05/01/2026
প্রত্নসম্পদ নিয়ে কাজের লোক একজনই ছিলেন আবুল কালাম মোহাম্মদ জাকারিয়া ( আকামো জাকারিয়া)। একজন সরকারি আমলা ও শখের ইতিহাসবিদ হয়ে ভদ্রলোক যে অসম্ভব কাজ সাধন করেছেন, তার প্রমাণ স্বাধীন দেশের ৫০ বছর হওয়ার পরও সবাই তার লেখা ও কাজই নকল করছে। দিনাজপুরে কর্মরত থাকা অবস্থায় উনার উদ্যোগে খনব শুরু হয় সীতাকোট বিহারে, এবং এই অনন্য ইতিহাস বর্ণিত জায়গাটি নিয়ে তিনি লিখেছিলেন 'বাংলাদেশের প্রাচীন কীর্তি'(বাংলাদেশের প্রত্ন সম্পদ) বইতে।
'সীতাকোট বিহার'
চরকাই, বিরামপুর অঞ্চল সম্বন্ধে তার কথা শেষ করে আলতাফ সাহেব ছেলেকে বললেন, আমরা এখন যাব সীতাকোট বিহারে। সেখানে যাওয়ার দুটি পথ আছে। নওয়াবগঞ্জ-বিরামপুর পাকা সড়ক ছাড়াও চোর চক্রবর্তী থেকে সীতাকোট পর্যন্ত প্রাচীন করতোয়ার ডান (দক্ষিণ) পাড়ের উপর দিয়ে একটি রাস্তা ছিল। সেই রাস্তা ধরে চোর চক্রবর্তী ও সীতাকোট এই দুই বিহারের ভিক্ষুরা যাতায়াত করতেন। সেই রাস্তাটি খুব খারাপ অবস্থায় আছে। সময় বাঁচাবার জন্য আমরা পাকা সড়ক পথেই যাব। বিরামপুর থেকে প্রায় ৬ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে নওয়াবগঞ্জ উপজেলার অধীনস্থ ফতেপুরমাড়াশ গ্রামে সীতাকোট বিহার অবস্থিত। ১৮৭৪ সালে দিনাজপুরের তদানীন্তন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও বিখ্যাত প্রত্নতত্ত্ববিদ মি. ওয়েস্টমেকট এ স্থান দেখে বলেছিলেন যে, এটি একটি বাঁধানো পুকুর। আর জনসাধারণের বিশ্বাস ছিল যে, রামের স্ত্রী সীতা দেবী তাঁর দ্বিতীয়বার বনবাসের সময়ে বাল্মীকি মুনির আশ্রয়ে এখানে বসবাসরত ছিলেন বলে এই স্থানের নাম সীতাকোট। আর ১৯৬৮ সালে দিনাজপুরের জেলা প্রশাসকের উদ্যোগে এই স্থান উৎখননের ফলে বাংলাদেশে আবিষ্কৃত প্রাচীনতম বিহারগুলির মধ্যে অন্যতম হলেও সীতাদেবীকে এই বিহারের নাম থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা যায়নি।
বিহারের পশ্চিম পাশে দাঁড়িয়ে আলতাফ সাহেব ছেলেকে বললেন, পূর্ব-পশ্চিমে কিঞ্চিৎ লম্বা এই বিহারের আয়তন হচ্ছে ৬৪.৮৪ মিটার × ৬৪.২৪ মিটার (২১৪′ × ২১২')। বিহারের উত্তর দেয়ালের মধ্যবর্তী স্থানে ১.৮১ মিটার চওড়া প্রধান তোরণ। প্রবেশ পথের সামনেই আছে একটি উদ্গত (projected) অংশ এবং তাতে আছে পর পর দুটি প্রবেশপথ। এই উদ্গত অংশের দুই পাশে আছে একটি করে কক্ষ। প্রবেশপথহীন এই কক্ষ দুটি কী উদ্দেশ্যে নির্মিত হয়েছিল তা জানা যায় নি।
সমগ্র বিহারে সর্বমোট ৪১টি কামরা আছে। সর্বোচ্চ ৬.৬৭ মি × ৩.৩৪ মিটার থেকে সর্বনিম্ন ৩.৩৮ মিটার × ৩.৩৪ মিটার আয়তনের কক্ষ এখানে আছে। কক্ষগুলির পিছনে ২.৫৭ মিটার চওড়া যে টানা দেয়াল তাতে দরজা বা জানালার অস্তিত্ব নেই। সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য এসব দেয়ালের বাইরের দিকে কিছু কিছু উদ্গত (offset) অংশ ছিল। ধ্বংসপ্রাপ্ত বিহারটির বাইরের এই দেয়ালের উচ্চতা ১.২১ মিটার থেকে ৩.৬৩ মিটার (৪' থেকে ১২') পর্যন্ত উচ্চতা পাওয়া গেছে। এই পিছনের দেয়াল থেকে ভিন্ন ভিন্ন দেয়াল সৃষ্টি করে বিহারের কক্ষগুলি সারিবদ্ধভাবে নির্মাণ করা হয়েছে। সেসব দেয়ালের কোনোটি ৩.৯৩ (১৩) চওড়া। আবার কোনোটি ১.২১ মিটার থেকে ১.৫১ মিটার (৪' থেকে ৫') চওড়া। কক্ষগুলির সামনের দেয়াল ১.৫১ মিটার চওড়া। প্রত্যেক কক্ষে একটি করে প্রবেশপথ ছিল। সামনের দেয়ালে অবস্থিত প্রবেশ পথগুলি ০.৯০৩ মিটার থেকে ১.৫১ মিটার চওড়া ছিল।
