14/12/2022
নড়াইল সদর থানার গোবরা গ্রামটি ১ মাইলের উর্ধ্বে লম্বা। পূর্ব দিকে সামাদ মোল্লাদের বাড়ি থেকে পশ্চিম পাড়ার খলিসা খালির বটতলা পর্যন্ত লম্বা ছিল। উত্তর দিকে গোবরা বাজারের মেছোপট্টি থেকে দক্ষিণ পাড়ার উৎপল বিশ্বাসদের বাড়ি পর্যন্ত বিস্তৃত। এই গ্রামে আমার ছোট বেলায় শ্রদ্বেয় জ্ঞানবালা সম্পর্কে জানতাম তিনি কমিউনিস্ট পার্টি করতেন। যেহেতু আমাদের পরিবারের সাথে পাতানো আত্মীয় সূত্রে ঘনিষ্ঠতা ছিল সেকারণে জ্ঞানদাকে চিনতাম। বাবাকে জিজ্ঞাসা করতাম জ্ঞানদাকে কেন কমিউনিস্ট বলে? বাবা উত্তরে বলতেন কমিউনিস্টরা সবাই সমান হবে এটা চায়। আরো যুক্ত করতেন কমিউনিস্টরা কোন জাতপাত মানে না। নাবুঝেই ঐটুকু কথার মধ্য দিয়ে কমিউনিস্টদের প্রতি আমার চেতনার জগতে এক দুর্বলতা তৈরি হয়। বাবা আরও বললেন এই সব অঞ্চলে কমিউনিস্টরা ১৯৪৬ সালে তেভাগা আন্দোলন করে ছিলেন। আমি যখন একটু বুঝতে শিখেছি তখন গোবরা গ্রাম ও ঐ অঞ্চলে সম্পত্তি আভিজাত্যের কলোড়া গ্রামের ছোট জমিদার পরিবারদের চিনতাম। অন্য দিকে গোবরা গ্রামে ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, সাহা, দত্ত, শীল, ধোপা, রাজবংশী(জেলে) বাউতি, নমশুদ্র, মালো, মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষকে দেখেছি। সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে যে বিভাজন, জাতপাতের যে লড়াই, হিংসা, বিদ্বেষ, ঘৃনা দেখেছি তা ভাবতেও ঐ সময় কষ্ট পেতাম। মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে কারিগর(জোলা), নিকেরী এধরনের বিভাজন দেখেছি। তাই তো নবম শ্রেণীর ছাত্র অবস্থায়ই সম্পত্তি আভিজাত্য ও সম্প্রদায় আভিজাত্যের বিরোদ্ধে রুখে দাড়িয়ে ছিলাম। এ প্রসঙ্গে আলোচনা বিস্তৃত করবনা। গোবরা গ্রামে একমাত্র (নাজির) সুশীল চক্রবর্তীর পরিবারেই কিছু প্রগতিশীলতার উপাদান দেখেছি। সুশীল চক্রবর্তী, তাঁর বড় ছেলে চিত্রঞ্জন চক্রবর্তী(সাধন), মনোরঞ্জন চক্রবর্তী, নেনু, দেব রঞ্জন চক্রবর্তী, স্বদেশ চক্রবর্তী। এই পরিবারে সুশীল চক্রবর্তী তাঁর ছেলেদের নিয়ে গড়গড়া(হুকা) একসাথে বসে খেতেন। ঐ বাড়িতেই মুসলিম সম্প্রদায়ের লাল মিয়া, আব্দুস সামাদ, দিনালি বিশ্বাস, আব্দুস সাত্তারকে যাতায়াত ও খাওয়া দাওয়া করতে দেখেছি। তা ছাড়া একটি হিন্দু পরিবারও ছিলনা যাদের বাড়িতে মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকজনের উঠাবসা ছিল। আরেকটি ব্যতিক্রম ছিল পাশের বাড়ির কৃষ্ণ চক্রবর্তীর বিবাহিত বোন অপুকে কেন্দ্র করে আব্দুল খালেক উঠাবসা করতেন। শেষ পর্যন্ত অপুকে আব্দুল খালেক বিয়ে করে ফেলেন। এই বিয়েকে কেন্দ্র করে হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে গভীর প্রতিক্রিয়া হয়ে ছিল। আমাদের বাড়িতে গোবরা স্কুলের এলাহী বক্স সাহেবের যাতায়াত রাত যাপন ও মুসলিম সম্প্রদায়ের বন্ধুদের সাথে আমার উঠাবসা ও ঘনিষ্ঠতা ছিল। ঐ সময়ে সুশীল চক্রবর্তীর বাড়ির উঠানেই নবাব সিরাজউদ্দৌলা নাটকটি মঞ্চস্থ হয়ে ছিল। চিত্ত রঞ্জন চক্রবর্তী সিরাজউদ্দৌলার ভূমিকায় অভিনয় করে ছিলেন এবং ঐ বাড়িরই মনি চক্রবর্তী গোলাম হোসেনের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন।
গোবরা গ্রামে হাতে গোনা দুয়েকটি পরিবার ছাড়া প্রায় অধিকাংশ মুসলিম মুসলিম লীগের সমর্থক ছিলেন। দূরত্ব বজায় রেখে আমাদের গ্রামে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে দেখেছি। শুধুমাত্র সুশীল চক্রবর্তীর পরিবারে কিছু কিছু কাজে প্রগতিশীলতা দেখেছি। অতীত সম্পর্কে আমার আত্মজীবনী মূলক বইয়ে "যা দেখেছি যা করেছি" সে সম্পর্কে বিস্তারিত লিখেছি। মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে গোবরা পশ্চিম পাড়ার সৈয়দ আবুল কাশেম কবিরত্নও ছিলেন একজন প্রগতিশীল মানুষ যিনি তাঁর লেখার মাধ্যমে তার প্রগতিশীল চেতনার ছাপ রেখে গেছেন। আমি তাকে গভীর শ্রদ্ধার সাথে আজও স্বরণ করি। আজ ঐ অঞ্চলে প্রগতিশীল আন্দোলন জোরদার থাকলে অধিকাংশ তরুণ মাদকাসক্তের পথে যেতনা। যে সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা তাদের শোষণ ও লুণ্ঠনের স্বার্থে নতুন প্রজন্মকে ধ্বংস করে দিচ্ছে তার বিরুদ্ধে ঐ অঞ্চলের সাহসী আদর্শবান নৈতিক ভাবে উন্নত কেও রুখে দাঁড়ালে আমার এই শেষ বয়সে আমার গর্বের গোবরা গ্রামের ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনতে চাই।
সৌজন্যে : কমরেড বিমল বিশ্বাস ।