলে দেখা যায় যে, কর্মের ফল কোনো একক ব্যক্তির নয় বরং পৃথিবীর সকল প্রাণীর মঙ্গলের জন্য। এই যে বৈশ্বিক মনোভাব এটাই হিন্দুধর্মের মৌলিক বিশেষত্ব।
সকল ক্ষেত্রেই শক্তি প্রয়োগ নীতিবহির্ভূত হিন্দুধর্ম এ দর্শনে বিশ্বাস করে না। উদাহরণ হিসেবে গীতায় বর্ণিত ক্ষত্রিয়ের দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথা বলা যায়। সেখানে রাষ্ট্রে একজন ক্ষত্রিয়ের করণীয় সম্পর্কে সুস্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ধর্মে অবশ্যই রাজনীতি ও শৌর্য-বীর্যের স্থান রয়েছে, তবে প্রেম-ভালোবাসার স্থান সকলের ওপরে। হিন্দুধর্মে সকল প্রাণী এমনকি পশুপাখিদের প্রতিও যথাযথ করুণা প্রদর্শনের নির্দেশ রয়েছে। হিন্দুধর্ম অনুযায়ী মানুষ, পশুপাখি সকল প্রাণীই সমভাবে পবিত্র। ফলে স্বাভাবিকভাবেই হিন্দুরা প্রাণিজগতের নির্বিচার নিধনে আতঙ্কিত হয়, যদিও মানুষের খাদ্য হিসেবে পশুপাখি প্রভৃতি হত্যা এ ধর্মেও স্বীকৃত। হিন্দুধর্মে মাংস ভক্ষণ স্বীকৃত হলেও নিরামিষ ভোজনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। তবে বিশেষ বিশেষ ধর্মীয় অনুষ্ঠানে মাংসভক্ষণ একেবারেই নিষিদ্ধ।
পুরোহিততন্ত্রে নৈতিকতা ও আনুষ্ঠানিক পবিত্রতার মধ্যে বিভ্রান্তি লক্ষ করা যায়। এতে একজন মানুষ হত্যার চেয়ে তার মৃতদেহ স্পর্শ করা গুরুতর অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত। অবশ্য প্রধান শাস্ত্রসমূহে এসবের পরিবর্তে আত্মনিয়ন্ত্রণ ও মানবপ্রেমের ওপরই অধিক জোর দেওয়া হয়েছে। মানুষের কাঙ্ক্ষিত নৈতিক দায়িত্ব পালনের জন্য আত্মনিয়ন্ত্রণের অনুশীলন অত্যাবশ্যক। কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ এগুলি মানুষকে কুপথে পরিচালিত করে নরকের দ্বারে নিয়ে যায়। একজন প্রকৃত হিন্দু এগুলিকে স্বীয় সৎ গুণাবলি দ্বারা দমন করেন। তিনি পবিত্রতা দ্বারা কামকে, প্রেম দ্বারা ক্রোধকে এবং ঔদার্য দ্বারা লোভ ও মোহকে সংবরণ করেন। বেদে বলা হয়েছে: ‘যে বাধা অতিক্রম করা কষ্টকর তা অতিক্রম কর। ক্রোধকে ভালবাসা দ্বারা এবং মিথ্যাকে সত্য দ্বারা জয় কর।’ মহাভারতে বলা হয়েছে: ‘স্বীয় জ্ঞানালোকে আলোকিত মহান ঋষিরা যেসকল ধর্মীয় নিয়ম বা সদাচার শিক্ষা দিয়েছেন, সেসবের মধ্যে আত্মনিয়ন্ত্রণ শ্রেষ্ঠ।’ এই আত্মনিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা অর্জনের জন্য কৃচ্ছ্রতাসাধন ও বৈরাগ্য অবলম্বন প্রয়োজন। কিন্তু আত্মনিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা অর্জিত হয়ে গেলে আর এসবের প্রয়োজন থাকে না।
হিন্দুধর্মে অনুশোচনার পর্যাপ্ত বিধান রয়েছে। যদি কোনো ব্যক্তি পাপ করার পর তার জন্য অনুশোচনা করে বা পাপমুক্তির জন্য প্রবল আকুতি জানায়, তাহলে তার পাপ নষ্ট হয়ে যায়। যদি সে প্রতিজ্ঞা করে যে সে আর কখনই ওই পাপ করবে না, তাহলে সে পবিত্র হয়ে যাবে। হিন্দুধর্মমতে যিনি নিজেকে কর্ম থেকে বিরত রাখেন তিনি প্রকৃত সন্ন্যাসী নন। যোগাভ্যাস ও কর্ম উভয়ই সমার্থক। জ্ঞান ও কর্মের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। জ্ঞানীরা নন, বরং সাধারণ লোকেরাই জ্ঞান ও কর্মকে পৃথক মনে করে। একজন জ্ঞানী ও একজন কর্মীর অর্জিত শান্তি একই। তিনিই প্রকৃত সত্যের সন্ধান পান যাঁর দৃষ্টিতে জ্ঞান ও কর্ম এক।