অপরাজেয় বাংলা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

  • Home
  • Bangladesh
  • Dhaka
  • অপরাজেয় বাংলা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

অপরাজেয় বাংলা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অপরাজেয় বাংলা - মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ?

অপরাজেয় বাংলা---

'উদয়ের পথে শুনি কার বাণী
ভয় নাই ওরে ভয় নাই
নি:শেষে প্রাণ যে করিবে দান
ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই'

উদ্বোধনী অনুষ্ঠান : ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭৯

উদ্বোধক : মুক্তিযুদ্ধে আহত একজন মুক্তিযোদ্ধা


ভূমিকা---
একটি জাতির রক্তাক্ত অভ্যূদয়ের কাহিনী ধরে রাখে তার শিল্প-সাহিত্য। শিল্পী তার ভাষায়, ছন্দে, সুরে, রেখায় জাতির সবচেয়ে উজ্জ্বল অভিজ্ঞতাকে ধরে রাখেন, সেই সৃষ্টি হাজার বছর ধরে কথা বলে- ভবিষ্যত ব

ংশধরদের কাছে বাঙময় করে তোলে জাতির প্রাণের আকুতিকে, বলে তার ঐশ্বর্যমন্ডিত ঐতিহ্যের কথা।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধের শিল্পও সেই রকম। ঢকা বিশ্ববিদ্যালয় কলাভবন প্রাঙ্গণে ত্রিকোণ বেদীর উপর দাঁড়ানো তিন-মুক্তিযোদ্ধা আমাদের ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়কে বিবৃত করছে, আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে রক্তাক্ত সময়, বাঙালী জাতির গৌরবময় ঐতিহ্যের বাণী যেন কথা বলে উঠছে। আর অন্যদিকে তার সময় যেন ১৯৭১-এর সীমা ছাড়িয়ে আমাদের সমস্ত সংগ্রামের ভেতরে বিস্তৃত হয়েছে। আমাদের সমস্ত আন্দোলনের প্রতিভূ এই অনন্য-উজ্জ্বল ভাস্কর্য- আমাদের জাতির পরিচয়কেই ব্যক্ত করছে ‘অপরাজেয় বাংলা’ শিরোনামে।

‘অপরাজেয় বাংলা’ সকল শোষণ-শাসনের বিরুদ্ধে শাণিত সাহসে দাঁড়িয়েছে বারবার- পরাজয়ের কাছে মাথা নত করে নি সে, পরাজয়ই মাথা নত করেছে তার কাছে। এই ভাস্কর্যও তেমনি আঘাতের সামনে উদাধত হয়ে দাঁড়িয়ে থেকেছে- ঋজু এবং সাহসী ভঙ্গিতে। তাঁর দর্পিত মাথা ধুলি স্পর্শ করেনি, যে রকম বাঙালী করে নি তার হাজার বছরের ইতিহাসে। রক্তপাত ঘটেছে, প্রতিক্রিয়াশীলদের রুখে দাঁড়িয়েছে ঐক্যবদ্ধ ছাত্রসমাজ।
স্বাধীনতার চেতনা যখন ভূলুন্ঠিত তখন ঊনাশির বাংলাদেশে ‘অপরাজেয় বাংলা’ বারবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে এই রকম প্রতিবাদী, সাহসে উজ্জ্বল অমিততেজ যোদ্ধাদের কথা, আমাদের চেতনায় ঘা দিচ্ছে- ‘জাগবার দিন আজ দুদিন চুপি চুপি আসছে’।
এই ভাস্কর্য হাজার বছর ধরে কথা বলবে। আমরা এবং আমাদের উত্তরসূরীরা প্রেরণার উৎসমূলে স্থাপন করব এই ভাস্কর্যকে। নীলক্ষেতের সবুজ চত্বর পেরিয়ে যেতে যে কোনো বাঙালী পথিক একবার, অন্তত একবার বাংলাদেশের ইতিহাসকে স্মরণ করবে, বাঙালীর ইতিহাসকে স্মরণ করবে-‘স্পর্ধায় নেয় মাথা তুলবার ঝুঁকি’।

অপরাজেয় বাংলা - স্বাধীনতার স্মারক ভাস্কর্য
১৯৭৩ থেকে ১৯৭৯- সাত বছরের অক্লান্ত পরিশ্রম, বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে শেষ হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্য নির্মাণ। একদিন যা ছিল শুধুই কল্পনা, বুঝি বা স্বপ্ন, পাথর কেটে তা মূর্ত করে তুলেছেন শিল্পী আব্দুল্লাহ খালিদ। এই ভাস্কর্যকে কেন্দ্র করে নানা বিতর্কের ঝড় উঠেছিল, ধর্মান্ধরা এসেছিল নিশ্চিহ্ন করে ফেলতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা রক্ত ঢেলে প্রতিহত করেছে সে হামলা, রুখে দাঁড়িয়েছে গোঁড়ামির বিরুদ্ধে।
একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রতিরোধ, মুক্তি ও সাফল্যকে ধারণ করছে এই পাথুরে শিল্প। অল্প দূরে বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা, যার ধূলি-মাটিতে গেঁথে আছে বাঙালী জাতির অজেয় ইতিহাস। একাত্তরে এখানেই প্রথম উড়েছিল স্বাধীনতার পতাকা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জাতীয় ইতিহাসে পালন করেছে শক্তিশালী ও কার্যকর ভূমিকা, মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য তার অহঙ্কারে সংযুক্ত করে দিল নতুন গৌরব।

