28/10/2025
🏰 অজানা ইতিহাস: টাকশাল নগরী মাহিসন্তোষ — ধামইরহাট, নওগাঁ
উত্তরবঙ্গের ইতিহাসের এক বিস্মৃত অধ্যায় লুকিয়ে আছে নওগাঁ জেলার ধামইরহাট উপজেলার অন্তর্গত মাহিসন্তোষ নগরীতে।
এই নগরী ছিল এক সময়কার বিকশিত ও সুরক্ষিত দুর্গনগরী, যা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৪৫৯ খ্রিস্টাব্দের অনেক আগেই।
🏺 টাকশাল স্থাপন ও নগরীর নামকরন
১৫ শতকের মাঝামাঝি সময়েই মাহিসন্তোষে স্থাপিত হয় একটি রাজকীয় টাকশাল (মুদ্রা নির্মাণ কেন্দ্র)।
এই সময়েই নগরীর নামকরণ করা হয় ‘বারবাকাবাদ’, সুলতান রোকনউদ্দিন বারবাক শাহ (১৪৫৯–১৪৭৪ খ্রি.)-এর নামানুসারে।
এই টাকশাল থেকেই জারি করা হয় উৎকীর্ণ সাতটি ঐতিহাসিক মুদ্রা, যার মধ্যে ছয়টি রুপার ও একটি তাম্রমুদ্রা। এর মধ্যে চারটি রুপোর মুদ্রা বারবাক শাহের আমলে জারিকৃত বলে জানা যায়।
📜 লিপি ও প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ
দিনাজপুরের চেহেলগাজীর মাজার সংলগ্ন এক প্রাচীন ইটনির্মিত মসজিদের উত্তর দেয়ালে পাওয়া দিনাজপুর লিপিতে এই তথ্য পাওয়া যায়।
তৎকালীন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ভি. ওয়েস্ট মেকোড লিপিটি উদ্ধার করেন।
ড. রেজাউল করিমের গবেষণা অনুযায়ী —
তিনটি রুপোর মুদ্রা জারি হয় ৮৬৪ হিজরি (১৪৫৯ খ্রিস্টাব্দে),
একটি মুদ্রা সুলতান শামসুদ্দিন মুজাফফর শাহের (১৪৯০–১৪৯৩) আমলে ৮৯৬ হিজরিতে,
এবং একটি রুপা ও একটি তাম্রমুদ্রা সুলতান নাসির উদ্দিন নসরৎ শাহের (১৫১৯–১৫৩২) আমলে ৯২৮ হিজরিতে (১৫২২ খ্রিস্টাব্দে)।
(সূত্র: ড. রেজাউল করিম, পৃষ্ঠা ১০৩)
🏯 নগরীর গুরুত্ব ও পতনের কারণ
এই টাকশাল স্থাপন প্রমাণ করে যে মাহিসন্তোষ কেবল একটি বসতি নয়, বরং এক সুরক্ষিত দুর্গনগরী ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র ছিল।
১৫২২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এখানে টাকশাল চালু ছিল, অর্থাৎ ১৬ শতকের শেষ ভাগ পর্যন্ত নগরীর গুরুত্ব অপরিবর্তিত ছিল।
পরবর্তীকালে কোনো ভূমিকম্প বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে নগরীর গুরুত্ব হ্রাস পেতে শুরু করে, এবং টাকশালটি অচল হয়ে যায়। তবুও বারবাকাবাদ শহর হিসেবে অস্তিত্ব ধরে রাখে আরও বহু বছর।
📚 মুঘল যুগে বারবাকাবাদের মর্যাদা
আবুল ফজলের ‘আইন-ই-আকবরি’ ও অন্যান্য মুঘল দলিলপত্রে বারবাকাবাদ-এর উল্লেখ পাওয়া যায়।
সম্রাট আকবর মাহিসন্তোষকেন্দ্রিক এই অঞ্চলকে “সুবেহ বাংলা”-এর অন্যতম সরকার হিসেবে ঘোষণা করেন।
এই সরকারের অন্তর্ভুক্ত ছিল দিনাজপুর, রংপুর, বগুড়া, রাজশাহী ও পাবনা জেলা — মোট ৩৮টি মহাল বা পরগনা।
টোডরমলের রাজস্ব তালিকা অনুযায়ী বারবাকাবাদের রাজস্ব নির্ধারিত হয়েছিল ১৭,৪৫১৫৩২ দাম বা ৪৩৬,২৮৮ রুপি।
এ তথ্যগুলো থেকেই বোঝা যায়, বারবাকাবাদ তথা মাহিসন্তোষ ছিল তৎকালীন বাংলার এক অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক ও সামরিক কেন্দ্র।
🏚️ প্রত্নসম্পদের অবহেলা
দুঃখজনকভাবে আশির দশক থেকে এ অঞ্চলে অবৈধ বসতি ও খনন কাজ শুরু হয়।
ফলে পাওয়া যায় বহু মূল্যবান তাম্রমূর্তি, শিলালিপি, মুদ্রা ও প্রত্নবস্তু, যা পরবর্তীতে যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে বেহাত হয়ে যায়।
আজও ধামইরহাটের এই টাকশাল নগরী অপ্রকাশিত ইতিহাসের ভাণ্ডার হয়ে পড়ে আছে।
যদি যথাযথভাবে খনন ও গবেষণা শুরু হয়, তবে এখানে প্রকাশ পেতে পারে পাল, খলজি ও সুলতানি আমলের এক অমূল্য নগর সভ্যতার ইতিহাস।
✍️ উপসংহার
মাহিসন্তোষ কেবল একটি প্রাচীন নগরী নয়—
এটি একসময়কার বাংলার মুদ্রা উৎপাদন কেন্দ্র, দুর্গনগর ও প্রশাসনিক রাজধানী।
আজ প্রয়োজন এর সঠিক সংরক্ষণ ও প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান,
যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানতে পারে নওগাঁর মাটিতে লুকিয়ে থাকা এই টাকশাল নগরীর গৌরবময় ইতিহাস।
📍 অবস্থান: মাহিসন্তোষ, ধামইরহাট, নওগাঁ
🏺 গুরুত্ব: সুলতানি আমলের টাকশাল নগরী, পরবর্তীতে বারবাকাবাদ সরকার
📖 তথ্যসূত্র: ড. রেজাউল করিম, প্রত্নতাত্ত্বিক নথি ও দিনাজপুর লিপি
সৌজন্য: ডেইলি আমাদের মাতৃভূমি
#প্রাচীন_নওগাঁ #টাকশাল_নগরী #মাহিসন্তোষ #বারবাকাবাদ #ধামইরহাট #বাংলার_ঐতিহ্য #প্রত্ননওগাঁ #অজানা_ইতিহাস