07/04/2016
ডায়রীটি পড়ে তৌকির আজ দ্বিতীয়বারের মত কাঁদতেছে।
প্রথমবার কেঁদেছিল তৌকিরের বড়বোনের কিডনী
অপারেশনের দিন। দুইটি কিডনীই যখন ডেমেজ হয়ে
গিয়েছিল চারিদিকে যখন কান্নার রোল পড়ে গেল, তৌকির
তখন টাকা নিয়ে কিডনী খোজেছিল। যখন কোথাও
পাচ্ছিলনা, তখন একটি মেয়ে কিডনী দিতে রাজি হল।
মেয়েটিকে তৌকির চিনে তবে কোনদিন কথা হয়নি। শেষ
পর্যন্ত যখন সফল অপারেশনে তৌকিরের বোন সুস্থ্য
হয়েছিল তখন ঐ মেয়েটিকে আর বাঁচানো যায়নি। সেদিন
সত্যিই তৌকির অনেক কেঁদেছিল, নিজের কাছে মনে
হয়েছিল সোমা নামের সেই মেয়েটির জন্য তৌকিরই
দায়ী ছিল।
তৌকির বড় বোন আর ছোট বোনকে সাথে নিয়ে আজ
আরেকবার এল সোমাদের বাড়ি। এর আগেও বহুবার
এসেছিল। তৌকিরের বড় বোন সোমার মাকে মা বলেই
ডাকে। সোমার একটি ভাই আছে, নবম শ্রেনীতে
পড়ে। তৌকির আর তার বড় বোন সোমার ভাইকেও নিজের
ভাইয়ের মতই আদর করে। তৌকিরের চোখে যেন এখনও
নিষ্পাপ সেই সোমার চেহারাটি ভেসে ওঠে। কোন কিছুর
বিনিময়ে নয়, কোন আত্মীয়ের জন্য নয়, বিনা স্বার্থে
মেয়েটি তার জীবন দিয়ে তৌকিরের বড় বোনকে
বাঁচিয়ে দিয়ে গেল।
তৌকির পায়চারী করতে করতে সোমার রুমে এসে তার
রেখে যাওয়া জিনিসগুলো দেখতেছে। একটা ছোট্ট
পুতুলও ছিল সোমার। এখন আর কেউ পুতুলটিকে আদর
করেনা। তৌকির পুতুলটিকে কোলে নিয়ে সোমার পড়ার
টেবিলে বসল। কিছু ধূলো এসে জমা পড়েছে খাতা
বইগুলোতে। একটু পরিষ্কার করা দরকার। সেই ভেবে
পুরোনো কাপড় নিয়ে পরিষ্কার করতে লাগল তৌকির। এরই
মধ্যে কালো মলাটের একটি ডায়রী খোজে পেল
তৌকির। কৌতূহলবশত ডায়রীর প্রথম পৃষ্টা ওল্টাতে গিয়ে তৌকির
যেন আকাশ থেকে পড়ল। যেখানে লেখা ছিল,,,,,,
" তৌকির আমার সুখের স্বপ্ন
দুই চোখের পাতায়,
তৌকির আমার ভালবাসা
জীবনের প্রতিটি কবিতায়।"
তারাহুড়া করে তৌকির আরো পাতা উল্টাতে লাগল। প্রতিটি পাতায়
এমন চার লাইন আট লাইন করে তৌকিরকে নিয়ে ছন্দ লেখা।
সোমা তাকে নিয়ে কেন লিখবে ভেবে পাচ্ছেনা তৌকির।
পৃষ্টা ওল্টাতে গিয়ে শেষের দিকে দেখল পড় একটি
লেখা। তৌকির চোখ বড় বড় করে মনোযোগ দিয়ে
পড়তেছে.......
★ হয়তো ডায়রীতে আর লিখার সুযোগ পাবনা। এই
ডায়রীতে আজো পর্যন্ত নিজের কথা কিছুই লিখিনি। সবই
আমার তৌকিরকে নিয়ে লেখা। আগামী ২ রা এপ্রিল আমার
অপারেশন। শুধু আমার অপারেশন নয় আমার ভালবাসার মানুষ
তৌকিরের বড় বোনেরও অপারেশন। তৌকিরের বড়
বোনের দুইটি কিডনীই নষ্ট হয়ে গেছে, তাকে
বাঁচাতে একটি কিডনী খুব প্রয়োজন। ঐ দিন ছোট ভাই
শাকিল এসে বলছে তৌকির ভাই অনেক কান্না করতেছে,
ওনার বোনকে মনে হয় বাঁচাতে পারবেনা। হাসপাতালে
দেখতে গিয়েছিলাম, তৌকিরের বড় বোন আমার হাতটি ধরে
কেঁদে কেঁদে বলেছিল বলেছিল, তোরা আমার জন্য
দোয়া করিস, আমি আর বাঁচবনা, আমাকে বাঁচাতে পারবেনা।
কোথাও কিডনী নেই।
আমি ওনার কান্না দেখে কি মনে করে যেন কথা দিয়ে
ফেলেছি আপু আমি তোমাকে একটি কিডনী দিব। ওনি কথাটা
শোনা মাত্র শোয়া থেকে বসতে চাইল, চোখে জল
আর মুখে রাজ্য জয়ের হাসি। সত্যি বোন তুই আমাকে
কিডনী দিবি? আমি সত্যিই বাঁচব? আমি বলেছি হ্যাঁ আপু তুমি
অবশ্যই সুস্থ হবে।বিদায় নিয়ে আসার পথে তৌকিরের সাথে
দেখা হয়েছিল, আমার তাকিয়ে ছিল অনেকক্ষন, মনে হয়
আমাকে চিনতে পারেনি। মাঝে মাঝেই দেখা হত, তবে
মনে হয় মনে করতে পারেনা আমাকে।
কিন্তু আমি?