কলাভবনের সামনে আইল্যান্ডের উপর তৈরি হয়েছে ত্রিকোণ বেদী- মাটি থেকে ১৮ ফুট উঁচু, বেদীর উপর ১২ ফুট উঁচু তিনটি ফিগার। দৃপ্ত ভঙ্গিতে দাঁড়ানো সশস্ত্র দুই যোদ্ধা-পুরুষ, ফার্স্ট এইড বক্র নিয়ে শুশ্রুষার উৎস এক নারী। এদের শরীর পাথরের নয়, একটি জাতির অভ্যুদয়, বলিষ্ঠ আত্মপ্রত্যয় সঞ্চালিত হচ্ছে এদের হৃৎপিন্ডে, শিরা-উপশিরায়।
দীর্ঘ প্রায় সাত বছর দেশের সার্বিক ক্ষেত্রে ঘটেছে পালাবদল, এই ভাস্কর্যের ওপরও তার প্রত্যক্ষ-অপ্রত্যক্ষ প্রতিক্রিয়া পড়েছে। অর্থনৈতিক কারণ ছাড়াও নানাবিধ কারণে এর নির্মাণ কাজ ব্যাহত হয়েছে একাধিক বার। স্বাধীনতাযুদ্ধের উত্তাল স্মৃতিকে শিল্পরূপে মন্ডিত করে তুলতে অপরিসীম শ্রম করেছেন আব্দুল্লাহ খালিদ, সহকারী বদরুল আলম বেণু। এই কাজের সঙ্গে সব পর্যায়ে সংযুক্ত ছিলেন ম. হামিদ। দেশপ্রেমের উজ্জীবনে তাড়িত এই শিল্পীরা দিনের পর দিন, বছরের পর বছর অনলস শ্রম, মেধা ও দু:সাহস দিয়ে করেছেন এর প্রাণ সঞ্চার। এই পথপরিক্রমা প্রচন্ডভাবে বিঘ্নিত করেছে তাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবন। অনিশ্চয়তা তাদের আক্রান্ত করেছে বারবার, চক্রান্তের কালোহাত বহুবার গ্রাস করতে এগিয়ে এসেছে। কিন্তু পিছিয়ে যান নি তারা, দুর্জয় মনোবলে পদদলিত করেছেন সব ধরণের প্রতিবন্ধকতা। একটি জাতির আত্মচেতনার উন্মেষ, তার বিকাশ ও উপলব্ধি সার্বক্ষণিক প্রেরণা ছিল বলেই এটা সম্পূর্ণ করা সম্ভব হয়েছে।
১৯৭৭ সালে প্রতিক্রিয়াশীলরা জিপিও’র সামনে থেকে একটি ভাস্কর্য অপসারিত করে। তাদের দ্বিতীয় শিকার হয়েছিল এ ভাস্কর্য। ১৯৭৭ সালের ২৮ আগস্ট তারাই ভাস্কর্যটি নির্মূল করার উদ্যোগ নেয়। স্বাভাবিক ও সঙ্গত কারণেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্ররা তা প্রতিহত করে। অনিবার্য সেই সংঘর্ষে ৩০ জন ছাত্র আহত হয়, চারজন গ্রেফতার হয়। এ ঘটনার প্রতিবাদে মুখর হয়ে ওঠে ছাত্রসমাজ, দাবী ওঠে অসম্পূর্ণ ভাস্কর্যটির নির্মাণকাজ সম্পূর্ণ করার।
স্বাধীনতা এসেছে লাখো শহীদের রক্তের পথ বেয়ে, সেই স্বাধীনতার স্মৃতিকে মর্যাদা দিতে প্রয়োজনে আরো রক্তপাত হবে- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসমাজ এ ব্যাপারে কোনোদিন কুন্ঠিত ছিল না, থাকবেও না।

নেপথ্যের কথকতা---
১৯৭৩ সালে তদানীন্তন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) মুক্তিযুদ্ধ স্মরণে একটি ভাস্কর্য প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়। সে সময়ের ডাকসুর সাংস্কৃতিক সম্পাদক ম. হামিদ শিল্পী আব্দুল্লাহ খালিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। প্রয়োজনীয় আলাপ আলোচনার পর ভাস্কর তিন ফুটের একটি মডেল তৈরির কাজ শুরু করেন্ প্রতিদিন ১২/১৩ ঘন্টা খেটে তিনমাস পর পিসটি তৈরি হয়। তিনটি ফিগারের জন্য তিনজনকে মডেল হিসেবে নেওয়া হয়। এরা হচ্ছেন- বদরুল আলম বেণু, সৈয়দ হামিদ মকসুদ ফজলে এবং হাসিনা আহমেদ।

ভাস্কর্যটির নির্মাণ কাজের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও তদারকের জন্য সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কে.এম. সাদউদ্দিন, পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের ড. বেলায়েত হোসেন এবং ম. হামিদকে (ডাকসু’র প্রতিনিধি) নিয়ে ৩ তদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়।


একটি বেদীর উপর ভাস্কর্যটি নির্মাণের পরিকল্পনা দিয়েছিলেন স্থপতি কবি রবিউল হুসাইন। তিন ফুটের মডেল চারগুণ বড় করে তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। মেসার্স শহীদুল্লাহ এন্ড এসোসিয়েটস প্রসারিত করলো সহযোগিতার হাত। মডেলটির আনুপাতিক সম্প্রসারণের পদ্ধতি উদ্ভাবন করলেন ইঞ্জিনিয়ার শহীদুল্লাহ। ভাস্কর্যটির জন্ম থেকে শুরু করে সম্পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত জনাব শহীদুল্লাহর ফার্ম কোনোরূপ পারিশ্রমিক ছাড়াই কারিগরি সহযোগিতা দিয়েছে। তাঁর সক্রিয় ও প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধান ভাস্কর্যটি জন্মাবধি পেয়েছে।

