17/07/2020
শিশুর প্রতি আপনার রাগ/জিদ যেভাবে নিয়ন্ত্রণ করবেন
মাঝে মাঝে বাচ্চারা এমন বিরক্ত করে যে রাগ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে, আপনি যখন জানেন যে, চিৎকার চ্যাঁচামেচি, ভয় দেখানো বা ওকে উপেক্ষা করেও কোনো লাভ নেই তখন, আপনার জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। আশা হারাবেন না, কৌশলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করুন; ছোট্ট বাচ্চারা যখন কোনো বিষয় নিয়ে বিরক্ত হয় তখন ওরাও মনে করবে, চিৎকার চ্যাঁচামেচি করলেই হয়তো সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। তবে আমরা যদি রাগারাগি করার বদলে, নিজেদের আবেগ/ রাগ নিয়ন্ত্রণ করি- - - এতে শিশুদেরও শেখানো হয় কীভাবে আত্মনিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, শিশুরা সব কিছু আমাদের দেখেই শেখে।
* আপনি কেন রেগে যাচ্ছেন বা ধৈর্য হারাচ্ছেন সেটার কারন খুঁজে বের করুন- যখন কারণটা বুঝতে পারবেন তখন রাগ সামলানো আপনার জন্য সহজ হয়ে যাবে, আপনি সঠিক সিধান্ত নিতে পারবেন।
* সকাল বেলাটা সব মায়ের জন্যই বেশি ঝামেলার- - - সকালে যেন তাড়াহুড়া না করতে হয় তার জন্য বেশ কিছু কাজ রাতেই গুছিয়ে রাখুন, বাচ্চাদেরও সেভাবে ট্রেনিং দিন। যেমন; রাতেই প্ল্যান করে রাখুন স্কুলে ওকে কী খাবার দেবেন। এছাড়া, স্কুলের ইউনিফর্ম, ব্যাগ, জুতা মোজা, পানির বোতল, বাচ্চার চুল বাঁধবার ব্যান্ড, চিরুনি - - সব হাতের কাছে রাখুন।
বাচ্চাদের আচরণ বুঝতে শিখুন- আপনার নয় বছর বয়সী বাচ্চা যদি আপনার দিকে চোখ পাকিয়ে তাকায় তাহলে, রাগ হবার কিচ্ছু নেই। কারন অনেক সময় বাচ্চারা দুষ্টামি করবার জন্য কিবা পরিস্থিতি মজাদার করবার জন্য এমন করতেই পারে, কিছু কিছু বিষয় হালকা ভাবে নিতে শিখুন।
মাত্রারিক্ত দুষ্টামি করলে ওকে ওয়ার্নিং দিন- বলুন আমি তোমার উপরে চিৎকার চ্যাঁচামেচি করতে একেবারে পছন্দ করিনা, বার বার বলার পরও যখন কথা শুনছ না আমি কিন্তু তোমাকে শাস্তি দিতে বাধ্য হবো- - - কথাটা বলুন খুব শান্ত স্বরে চিৎকার করে নয়। ঠাণ্ডাভাবে বলা কথা— - চিৎকার করে বলার চাইতে অনেকবেশি কার্যকরী।
* চিৎকার/ রাগারাগি না করে বরং উপদেশ মূলক গল্পের ছলে শিশুকে সঠিক আচরণ কীভাবে করতে হবে সেটা বোঝান- আমাদের মাবাবা যেমন শিশুকালে আমাদের নানা উপদেশমূলক গল্প মুখে মুখে শুনিয়েছেন বা আমাদের পড়তে দিয়েছেন, তেমন ভাবে আপনার শিশুকে শিখান।
শিশুর জন্য খেলার সময় নির্ধারিত করুন— অনেক মা-বাবা আছেন যারা বাচ্চার সাথে খেলা করতে চান না- তারা নিজেদের নিয়ে এত ব্যস্ত যে বাচ্চার সাথে খেলা করাটা যে খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সেটাকে পাত্তা দেন না। খেলাধুলার মাধ্যমে শিশুকে সবচেয়ে সহজে ডিসিপ্লিন সেখান সম্ভব। শিশুকে ডিসিপ্লিনড করতে, যেমন, খাবার নিজে নিজে খেতে উৎসাহ দিন, দাঁত ব্রাশ করতে, ছড়াছবির বইগুলো যেন জায়গা মতো রাখে, জুতো খুলে ঠিক জায়গায় রাখতে।
