01/02/2026
দিন-০১১ /৩০০
সূরা বাকারাঃ আয়াত ১৪৭-১৬৪
সারাংশঃ আদেশ ৩ টি (আ ১৬,১৭,১৮) এবং নিষেধ ০ (১৪) টি
আদেশ
১/১৯ ভাল কাজে প্রতিযোগিতা করতে হবে (আয়াত ১৪৮)
২/২০ নামাযে কেবলামুখী হতে হবে । (অর্থাৎ নামাযের সময় মসজিদুল হারাম তথা কাবা শরীফের দিকে মুখ ফিরাতে হবে) (আয়াত ১৪৯-১৫০)
৩/২১ ভয় করতে হবে আল্লাহকে, মানুষকে নয়। (অর্থাৎ দ্বীনের বিধান পালনে বিরোধীরা কি বললো না বললো সেটাকে আমালে নেয়া যাবে না।) (আয়াত ১৫০)
৪/২২ আল্লাহকে স্বরণ করতে হবে (আল্লাহকে স্বরণ করলে আল্লাহও বান্দাকে স্মরণ করেন) এবং আল্লাহর শোকর (কৃতজ্ঞতা) আদায় করতে হবে। (আয়াত ১৫২)
৫/২৩ আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতে হবে ধৈর্য ও নামাযের মাধ্যমে। (আয়াত ১৫৩)
৬/২৪ বিপদে-মুসিবতে মুমিনদের করণীয়: ধৈর্যধারণ---- (আয়াত ১৫৫-১৫৭)
নিষেধ
১/১৪ (দ্বীনের বিধান পালনে) মানুষকে ভয় করা যাবে না; ভয় করতে হবে একমাত্র আল্লাহকে। (আয়াত ১৫০)
২/১৫ আল্লাহর নাফরমানী (না-শোকরী) করা যাবে না। (আয়াত ১৫২)
৩/১৬ আল্লাহর রাস্তায় যারা প্রাণ দিয়েছেন, (শহীদ হয়েছেন) তাদের মৃত বলা যাবে না। কারণ তারা আসলে জীবিত, কিন্তু মানুষ তা অনুধান করতে পারে না। (আয়াত ১৫৪)
৪/১৭ আল্লাহর কিতাবের কোন কিছু গোপন করা যাবে না (যারা এরুপ করে তারা গযবপ্রাপ্ত) (আয়াত ১৫৯-১৭৪)
আদেশ ১৯
ভাল কাজে প্রতিযোগিতা করতে হবে (আয়াত ১৪৮)
আর প্রত্যেকের একটি দিক রয়েছে, যে দিকে সে চেহারা ফিরায়। অতএব তোমরা সৎকাজে প্রতিযোগিতা কর। তোমরা যেখানেই থাক না কেন আল্লাহ্ তোমাদের সবাইকে নিয়ে আসবেন। নিশ্চয় আল্লাহ্ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান। (আয়াত ১৪৮)
যারা কিবলা পরিবর্তনের কারণে আপত্তি করছিল, তাদের বিরুদ্ধে প্রমাণ চূড়ান্ত করার পর মুসলিমদেরকে হিদায়াত দেওয়া হচ্ছে যে, প্রতিটি ধর্মের লোক নিজেদের জন্য আলাদা কিবলা স্থির করে রেখেছে। কাজেই ইহকালে তাদের সকলকে বিশেষ একটি কিবলার অনুসারী বানানো তোমাদের পক্ষে সম্ভব হবে না। সুতরাং তাদের সাথে কিবলা সম্পর্কে বিতর্কে লিপ্ত না হয়ে বরং তোমাদের উচিত নিজেদের কাজে লেগে পড়া। নিজেদের সে কাজ হল আমলনামায় যত বেশি সম্ভব পুণ্য সঞ্চয় করা। তোমরা এ কাজে একে অন্যের উপরে থাকার চেষ্টা কর। শেষ পরিণাম তো হবে এই যে, আল্লাহ তাআলা সমস্ত ধর্মাবলম্বীদেরকে নিজের কাছে ডেকে নেবেন এবং তখন তাদের সকলের হুজ্জত খতম হয়ে যাবে। সেখানে সকলেরই কিবলা একটিই হয়ে যাবে। কেননা তখন সকলে আল্লাহ তাআলার সামনে তাঁরই অভিমুখী হয়ে দাঁড়ানো থাকবে।
তাফসীর (মুফতী তাকী উসমানী)
২/২০ নামাযে কেবলামুখী হতে হবে । (অর্থাৎ নামাযের সময় মসজিদুল হারাম তথা কাবা শরীফের দিকে মুখ ফিরাতে হবে) (আয়াত ১৪৯-১৫০)
আর যেখান থেকেই আপনি বের হন না কেন মসজিদুল হারামের দিকে চেহারা ফিরান। নিশ্চয় এটা আপনার রব-এর কাছ থেকে পাঠানো সত্য। আর তোমরা যা কর সে সম্পর্কে আল্লাহ গাফেল নন।