লোহা এবং পাথরের সমবায়ে এই মনুমেন্টাল ভাস্কর্যটির ভিত এত শক্ত যে হাজার বছরেরও বেশি স্থায়িত্ব হবে এর, যদি কোনো ভয়ঙ্কর প্রাকৃতিক দুর্যোগ না ঘটে। চৌদ্দশ মাইল বেগের ঝড়তুফানেও এর কিছু হবে না। ফিগার হচ্ছে লাইফ সাইজের দ্বিগুণ (১২ ফুট), প্রস্থ ৮ ফুট, ব্যাস ৬ ফুট। মাটি থেকে উচ্চতা ১৮ ফুট। ফিগারে ব্যবহৃত লোহার রড মাটি থেকে শুরু, ভিতরে ফ্রেম ছাড়া পুরোটাতেই ব্যবহৃত হয়েছে পাথর। ঢালাই হয়েছে ৩৬ বার, প্রতিবার চার ইঞ্চি করে।
১৯৭৩ সালের মাঝামাঝি কাজ শুরু হয়। ১৯৭৯ সাল অব্দি একাধিকবার নির্মাণকাজ বিঘ্নিত হয়েছে। কারণ অর্থনৈতিক, রাষ্ট্রিকও অনেকটা। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের মৃত্যুর পর কাজ বন্ধ হয়ে যায়- ঢালাই তখন শেষ পর্যায়ে। ভাস্কর্য কমিটি, শিল্পী চেষ্টা করলেন আবার কাজ শুরু করার, ফল হয় নি। এ সময়ের ভাস্কর আব্দুল্লাহ খালিদ মেটাল স্কাল্পচার বিষয়ে পড়াশোনার জন্য লন্ডন যান। লন্ডনে বেশিদিন থাকা হয় নি, অসমাপ্ত শিল্পকর্মের হাতছানিতে দেশে ফিরে আসেন তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিনেট ভাস্কর্যটির নির্মাণ কাজ শেষ করার উদ্যোগ নেন- নানাবিধ্ কারণে প্রয়োজনীয় অনুমতি পাওয়া বিলম্বিত হয়। ১৯৭৮ সালের সেপ্টম্বর কর্তৃপক্ষ কাজটি শেষ করার অনুমোদন দেন। নতুন করে ১১ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয় অধ্যাপক এ কিউ এম বি করিমকে সভাপতি ও জনাব কে এম সাদউদ্দিনকে সম্পাদক করে। কমিটির অন্যান্যরা হলেন : কোষাধ্যক্ষ জনাব এ এ এম বাকের, সদস্য- ড. এ বি এম মাহমুদ, সৈয়দ আব্দুল্লাহ খালিদ, ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, ড. আখতারুজ্জামান, জনাব শফিউল্লাহ ভূঁইয়া, জনাব শামসুল আলম, জনাব ম. হামিদ। ১৯৭৯ সালে ডাকসু নির্বাচনের পর ডাকসু’র সহ-সভাপতি জনাব মাহমুদুর রহমান মান্না এবং ডাকসু’র সাধারণ সম্পাদক জনাব আখতারউজ্জামান ভাস্কর্য কমিটির সদস্য হন।
১৯৭৯ সালের ১৯ জানুয়ারী পুর্ণোদ্যমে কাজ শুরু হয়। রোদে পুড়ে, জলে ভিজে গড়ে প্রতিদিন ৭/৮ ঘন্টা খেটে কাজটি সম্পূর্ণ হয়।
ভাস্কর্যের মূল মডেলটি রাখা হয়েছিল ইন্টারন্যাশনাল হোস্টেলের একটি কক্ষে। যথোপযুক্ত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে তা নষ্ট হয়ে যায়। সমঋতির উপর নির্ভর করে শিল্পী কাজটি শেষ করেন।

তিন ফিগার---
শুশ্রুষার কোমলতা শুধু নয়, ফার্স্ট এইড বক্সের বেল্ট ধরা তরুণীর মুখাবয়বের দৃপ্ত কাঠিন্য চমৎকার। মুক্তিযুদ্ধে নারীসমাজ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সম্পন্ন করেছে, যুগিয়েছে সাহ, আর্তের চিৎকারে শুশ্রুষা সেবায় হয়েছে ভাস্বর। সহযোদ্ধার সঙ্গে একাত্মতা ত্বরাণ্বিত করেছে স্বাধীনতা। মডেল- হাসিনা আহমেদ।
এর পরের ফিগার গ্রামীণ মুক্তিযোদ্ধার। হাতে তার উষ্ণ গ্রেনেড, ডান হাত দৃঢ় প্রত্যয়ে ধরে রেখেছে রাইফেলের বেল্ট। বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি এই মুক্তিযোদ্ধার চোখ-মুখ স্বাধিকার চেতনায় উদ্দীপ্ত, নিরাপোষ। মডেল- বদরুল আলম বেণু।
তার পরের ফিগারটি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রের। থ্রি নট থ্রি রাইফেল হাতে দাঁড়ানো, সাবলীল কিন্তু তেজী ভঙ্গি। ভায়োলেন্সের চিহ্ন তার অস্তিত্বে প্রকাশিত, শত্রু হননের প্রতিজ্ঞায় অটল। মডেল- সৈয়দ হামিদ মকসুদ ফজলে।