তৌকির মনেই করতে পারেনা, আমি ভুলতেই পারিনা। ষষ্ঠ
শ্রেনী থেকে একই স্কুলে পড়তাম। স্কুলের
বেশীরভাগ সময়টা কাটত তাকে দেখেই। এজন্য ক্লাসে
ঠিকমত মনোযোগ দিতে পারিনি। সবাই যখন এ+ এর চিন্তা করত,
আর আমি দোয়া করতাম টেনে টুনে যেন উপরের
ক্লাসে ওঠতে পারি, তাহলেই তৌকিরকে আবার দেখতে
পাব। আমি তৌকিরকে কতটা ভালবাসি তা কেবল আমিই জানি আর
দ্বিতীয় কেউ জানেনা। কোনদিন সাহস করে কথাও
বলতে পারিনি, এতটাই লাজুক আমি। কোন দিন তৌকিরকে
জানাতেও পারিনি আমি তাকে কতটা ভালবাসি।
কিভাবে জানাব, আয়নায় যখন নিজের চেহারটা দেখি তখন আর
সাহস হয়না ভালবাসার দাবী নিয়ে তৌকিরের সামনে যেতে।
দুজনেই কলেজে ভর্তি হলাম। তখনই হঠাৎ একদিন জানতে
পারলাম তৌকির আমার বান্ধবী সুরভীকে ভালবাসে। আমার
সামনে দিয়েই হাসতে হাসতে হেটে যাচ্ছে দুইজন। মাথাটা
খুব ঘুরতেছিল। চোখের মনে হয় অন্ধকার
দেখতেছিলাম। কোথায় তাকিয়ে হাটছিলাম মনে নেই,
তবে যখন জ্ঞান ফিরেছিল আমি হাসপাতালে। ট্রাক আমাকে
ধাক্কা মেরেছিল। অল্পের জন্য বেঁচে গিয়েছিলাম।
তবে আমার মেরুদন্ড ভেঙ্গে গিয়েছে। এখনো
পর্যন্ত আমার মেরুদন্ড ঠিক হয়নি।
মা খুব কান্না করছিল আমাকে জড়িয়ে ধরে, আমার মা জানত
আমি তৌকিরকে ভালবাসি। কিন্তু তৌকির আমাকে নয় ভালবাসে
আমার বান্ধবী সুরভীকে। মাকে কিছুতেই যখন রাজী
করতে পারছিলামনা তখন মায়ের পায়ে ধরে কান্না জুড়ে
দিয়েছি। মাগো তুমিতো জানো আমি তৌকিরকে কত ভালবাসি।
তৌকিরের বড় বোন কিডনীর অভাবে মরে যাবে, ও খুব
কান্না করতেছে মা। মা তুমিতো জানো আমার মেরুদন্ড
ভাঙ্গা, কোনদিন ভারী কোন কাজ করতে পারবনা। সেজন্য
আমাকে বিয়েও দেয়া যাবেনা, কেউতো আমাকে বিয়ে
করে বসিয়ে খাওয়াবেনা, তোমরা খাওয়াবে। আমি একটি
কিডনী নিয়ে বাঁচতে পারব, কিন্তু তৌকিরের বোন কিডনী
ছাড়া বাঁচবেনা।
মা আমার কান্না দেখে রাজী হয়ে বুকে জড়িয়ে
নিয়েছিল।
২ রা এপ্রিল কবে যে আসবে, কবে আমি আমার তৌকিরের
মুখে হাসি দেখব। ওকে হাসতে দেখলে আমার মন
জুড়িয়ে যায়। এটাকেই বুঝি ভালবাসা বলে, প্রিয়জনের
হাসিতে হাসতে ভাললাগে আর দুঃখে কেঁদে ওঠে হৃদয়।
আমার চেহারাটা আরেকটু সুন্দর হলেই তৌকিরকে বলতাম আমি
কত্ত ভালবাসি। এখন সেটাও সম্ভবনা, সুরভীকে আর
তৌকিরকে খুব ভাল মানিয়েছে, ওদের ঐ হাসিখুশিটা সারাটি
জীবন থাকুক। আমি শুধু আমার তৌকিরকে ভালবাসব আমার
ডায়রীর পাতায় আর রুমের দরজা জানালা বন্ধ করে হাত দুটি দুই
দিকে মেলে ধরে চিৎকার করে বলব তৌকির আমি
তোমাকে এত্তগুলা ভালবাসি। ★★★
তৌকির ডায়রীটা বুকে নিয়েই কাঁদতেছে, আর বলতেছে
হায়রে পাগলী, একটা দিন হায় হ্যালো ও বললিনা অথচ তোর
বুকের ভিতর আমার জন্য এত ভালবাসা জমিয়ে রেখেছিলি?
তোকে কে বলল আমি সুরভীকে ভালবাসি? ওতো শুধু
আমার বন্ধু। আর বন্ধুর সাথে হাসি ঠাট্টা করা যায়না? একটিবার তুই
আমাকে বলতি ভালবাসিস, একটিবার।
এখন আমি যখন জানলাম তুই আর পৃথিবীতেই নেই।
জীবনটাও দিয়ে গেলি আমারি জন্য, আমি নিজেকে ক্ষমা
করব কিভাবে বলতে পারিস? আমাকে ক্ষমা করিস সোমা,
আমি কেন তোর ঐ তাকিয়ে থাকার ভাষা বুঝতে পারিনি।
যেখানেই থাকিস, ভাল থাকিস.......
লেখনীর শেষ প্রান্তে,,,,,,
,,,,, ওমর ফারুক শ্রাবন