20/04/2026
তেল আছে, তেল নেই!
রিফাইনারিতে পেট্রল আর অকটেন উপচে পড়ছে। ট্যাংক ভরা। জায়গা নেই। অথচ ঢাকার পাম্পে লম্বা লাইন। এই দুটো ছবি একসাথে দেখলে মাথা চক্কর দিয়ে ওঠে। এটা কোনো দুর্ঘটনা না, কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগও না। এটা সরকারের নিজের হাতে তৈরি সংকট।
সুপার পেট্রোকেমিক্যাল, যারা দেশের মোট পেট্রল-অকটেন চাহিদার ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ একাই সামলায়, তাদের ৫ এপ্রিলের বৈঠকে বলা হয়েছিল এপ্রিলে ৩৭ হাজার টন সরবরাহ করতে প্রস্তুত থাকো। তারা প্রস্তুতিও নিল। তারপর ৮ এপ্রিল হঠাৎ চিঠি দিয়ে জানানো হলো, তেল নেওয়া হবে না। এই একটা সিদ্ধান্তে কোম্পানির ট্যাংক ভরে গেল, উৎপাদন বন্ধ হওয়ার জোগাড়।
এদিকে একই সময়ে সরকার পেট্রল-অকটেনের দাম বাড়িয়ে দিল।
একটু ঠান্ডা মাথায় ভাবুন। দেশে তেল আছে, রিফাইনারি থেকে নেওয়া হচ্ছে না, পাম্পে সংকট তৈরি হচ্ছে, আর ঠিক সেই মুহূর্তে দাম বাড়ানো হচ্ছে। এই তিনটা জিনিস একসাথে ঘটছে। এটাকে কি অযোগ্যতা বলবেন, নাকি পরিকল্পিত বলবেন? যে কোনো একটা হলেই এই সরকারের থাকার অধিকার প্রশ্নবিদ্ধ।
দাম বাড়ানোর পরও পাম্পে ভিড় কমেনি। মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। কারণ তেল দরকার। বাইকারের জীবিকা তেলের ওপর নির্ভর করে। রিকশাচালক না খেলেও চলবে কিন্তু তেল না পেলে চলবে না। ওদিকে কৃষক বলছে ধানে সেচ দিতে পারছে না, ডিজেল নেই। বোরো মৌসুমে ডিজেলের সংকট মানে ফসলের সংকট, আর ফসলের সংকট মানে সামনের মাসগুলোতে আরেকটা সমস্যা।
কিন্তু সরকারের তরফ থেকে কোনো ক্ষমাপ্রার্থনা নেই। কোনো ব্যাখ্যা নেই। কোনো দায়িত্ব স্বীকার নেই। প্রধানমন্ত্রী নাকি একাধিক বৈঠক করেছেন। বৈঠক হয়, নির্দেশনা দেওয়া হয়, তারপর পরের দিন আবার পাম্পে লাইন। বৈঠকের ফল শূন্য।
এখন বিএনপির গুজব সেল সোশ্যাল মিডিয়ায় গল্প ছড়াচ্ছে যে মার্চে অকটেন সংকটের সময় দেশীয় রিফাইনারিগুলো নাকি তেল মজুদ করে রেখেছিল, দাম বাড়বে এই আশায়। সেই গল্পের সূত্র ধরে বলা হচ্ছে বিপিসি এখন শাস্তি দিচ্ছে রিফাইনারিগুলোকে। এই গল্পটা সত্যি হলে ভালোই হতো, কারণ তাহলে অন্তত একটা যুক্তি দাঁড় করানো যেত।
কিন্তু গল্পটা মিথ্যা।
চুক্তির শর্ত অনুযায়ী বেসরকারি রিফাইনারির তেল মজুদ করার কোনো সুযোগ নেই। কনডেনসেট সরবরাহ করে পেট্রোবাংলা। পেট্রোবাংলা না দিলে রিফাইনারির কিছু করার নেই। আর এই কোম্পানিগুলো খোলা বাজারে যাচাই করে দাম ঠিক করে না। সরকার যে দাম নির্ধারণ করে দেয়, সেই দামেই বিক্রি করতে হয়। সুতরাং দাম বাড়লে বেশি পাবে, কমলে কম পাবে, এই হিসাবে মজুদ করার কোনো লাভ নেই।
তাহলে গল্পটা ছড়ানো হচ্ছে কেন? কারণ আসল প্রশ্নটা যেন না ওঠে। আসল প্রশ্ন হলো, রিফাইনারিতে তেল থাকতে সরকার কেন নিচ্ছে না? কেন একই সময়ে দাম বাড়ানো হলো? কেন পাম্পে মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকছে?
অকটেন মজুতের ধারণক্ষমতা ৫৩ হাজার টন, কিন্তু মজুত এখন ৫৫ হাজার টন। এরই মধ্যে ১০ এপ্রিল ৩৭ হাজার টন অকটেন নিয়ে একটা জাহাজ এসে গেছে। অর্থাৎ বিদেশ থেকে আমদানি থামেনি, কিন্তু দেশের রিফাইনারি থেকে নেওয়া বন্ধ। এই সিদ্ধান্তটা নিছক প্রশাসনিক ব্যর্থতার ফল হলেও ক্ষতি হয়েছে জনগণের। আর যদি অন্য কোনো কারণ থাকে, সেটা আরো ভয়ের।
বিএনপি ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ক্ষমতায় এসেছে সেই নির্বাচনে বড় দলগুলো ছিল না, মানুষ ভোট দেয়নি। সেই গ্রহণযোগ্যতার সংকট মাথায় নিয়ে তারা যদি অন্তত ঠিকঠাক শাসন করত, তাহলেও কথা ছিল। কিন্তু তেলের এই সংকট দেখে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, শাসনের ইচ্ছা বা সক্ষমতা কোনোটাই নেই।
মানুষ এখন গাড়ি গ্যারেজে রেখে দিচ্ছে। পাম্পে গিয়ে তেল না পেলে মাঝরাস্তায় আটকে পড়তে হবে, এই ভয়ে বের হচ্ছে না। এই ভয়টা সরকার তৈরি করেছে। আর এটা তৈরি করে তারা কার লাভ করল, সেটা বোঝা যাচ্ছে না। শুধু বোঝা যাচ্ছে, ক্ষতি হয়েছে সাধারণ মানুষের।
#মজিববাদবাঙালিমুক্তিরদর্শন