ভাস্কর---
সৈয়দ আব্দুল্লাহ খালিদ বি এফ এ পাস করেন বাংলাদেশ চারু ও কারুকলা কলেজ থেকে। ১৯৭৪ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার অব ফাইন আর্টস পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান লাভ করেন। ফাইন আর্টসের ছাত্র হলেও বরাবরই মনোযোগ ও আগ্রহ ছিল ভাস্কর্যের দিকে।
তিনি বলেন, আমাদের সংস্কৃতি সভ্যতার শাশ্বত উত্তরাধিকার তার এ শ্রমসাধ্য নির্মাণের মূল প্রেরণা। স্বাধীনতা ও তারুণ্যের অনমনীয় মনোভাব এ ভাস্কর্যের খাঁজে খাঁজে প্রস্ফুটিত। তিনি মনে করেন যে এ ভাস্কর্যের নির্মাণ, কল্পনা, শরীর কাঠামো সবই বাংলাদেশের জল-হাওয়ার সস্নেহ লালন, ফিগারগুলোর মডেলও এ দেশের মানুষ, রক্ত-মাংসের মানুষ। সুগঠিত দেহসৌষ্ঠব আমাদের হতে পারে না- এ হীনমন্যতা অনুমোদন করা যায় না। ভাস্কর্য নির্মাণে যেখান থেকে বাধা পাওয়ার কথা সেখান থেকে বাধা আসে নি। বিস্ময়ের সঙ্গে দেখেছি, যাদের উৎসাহ দেয়ার কথা তারাই বাধা দিয়েছেন। সেই প্রতিবন্ধকতা এসেছে কখনো প্রত্যক্ষ হুমকি হয়েও। দেশ, জাতি, বৃহত্তর ছাত্রসমাজের প্রতি আমার দায়িত্ব উপলব্ধি করে সব নীরবে সহ্য করেছি আমি। আমার মনে হয়েছে, কাজটি আমি সম্পূর্ণ না করলে হয়তো কোনোদিনই তা শেষ হবে না। বিভিন্ন স্তরের মানুষ আমাকে যে ভালবাসা দিয়েছেন, তা-ই আমার শক্তি। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি- কোনো শক্তি, কোনো দুর্যোগ আমাদের স্বাধীনতাকে নস্যাৎ করতে পারবে না।


বি.দ্র. এটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস থেকে মুদ্রিত স্বাধীনতার স্মারক ভাস্কর্য 'অপরাজেয় বাংলা'র উদ্বোধনী স্মরণিকার ইষৎ সংক্ষেপিত রূপ। স্মরণিকায় ব্যবহৃত আলোকচিত্রগুলো আশফাক মুনীরের তোলা। স্মরণিকাটি ডাকসু সংগ্রহশালায় সংরক্ষিত আছে।

শাবিপ্রবির শিক্ষক শুভজিতকে লিডিং ইউনিভার্সিটিতে অবাঞ্ছিত ঘোষণা-একাডেমিক রিভিউ কমিটির মিটিং বর্জন শিক্ষকদের।নিজস্ব প্রতিব...
12/04/2023

শাবিপ্রবির শিক্ষক শুভজিতকে লিডিং ইউনিভার্সিটিতে অবাঞ্ছিত ঘোষণা-
একাডেমিক রিভিউ কমিটির মিটিং বর্জন শিক্ষকদের।

নিজস্ব প্রতিবেদক। ১২ এপ্রিল, ২০২৩
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের শিক্ষক হলেও লিডিং ইউনিভার্সিটিতে যত্রতত্র ঘুরে বেড়ান তিনি। পেশায় শিক্ষক হলেও লিডিং ইউনিভার্সিটির অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অযাচিত হস্তক্ষেপসহ নানান অপরাধের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। ঠিকাদার কোম্পানি হোমল্যান্ডের একসময় বেতনভুক্ত ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে লিডিং ইউনিভার্সিটির শহিদমিনার নির্মাণে প্রায় কোটি টাকার আর্থিক দুর্নীতির সাথে তার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে দাবি একাধিক শিক্ষক-কর্মকর্তার। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শুভজিৎ চৌধুরী নানান বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে জন্ম দিচ্ছেন একের পর এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার।

অনুসন্ধানে জানা যায়, উপাচার্য আজিজুল মওলার বিশেষ ছাত্র হিসেবে লিডিংয়ে তার মুক্ত পদচারণা শুরু। সম্প্রতি উপাচার্য আজিজুল মওলার বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অভিযোগের প্রেক্ষিতে সরব শুভজিত চৌধুরী। ইউজিসি সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের ৬ মার্চ উপাচার্য আজিজুল মওলার বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম-দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা-স্বজনপ্রীতিতা, বিদেশে অর্থপাচার, প্রতারণার মাধ্যমে আয়কর ফাঁকি, অনুমোদনহীনভাবে বিদেশ ভ্রমণের অভিযোগ দায়ের করেছেন লিডিং ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টিবোর্ডের চেয়ারম্যান। এর প্রেক্ষিতে বিগত ১৩ মার্চ সাংবাদিকদের জেরার মুখোমুখি হতে হয় আজিজুল মওলাকে। বহিরাগত শুভজিত ঐদিন সকাল সাড়ে নয়টা থেকে বিকাল ৪ টা পর্যন্ত সারাদিন লিডিং ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসে বেআইনিভাবে অবস্থান করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি নেতিবাচকভাবে দেখছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেকেই।