সময় নিন- মনে করুন চেষ্টা করা স্বত্বেও আপনি রাগ কন্ট্রোল করতে পারছেন না, বাথরুমে চলে যান জোরে পানির কল ছেড়ে দিন ( ঝাল বাচ্চার উপরে না ঝেড়ে) ইচ্ছেমতো চিৎকার করুন, তারপর টয়লেট ফ্লাশ করুন। দেখবেন আপনার মন শান্ত হয়ে উঠছে, রেগে উঠবার সাথে সাথে বাচ্চাকে লেকচার না দিয়ে বরং পরে ব্যপারটা বুঝিয়ে বলুন।
যে কোনো আচরণ পরিবর্তন হতে বা নূতন কিছু শিখতে সময় লাগে-- -রাগ/ জিদ রাতারাতি নিয়ন্ত্রণ করা শিশুর পক্ষেও অসম্ভব। ধৈর্যের সাথে শিশুকে ট্রেনিং দিন- - - আচরণের পরিবর্তন এবং নূতন স্কিল শেখার আসলে কোনো শেষ নেই।
মাত্রারিক্ত আশা করবেন না— ছোট বাচ্চার কাছ থেকে তার সাধ্যের বাইরে আশা করবেন না, সবকিছুই ও বড়দের সাথে তাল মিলয়ে করতে পারবে এমন আশা করা শুধু ভুলই নয়, চূড়ান্ত বোকামি।
শিশুর সব আবেগ এবং আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা আপনার পক্ষে সম্ভব নয় এবং উচিৎও নয়- -এটা যত তাড়াতাড়ি মেনে নেবেন ততই আপনার জন্য মঙ্গল- - - আপনি ওকে যতটা পারেন সুশিক্ষা দেবেন, যাতে রাগ/জিদ প্রকাশ করবার সুযোগ না পায়।
শিশুদের বেয়াড়াপনা সহ্য করা কোনো মা-বাবার জন্যই সহজ কাজ নয় — তাই নিজে নিজে এমন কৌশল খুঁজে বের করুন যাতে ধৈর্য না হারিয়ে ওকে শান্ত করতে পারেন।
* কিছু কিছু শিশুর রাগ ক্ষোভ কমতে একটু বেশি সময় লাগতে পারে - - শিশুকে সেই সময়টুকু দিন।
* শিশু শান্ত হবার পর এই নিয়ে ওর সাথে কথা বলুন— ওর মনোভাব বা ও কি চাইছে তা যদি যদি বুঝতে না পারেন, তাহলে সেটা আন্তরিকতার সাথে প্রকাশ করুন।
সব মা-পিতার মতো আপনিও হয়তো আতংকিত থাকতে পারেন— যে, পাবলিক প্লেসে শিশু যদি জিদ্দিপনা দেখায় তাহলে সামলাবেন কেমন করে? শিশুকে ধমকা ধমকি বা মারধোর না করে, নিজেকে শান্ত রাখুন পরিস্থিতি যেমনই হোক মুখে হাসি ঝুলিয়ে রাখুন যেন সব কিছু আপনার নিয়ন্ত্রণে আছে, এবার ঐ জায়গা থেকে বের হয়ে যান।
* খেয়াল করুন কখন— আপনার আচরণ আপনার নিজের কাছেই বিরক্তিকর হয়ে দাঁড়াচ্ছে- - নিজেকে জিজ্ঞেস করুন, কেন বাচ্চার সাথে কয়েকদিন ধরে চিৎকার চ্যাঁচামেচি করছি? আমার শরীরটা কী খারাপ,ঠিকমতো ঘুম হচ্ছে না বা কোনো কিছু নিয়ে মানসিকভাবে অস্থির আছি?
যদি রাগের মাথায় চিৎকার করেই ফেলেন— - - বাচ্চাকে সরি বলতে ভুলবেন না, এতে বাচ্চাও শিখবে যে ভুল করলে সেটা স্বীকার করতে হয় এবং তার জন্য মাফ চাওয়া প্রয়োজন।
( সংক্ষিপ্ত অংশ ) বই মনকাহন ২য় খণ্ড "পাওয়ার অফ পজেটিভ প্যারেন্টিং"
Tania Hassaan - Counselling Psychologist.