বিহারের প্রত্যেক কামরার মেঝে চুনসুরকি দ্বারা শক্তভাবে পাকা করা ছিল। কক্ষগুলির সামনের দেয়াল ছাড়া বাকি তিন দেয়ালে কুলঙ্গি (niche) ছিল।
দিনাজপুর জেলা পরিষদের আর্থিক সহায়তায়, তদানীন্তন পাকিস্তান সরকারের প্রত্নতত্ত্ব দফতরের সহযোগিতায় ও দিনাজপুরের জেলা প্রশাসনের দায়িত্বে নিযুক্ত গ্রন্থাকারের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ১৯৬৮ সালে প্রথমে এই আধা-সরকারি উৎখনন কাজ করা হয়। পরে স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কর্তৃক এখানে সরকারিভাবে উৎখনন করা হয়।
বিহারের ভিতরের আঙ্গিনার আয়তন ছিল ৪২.২১ মিটার × ৪১.০৬ মিটার (১৩৯′ × ১৩৫.৫′)। সমগ্র আঙ্গিনা চুনসুরকি দ্বারা শক্তভাবে পাকা করা ছিল। এই খোলা আঙ্গিনায় কোনো কেন্দ্রীয় মন্দির (central shrine) বা অন্য কোনো ইমারত ছিল না।
এই আঙ্গিনার দক্ষিণ-পূর্ব কোণে চাকের তৈরি একটি কুয়া ছিল। অনেক গভীরে খননের ফলেও কুয়ার ভিতরে মৃৎপাত্রের ভগ্নাংশ ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যায় নি। তাতে মনে হয় যে, এটি ছিল একটি পরিত্যক্ত কূপ এবং বিহার নির্মাণের প্রথমদিকেই এটি নির্মিত হয়েছিল।
কেন্দ্রীয় উপাসনালয়ের পরিবর্তে পশ্চিম, দক্ষিণ ও পূর্ব বাহুর কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত একটি করে কক্ষে বেদীর অস্তিত্ব দেখে ধারণা করা যায় যে, এগুলি উপাসনালয় হিসাবে ব্যবহৃত হত। তবে পূর্ব ও পশ্চিম বাহুর কক্ষ দুটি ছিল অপেক্ষাকৃত ছোট। দক্ষিণ বাহুর কেন্দ্রস্থলে বেশ বড় কক্ষটি (ভূমি পরিকল্পনা দ্রষ্টব্য) সেটিই বোধ হয় কেন্দ্রীয় উপাসনালয় হিসাবে ব্যবহৃত হত।
অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র এই বিহারে দুটি নির্মাণ যুগের সন্ধান পাওয়া গেছে। অর্থাৎ প্রথম নির্মাণের পরে বিহারটিকে আরও একবার নতুন করে নির্মাণ করা হয়েছিল। তখন দক্ষিণ ব্লকের উপাসনালয়টি এমনভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল যে, সেটির স্বরূপ উদ্ধার করা যায় নি। এর সামনে উত্তর-দক্ষিণে লম্বা ও ১৪.৮৪ মিটার × ৮.১৮ মিটার (৪৯' × ২৭′) আয়তনের একটি মঞ্চ নির্মাণ করা হয়েছিল এবং ১২টি স্তম্ভের উপর সেই মঞ্চের ছাদ নির্মাণ করা হয়েছিল।
উৎখননের পরে ধ্বংসপ্রাপ্ত বিহারের ছাদের সামান্য অংশ ছাড়া ছাদের আর কিছুই পাওয়া যায় নি। এর জমাট সুরকির তৈরি ছাদের বিভিন্ন অংশ বিহারের ধ্বংসাবশেষের মধ্যেও পাওয়া গেছে। ধ্বংসাবশেষ দেখে মনে হয় না যে, বিহারটি একাধিক তলাবিশিষ্ট ছিল। স্বাভাবিক কারণে বিহারটি পরিত্যক্ত হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। এ কারণে দুটি ছোট ব্রোঞ্জ মূর্তি ছাড়া এখানে আর কোনো মূল্যবান প্রত্নবস্তু পাওয়া যায় নি। লোকেশ্বর পদ্মপাণি ও মঞ্জুশ্রীর বলে শনাক্তকৃত মূর্তি দুটি দিনাজপুর মিউজিয়ামে রক্ষিত থাকাকালে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় হানাদার পাকবাহিনী কর্তৃক লুণ্ঠিত হয়েছিল।
বিশ্ব পরিব্রাজক Onu Tareq ভাইয়ের ওয়াল থেকে।