শুধু তাই নয়, ১৩ মার্চ বাংলানিউজ২৪.কমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শুভজিত লিডিং ইউনিভার্সিটির অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নগ্ন হস্তক্ষেপ করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এছাড়াও ওইদিন লিডিং ইউনিভার্সিটি সম্পর্কে মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উস্কানিমূলক বক্তব্য প্রদান এবং বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে অসৌজন্যমূলক ও মানহানিকর বক্তব্য প্রচার করেন তিনি। ‘দীর্ঘদিন লিডিং ইউনিভার্সিটিতে নির্মাণ কাজ করার সময় তার চোখেও প্রতিষ্ঠানটির অব্যবস্থাপনা চোখে পড়েছে’ বলে পত্রিকায় বিবৃতি দেন শুভজিত। এতে শুভজিতের বিরুদ্ধে লিডিং ইউনিভার্সিটির শিক্ষক-কর্মকর্তা ও ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

শিক্ষক শুভজিত চৌধুরীর এমন আপত্তিকর কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে গত ১৪ মার্চ শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ফরিদ উদ্দিন আহমেদের কাছে লিখিতভাবে অভিযোগ করেন লিডিং ইউনিভার্সিটির রেজিস্ট্রার মোঃ মফিজুল ইসলাম। বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে পত্রপত্রিকায় মিথ্যা ও মানহানিকর বক্তব্য প্রদানের দায়ে অভিযুক্ত শুভজিতের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও বলা হয় চিঠিতে। এদিকে শুভজিতের বিরুদ্ধে ইস্যুকৃত চিঠি প্রত্যাহারের জন্য রেজিস্ট্রারকে অন্যায়ভাবে চাপ প্রয়োগ করেন ভিসি আজিজুল মওলা। চিঠি প্রত্যাহারের পাশাপাশি, লিখিতভাবে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে বলেন উপাচার্য। রেজিস্ট্রার চিঠি প্রত্যাহারে রাজি না হওয়ায় একপর্যায়ে রেজিস্ট্রারের অফিশিয়াল ইমেইল ব্যবহার করে নিজেই তাঁর স্বাক্ষরিত চিঠির মাধ্যমে শুভজিতের বিরুদ্ধে ইস্যুকৃত চিঠি প্রত্যাহার করার জন্য শাবিপ্রবি'র উপাচার্য ফরিদ উদ্দিন আহমেদের কাছে মেইল করেন আজিজুল মওলা। বিষয়টির নিয়ে রেজিস্ট্রার মোঃ মফিজুল ইসলামের সাথে কথা বললে তিনি এর সত্যতা নিশ্চিত করেন।

বিষয়টি এখানেই শেষ নয়। গত ১০-১১ এপ্রিল লিডিং ইউনিভার্সিটির আর্কিটেকচার ডিপার্টমেন্টে অনুষ্ঠিত 'সামার-২০২২ এর থিসিস জুরি'র বিচারক হিসেবে বিতর্কিত শিক্ষক শুভজিতকে আমন্ত্রণ জানান লিডিংয়ের আর্কিটেকচার বিভাগের বিভাগীয় প্রধান মোঃ শওকত জাহান চৌধুরী। শুধু তাই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিল থেকে নামপরিচয় গোপন রেখে পারিতোষিক হিসেবে মোটা অঙ্কের টাকাও তুলে দেওয়া হয় শুভজিতকে। বিষয়টি জানাজানি হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকদের মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে চাইলে একাধিক শিক্ষক-কর্মকর্তা জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার সুষ্ঠপরিবেশকে ব্যাহত করতেই বিতর্কিত শুভজিতকে বারবার লিডিং ইউনিভার্সিটিতে নিয়ে আসা হচ্ছে। এসময় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অনুপ্রবেশকারীদের ঠেকাতে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানান তারা। লিডিং ইউনিভার্সিটিতে বহিরাগত এবং অনুপ্রবেশ ঠেকাতে কি কি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রার মোঃ লুতফর রহমান বলেন, লিডিং ইউনিভার্সিটিতে বাড়তি নিরাপত্তা নিশ্চিত ও জোরদার করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন উদ্যোগ নিচ্ছে।

১০-১১ এপ্রিল তারিখে অনুষ্ঠিত জুরিতে শুভজিতকে বিচারক হিসেবে আমন্ত্রণ ও নিয়োগ দেওয়ার প্রতিবাদে ১২ এপ্রিল সকাল ১১:০০ টায় অনুষ্ঠিতব্য একাডেমিক রিভিউ মিটিং সম্মিলিতভাবে বর্জনের ঘোষণা দেন লিডিং ইউনিভার্সিটির বিভিন্ন অনুষদের ডীন, বিভাগীয় প্রধান এবং বিভিন্ন দপ্তর প্রধানগণ।

এদিকে, পূর্বপরিকল্পিত ও ইচ্ছাকৃতভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার বিষয়টি জানাজানি হলে শুভজিতকে লিডিং ইউনিভার্সিটিতে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীবৃন্দ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে লিডিং ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের ফাইনাল সেমিস্টারের একজন শিক্ষার্থী বলেন, ‘লিডিং ইউনিভার্সিটি আমাদের আবেগের জায়গা। বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম নষ্ট করে সংবাদ মাধ্যমে বিতর্কিত ও মানহানিমূলক বক্তব্য প্রদানের কারণে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শুভজিকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করছি। এ নিয়ে মানববন্ধনেরও প্রস্তুতি চলছে।’

এ বিষয়ে শুভজিতের সাথে একাধিকবার ফোনে কথা বলতে চাইলে তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। তবে শিক্ষক শুভজিৎ চৌধুরী দীর্ঘ ছুটিতে আছেন বলে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে।

বিষয়টি নিয়ে উপাচার্য কাজী আজিজুল মওলার সাথে কথা বলতে চাইলে তার মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া গেছে।

