04/08/2025
২০১৪ সালের ৪ আগস্ট। সেদিন সকাল সাড়ে ১১টার দিকে সময় থমকে গিয়েছিল পদ্মার বুকে। মুন্সীগঞ্জের মাওয়া ঘাট থেকে কাওড়াকান্দিগামী পিনাক-৬ নামের একটি লঞ্চ, অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই অবস্থায়, ঢেউ ও দুর্যোগের মুখে মুহূর্তেই তলিয়ে যায় পদ্মার গর্ভে।
আজ সেই হৃদয়বিদারক ঘটনার ১১ বছর পূর্ণ হলো। তবে সময় পেরোলেও শোক পেরোয়নি। এখনও নিখোঁজ অনেক প্রিয়জনের নাম অশ্রু হয়ে ভেসে আসে স্বজনদের চোখে। মৃত্যুর নিঃসীম যন্ত্রণা, প্রিয়জন হারানোর কান্না আর বিচারহীনতার যন্ত্রণায় সেই সকাল আজো যেন জীবন্ত।
১৯৯১ সালে নির্মিত পিনাক-৬ ছিল মাত্র ৮৫ জন যাত্রী পরিবহনের অনুমতি প্রাপ্ত। অথচ দুর্ঘটনার দিন সেটিতে উঠেছিল প্রায় তিন থেকে চার গুণ বেশি মানুষ—প্রায় আড়াই শতাধিক যাত্রী। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া, স্রোতের তীব্রতা ও অতিরিক্ত যাত্রীর চাপ একত্রে মিলেই ঘটায় ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ নৌ-দুর্ঘটনা।
ঘটনার পরপরই আশপাশের মানুষ আর স্থানীয় জেলেরা উদ্ধার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। পরে অংশ নেয় নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড, র্যাব, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিসসহ ৭টিরও বেশি সংস্থা। প্রায় ১২০ জন যাত্রী প্রাণে বেঁচে গেলেও, ঘটনাস্থল ও আশেপাশের নদীতে উদ্ধার করা হয় ৪৯টি ম/রদেহ।
তবে আজও নিখোঁজ ৬১ জন যাত্রীর সন্ধান মেলেনি। সেই মানুষগুলো কোথায়? নদীর গভীরে? না কি সময়ের অতল গহ্বরে হারিয়ে গেছে সব চিহ্ন?
ঘটনার পর সাত দিনব্যাপী বহু সংস্থা উদ্ধারকাজ চালালেও লঞ্চটির হদিসই মেলেনি। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারেও ব্যর্থ হয়েছে কাণ্ডারি-২, সন্ধানী, জরিপ-১০ সহ একাধিক অনুসন্ধানী জাহাজ।
শেষমেশ, ৮ আগস্ট—মাত্র চারদিন পর—মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসন ঘোষণা দেয় উদ্ধার অভিযান বন্ধ। নিখোঁজ স্বজনদের আর্তনাদ, স্বজনহারাদের ক্ষোভ ও চোখের জলের কাছে সেই ঘোষণা হয়ে ওঠে আরেকটি দুঃস্বপ্ন।
একদম শেষের দিকে টোটকা অভিযান বিশ্বাসের শেষ আলো ছিলো!
সরকারি ব্যর্থতার পর মেদেনীমণ্ডলের সাধারণ মানুষ নদীর মাঝে ‘টোটকা অভিযান’ চালায়। একরকম আধ্যাত্মিক ভরসায় নদীর বুক চিরে খোঁজে হারিয়ে যাওয়া লঞ্চটিকে। কিন্তু কোনো হদিস না মেলায় ভেঙে পড়ে তাদের শেষ আশা। নদী যেন শুধু লাশ নয়, গিলে নিয়েছিল আশা, স্বপ্ন আর ভবিষ্যতও।
১১ বছর পরও কিন্তু প্রশ্ন রয়ে গেছে!
কেন অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে ছাড়তে দেওয়া হলো লঞ্চটিকে? কেন এত উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করেও খুঁজে পাওয়া গেল না পিনাক-৬ এর ধ্বংসাবশেষ? নিখোঁজদের স্মরণে সরকার কি কোনো স্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করেছে?
হয়তো এতগুলো প্রশ্নের উত্তর নেই। শুধু আছে কিছু ঝাপসা ছবি, কিছু মুছে যাওয়া নাম, আর কিছু নদীপ্রান্তিক মা-বাবা, ভাই-বোনের চোখের জল। এই ট্র্যাজেডি যেন বাংলাদেশের নৌ-ইতিহাসের এক অমোচনীয় কালিমা।
পিনাক-৬ ডুবে যাওয়ার সেই সকাল শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়—এটি হয়ে আছে একটি জাতির গাফিলতির প্রতীক, আর শতাধিক পরিবারের চিরস্থায়ী শোকগাথা।