লিডিং ইউনিভার্সিটির উপাচার্য কাজী আজিজুল মাওলার যত অনিয়মঃ পিএইচডি থিসিসে চৌর্যবৃত্তি ও সনদ জালিয়াতির দায়ে বুয়েটে পেয়েছিল...
13/03/2023

লিডিং ইউনিভার্সিটির উপাচার্য কাজী আজিজুল মাওলার যত অনিয়মঃ পিএইচডি থিসিসে চৌর্যবৃত্তি ও সনদ জালিয়াতির দায়ে বুয়েটে পেয়েছিলেন শাস্তি।

১৩ মার্চ, ২০২৩
অনিয়মে পিছিয়ে নেই দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা। কোনো আইন-কানুনের তোয়াক্কা না করে একের পর এক নিয়ম ভেঙ্গেছেন সিলেটের লিডিং ইউনিভার্সিটির ভিসি অধ্যাপক ড. কাজী আজিজুল মাওলা। তার পিএইচডি গবেষণা কর্মে চৌর্যবৃত্তি (৮০%), নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদপত্র জালিয়াতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধানাবলিতে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ শব্দ ব্যবহার, সাবেক রেজিস্ট্রার মেজর (অবসরপ্রাপ্ত) শাহ আলমের আর্থিক অনিয়ম-দুর্নীতির ব্যাখ্যা চাইতে গেলে ট্রেজারারকে বাঁধা প্রদান, ভিসি হিসেবে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়কে ব্যক্তিগত সম্পত্তি বানানোর মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে পাকিস্তানি আইন জারি, দেশ ও স্বাধীনতা বিরোধীদের পৃষ্ঠপোষকতা, সরকার বিরোধী কার্যকলাপে উস্কানি, ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি, শেখ রাসেল দিবস পালনে বিরোধিতা, বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে স্থাপিত জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ সম্বলিত দেয়াল চিত্র অপসারণ, সন্ত্রাসবিরোধী কালো দিবসে ব্যান্ডসঙ্গীত বাজিয়ে অরিয়েন্টেশন আয়োজন, শিক্ষকদের মধ্যে গ্রুপিং সৃষ্টির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ বিনষ্ট, ছাত্র-শিক্ষক-কর্মকর্তাদের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ, ব্যক্তিগত গোপনীয়তার নীতি লঙ্ঘন করে বিশ্ববিদ্যালয়ে মহিলা শিক্ষক-কর্মকর্তাদের অফিসকক্ষে সিসিটিভি স্থাপন, কর্তব্য-কর্মে ফাঁকি দিয়ে ঢাকায় অবস্থান করে অনুমোদনহীন ছুটি কাটানো ও বিধিবহির্ভূতভাবে কনসালটেন্সি ব্যবসা পরিচালনা, সপ্তাহে ৪-৫ দিন বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুপস্থিতি এবং সেই অজুহাতে বিভিন্ন জাতীয় এবং রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দিবস উদযাপন ব্যহতকরণ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবান্ধব নবনির্মিত ইমারত ভেঙ্গে ডিজাইন পরিবর্তনের মাধ্যমে স্থাপত্যশৈলী বিনষ্ট করাসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম ও সম্পদের মারাত্মক ক্ষতি সাধন, ইউজিসির অনুমোদন বিহীন বিষয়বস্তু পাঠ্যসূচীতে অন্তর্ভুক্তি, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জন্য বিভ্রান্তিকর ক্লাসটাইম স্লট সৃজন, নিজের মনগড়া পদ্ধতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের মিডটার্ম-ফাইনাল পরীক্ষার নম্বর ও সময় বণ্টন, পরীক্ষার জন্য অসমঞ্জস্যপূর্ণ খাতা বিন্যাস, বিভ্রান্তিকর ও বৈষম্যমূলক মূল্যায়ন পদ্ধতি প্রণয়ন, বেসামাল উন্নয়ন বাজেট পাশ করিয়ে অনুগত শিক্ষক-কর্মকর্তাদেরকে উদরপূর্তির অবারিত সুযোগ প্রদান, শিক্ষার্থীদের জন্য ৫-১০টি বাস কেনার যৌক্তিক দাবি উপেক্ষা করে ব্যক্তিগত আয়েশের নিমিত্তে কোটি টাকা ব্যয়ে বিলাসবহুল গাড়িক্রয়ের জন্য কর্তৃপক্ষের উপর চাপসৃষ্টি এবং একান্ত ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য লেটেস্ট মডেলের আইফোনসহ বিভিন্ন বিলাসিতা সামগ্রী কিনে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক তহবিল তছরুপ, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থ পরিপন্থী ষড়যন্ত্রমূলক বৈঠকের নেতৃত্বদান, ঢাকা-আমেরিকা ভ্রমণের সুবিধার্থে সপ্তাহে ৩ দিন বিভাগীয় প্রধানদের কার্যালয়, প্রশাসনিক ও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের অফিসের মতো গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরসমূহ অঘোষিতভাবে বন্ধ রেখে ছাত্র-ছাত্রীদের ক্লাস-পরীক্ষা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ব্যাহতকরণ এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্থবিরতা সৃষ্টির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়কে কার্যত অচল করে দেওয়াসহ প্রায় দুই ডজনের বেশি অভিযোগ উঠেছে উপাচার্য আজিজুল মাওলার বিরুদ্ধে।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন সূত্রে জানা যায়, সিলেটের লিডিং ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপক আজিজুল মাওলাকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় ২০২১ সালের ২৬ জানুয়ারি। মূলত প্রফেসর আজিজুল মাওলা উপাচার্য হিসেবে প্রায় ২ (দুই) বছর অতিবাহিত করলেও পাকিস্তানি ভূত তাকে ছেড়ে যায়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপর জারি করেছেন পাকিস্তানি আইন। অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি লিডিং ইউনিভার্সিটির ভিসি আজিজুল মাওলার অফিশিয়াল ইমেইল থেকে ভার্সিটির সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীর কাছে একটি মেইল পাঠানো হয়। ‘দ্য লিডিং ইউনিভার্সিটি এমপ্লইয়িজ (এফিশিয়েন্সি এন্ড ডিসিপ্লিন) রেগুলেশন’ শিরোনামের ওই মেইলে ‘এলইউ স্টেটিউটস’ নামে একটি পিডিএফ ফাইল সংযুক্ত ছিল। সেই পিডিএফ ফাইলে লিডিং ইউনিভার্সিটির শিক্ষক-কর্মকর্তাদের জন্য প্রযোজ্য বিধানাবলি বর্ণনা করা হয়। এলইউ স্টেটিউটস নামের ১৩ পৃষ্ঠার ওই ডকুমেন্টে মোট ২৩ টি বিধিমালা এবং এপেন্ডিক্সে ৫টি ফরম সংযুক্ত করা হয়। ডকুমেন্টের প্রত্যেক পাতায় ইংরেজিতে কাজী আজিজুল মাওলা এলইউ সস্টেটিউটস (ডিসিপ্লিন) লিখে দেওয়া হয়েছে। ‘এলইউ স্টেটিউটস’ শিরোনামের ওই ডকুমেন্টের ৫ (১) এর (সি) বিধিতে ভিসি আজিজুল মাওলা উল্লেখ করেন, ‘…ইন দ্য ইন্টারেস্ট অব দ্য সিকিউরিটি অব ইস্ট পাকিস্তান, অর এনি পার্ট দেয়ার অফ…’ অর্থাৎ ‘পূর্বপাকিস্তান বা তার যেকোনো অংশের নিরাপত্তার স্বার্থে…’

এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারী হতভম্ব হয়ে পড়েন! বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর পরেও বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরির বিধানাবলির নামে কীভাবে ‘ইস্ট পাকিস্তান সিকিউরিটি’ আইন প্রয়োগ করা হচ্ছে, অনেকেই তা বুঝতে পারছেন না।নামোল্লেখ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা এই বলে অভিযোগ করেন যে, ভিসি আজিজুল মাওলা তাঁর পাকিস্তান-প্রেম এখনো ছাড়তে পারেন নি।শৃঙ্খলাবিধির নামে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের শাস্তি দিতে তিনি তাদের উপর জারি করেছেন পাকিস্তানি আইন। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের মতো দায়িত্বশীল একটি জায়গায় এরকম একজন লোক কীভাবে নিয়োগ পেলো, তা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন অনেকে।

এর আগে ২০২১ সালে বাংলাদেশ সরকারের আইসিটি অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব লিডিং ইউনিভার্সিটির বর্তমান ট্রেজারার বনমালী ভৌমিক কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ উপলক্ষে বিমানবন্দরে ভিআইপি পাসের আবেদন করলে উপাচার্য আজিজুল মাওলার নির্দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন রেজিস্ট্রার শাহ আলম ৩ অক্টোবর একটি ভিআইপি পাস প্রস্তুত করেন। যেখানে হযরত শাহ্‌জালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে ‘জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর’' হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এতে করে ভিআইপি লাউঞ্জ ব্যবহারে ট্রেজারারকে বিশেষ বিড়ম্বনায় পড়তে হয়।

এছাড়াও ২০২২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি লিডিং ইউনিভার্সিটির তৎকালীন রেজিস্ট্রার শাহ আলমের নানান আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতি খতিয়ে দেখতে চিঠি দেন ট্রেজারার বনমালী ভৌমিক। সেই চিঠিতে শাহ আলমের বিরুদ্ধে মোট এক কোটি ৫ লাখ টাকার আর্থিক দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ করা হয়। এ কাজে ট্রেজারারকে বাঁধা দিতে এবং সাবেক রেজিস্ট্রারের আর্থিক দুর্নীতিকে বৈধতা ও সমর্থন দিতে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি একটি অসৌজন্যমূলক চিঠি ইস্যু করেন ভিসি আজুজুল মাওলা। তবে সেই চিঠির জবাবে ট্রেজারার বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক দুর্নীতি তদন্তে তাঁর অধিকার আছে মর্মে উপাচার্যকে আরেকটি চিঠি ইস্যু করেন ৩ মার্চ। এছাড়াও সাবেক রেজিস্ট্রার শাহ আলমকে দিয়ে ২০২১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয়দিবস এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম শতবার্ষিকী উৎযাপন উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্যালারি-১ এর সামনে স্থাপিত বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ সম্বলিত ছবি অপসারণ করেন ভিসি আজিজুল মাওলা। এছাড়াও বিভিন্ন অজুহাতে সরকারী নির্দেশনা অমান্যের অভিযোগ রয়েছে আজিজুল মাওলার বিরুদ্ধে।

এইসব নজিরবিহীন ঘটনায় আশ্চর্যান্বিত হয়ে পড়েন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক ও কর্মচারীরা। নামোল্লেখ না করার শর্তে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন রেজিস্ট্রারের করা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থ-পরিপন্থী ও সরকার বিরোধী কার্যক্রম এবং এক কোটি পাঁচ লাখ টাকার দুর্নীতির বিষয়কে নগ্নভাবে সমর্থন করেন ভিসি আজিজুল মাওলা। বর্তমানে নতুন রেজিস্ট্রার নিয়োগ দেওয়া হলেও উপাচার্য আজিজুল রয়েছেন ধরা ছোঁয়ার বাইরে।”
এছাড়া প্রফেসর আজিজুলের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়কে নিজের ব্যক্তিগত সম্পত্তির মতো করে যথেচ্ছ ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন রেজিস্ট্রার শাহ আলম এবং তার পছন্দের ব্যক্তি ট্রাস্টিবোর্ডের সেক্রেটারি মেজর (অব) শায়কুল হক চৌধুরীকে ম্যানেজ করে এবং পারস্পরিক যোগসাজশে গেল বছরের ২৫ নভেম্বর থেকে ২৫ ডিসেম্বর (একটানা ৩১দিন) এবং চলতি বছরের ১৬ জুন থেকে ১৭ জুলাই (৩২দিন) দেশের বাইরে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করেন। নিয়েছেন এক্স-বাংলাদেশ ডিউটি লিভ অর্থাৎ দেশের বাইরে থাকাকালীন যুক্তরাষ্ট্রে বসে লিডিংইউনিভার্সিটিতে যাবতীয় বেতন-ভাতাদি অক্ষুণ্ণ সাপেক্ষে অফিস করেন তিনি! অভিযোগ উঠেছে, তিনি যুক্তরাষ্ট্রে নিজের ছেলে ও পরিবারের সাথে অবকাশ যাপন করতে গেলেও বিশ্ববিদ্যালয়কে দেয়া চিঠিতে ভুঁইফোঁড় কিছু সংগঠনের সাথে মিটিং করাকে ছুটির কারণ হিসেবে দেখান। দুই মাসের অধিক সময় দেশের বাইরে অবস্থান করলেও এ দীর্ঘ সময় উপাচার্যের দায়িত্ব কাউকে বুঝিয়ে দিয়ে যাননি তিনি। এতে করে তার দেশের বাইরে অবস্থানের ওই সময়ে উপাচার্যের করণীয় কাজগুলো কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে।
প্রফেসর ড কাজী আজিজুল মাওলার বিরুদ্ধে অভিযোগের এখানেই শেষ নয়। লিডিং ইউনিভার্সিটিতে উপাচার্য হিসেবে যোগদানের আগে তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) স্থাপত্য বিভাগে শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।সে সময় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠে, তিনি তার পিএইচডি থিসিসে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত নকল করেছেন।বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগের অধ্যাপকড. নিজামউদ্দিন আহমেদ (যিনি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রো-ভিসি) বুয়েটের তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. নুরুদ্দিন আহমেদের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন যে, আজিজুল মাওলার থিসিসের ৮০ ভাগ নকল। পাশাপাশি তিনি ইউনিভার্সিটি অব লিভারপুলে পিএইচডি ডিগ্রি নেয়ার সময় মাস্টার্স লেভেলে শিক্ষার্থীদের তত্ত্বাবধান করেছেন দাবি করে একটি সার্টিফিকেট বুয়েটে জমা দেন, যা জাল সনদ ছিলো বলে অনুসন্ধানে প্রমাণিত হয়।
অধ্যাপক আজিজুল মাওলার পিএইচডি থিসিসে চৌর্যবৃত্তি এবং যুক্তরাজ্যের লিভারপুল ইউনিভার্সিটির সনদ জালিয়াতির অভিযোগ তদন্তে বুয়েট কর্তৃপক্ষ একটি কমিটি গঠন করে। তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক করা হয় ড. শহীদুল হাসানকে (যিনি বর্তমানে ইস্ট-ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য)। তিন সদস্য বিশিষ্ট ওই কমিটি দীর্ঘ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর অভিযোগের সত্যতা পায়। তিনি যে ডকুমেন্ট বুয়েটে জমা দেন এরকম কোন কিছু লিভারপুল ইউনিভার্সিটির স্থাপত্য বিভাগ থেকে ইস্যু করা হয়নি বলে জানায় লিভারপুল ইউনিভার্সিটির কর্তৃপক্ষ। আজিজুল মাওলা লিভারপুল ইউনিভার্সিটির স্থাপত্য বিভাগের প্রধানের স্বাক্ষর জাল করে ওই সনদ তৈরি করেন বলে তদন্তে উঠে আসে। আজিজুল মাওলার বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটির সুপারিশ ছিল, এ ধরণের জালিয়াতকে বিশ্ববিদ্যালয় তো দূরের কথা শিক্ষক হিসেবে কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বারান্দায়ও বিচরণ করতে দেওয়া অমার্জনীয় অপরাধ।

আজিজুল মাওলার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ এবং তদন্ত ফলাফল বিষয়ে ২০০৩ সালের ১৮ আগস্ট ‘দ্য ডেই লিস্টার’ পত্রিকায় অনুসন্ধানী রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। তবে তখনকার দিনে তার রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে আজিজুল মাওলাকে চাকুরিচ্যুত করা যায়নি।লঘুদণ্ড হিসেবে তার বেতন বৃদ্ধি ৫ (পাঁচ) বছরের জন্য রহিত করা হয়।শিক্ষাঙ্গনে গুরুপাপে এমন লঘুদণ্ডে বুয়েটের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা আশ্চর্যান্বিত হয়ে পড়েন।তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের আনুগত্য থাকার কারণে তার বিরুদ্ধে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয় বুয়েট প্রশাসন।

Address

Nilkhet Road
Dhaka
1000

Telephone

12123234356

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when অপরাজেয় বাংলা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Share