আর (কেবলা পরিবর্তনের দ্বিতীয় তাৎপর্য হলো এই যে, আল্লাহ্ তা’আলার রীতি অনুসারে) প্রত্যেক ধর্মের অনুসারীদের জন্যই একেকটি কেবলা নির্ধারিত রয়েছে, (ইবাদত করার সময় ) তারা সেদিকেই মুখ করে থাকে। (শরীয়তে মুহাম্মদীও যেহেতু একটি স্বতন্ত্র দীন, কাজেই এর জন্যও একটি কেবলা নির্ধারণ করে দেওয়া হলো। এ তাৎপর্যটি যখন সবাই জানতে পারল) কাজেই (হে মুসলমানগণ, এখন এসব বিতর্ক পরিহার করে) তোমরা সৎকাজের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলকভাবে এগিয়ে যাবার চেষ্টা কর। (কারণ, একদিন তোমাদেরকে নিজেদের মালিকের সম্মুখীন হতে হবে। কাজেই) তোমরা যেখানেই থাক না কেন, আল্লাহ্ তোমাদের সবাইকে (নিজের সামনে) অবশ্যই হাযির করবেন। (তখন সৎকাজের প্রতিদান এবং মন্দ কাজের জন্য শাস্তি ভোগ করতে হবে।) বস্তুত আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন নিশ্চয়ই যাবতীয় বিষয়ে ক্ষমতাশীল। আর (এ তাৎপর্যের তাকীদও এই যে, যেভাবে মুকীম অবস্থায় কা’বার দিকে মুখ করা হয়, তেমনিভাবে মদীনা কিংবা অন্য যে কোনখান থেকে যদি আপনি সফরে গমন করেন, (তখনও নামায পড়ার সময়) নিজের চেহারা মসজিদে হারামের দিকে রাখবেন। (সারকথা, মুকীম অবস্থায় হোক কিংবা সফরকালে হোক, সর্বাবস্থায় এটাই হলো কেবলা।) আর (কেবলার ব্যাপারে) এই সাধারণ নির্দেশই হলো সম্পূর্ণ ও সঠিক এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে আগত। আর আল্লাহ্ তা’আলা তোমাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে এতটুকুও অনবহিত নন।
তাফসীরে মারিফুল কোরআন
আর তুমি যেখান হতেই বের হও না কেন, মাসজিদুল হারামের (কা’বা শরীফের) দিকে মুখ ফেরাও এবং যেখানেই থাক না কেন, সেই (কা’বার) দিকেই মুখ ফেরাও। * যাতে তাদের মধ্যে সীমালঘংনকারিগণ ছাড়া অন্য কোন লোক তোমাদের সাথে বিতর্ক না করতে পারে। সুতরাং তোমরা তাদের ভয় করো না, বরং একমাত্র আমাকেই ভয় কর, যাতে আমি আমার অনুগ্রহ তোমাদেরকে পরিপূর্ণরূপে দান করতে পারি এবং যাতে তোমরা সৎপথ পেতে পার।
ক্বিবলার দিকে মুখ ফিরানোর নির্দেশের তিনবার পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে। হয় এর উপর তাকীদ ও এর গুরুত্ব বর্ণনা করার জন্য অথবা এই জন্য যে, এটা কোন বিধানকে রহিত ঘোষণা করার প্রথম পরীক্ষা ছিল। তাই মনের মধ্যেকার সন্দেহ-সংশয় ও খুঁতখুঁতে ভাবকে দূর করার জন্য জরুরী ছিল যে, তার বারবার পুনরাবৃত্তি করে মানুষের অন্তরে সুদৃঢ় করে দেওয়া হোক। আবার এও হতে পারে যে, একাধিক কারণের জন্য এ রকম করা হয়েছে। এক কারণ তো এই ছিল যে, নবী করীম (সাঃ)-এর এটা আন্তরিক ইচ্ছা ও আশা ছিল। তা বর্ণনা করার জন্য এ কথা বলা হয়েছে। দ্বিতীয় কারণ, প্রত্যেক ধর্মাবলম্বি ও দাওয়াতদাতার নিজস্ব পৃথক কেন্দ্র (ক্বিবলা) ছিল, তা বর্ণনা করে এ কথার পুনরাবৃত্তি হয়। তৃতীয় কারণ, বিরোধীপক্ষের অভিযোগসমূহের খন্ডনের জন্য তৃতীয়বার তা পুনরুক্ত হয়। (ফাতহুল ক্বাদীর)
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৩/২১ ভয় করতে হবে আল্লাহকে, মানুষকে নয়। (অর্থাৎ দ্বীনের বিধান পালনে বিরোধীরা কি বললো না বললো সেটাকে আমালে নেয়া যাবে না।) (আয়াত ১৫০)
আর তুমি যেখান হতেই বের হও না কেন, মাসজিদুল হারামের (কা’বা শরীফের) দিকে মুখ ফেরাও এবং যেখানেই থাক না কেন, সেই (কা’বার) দিকেই মুখ ফেরাও। যাতে তাদের মধ্যে সীমালঘংনকারিগণ ছাড়া অন্য কোন লোক তোমাদের সাথে বিতর্ক না করতে পারে। সুতরাং তোমরা তাদের ভয় করো না, * বরং একমাত্র আমাকেই ভয় কর, যাতে আমি আমার অনুগ্রহ তোমাদেরকে পরিপূর্ণরূপে দান করতে পারি এবং যাতে তোমরা সৎপথ পেতে পার।
তাদেরকে ভয় করো না অর্থাৎ, মুশরিকদের কথার পরোয়া করো না। তারা বলেছিল যে, মুহাম্মাদ তো আমাদের ক্বিবলা গ্রহণ করে নিয়েছে, এবার অতি সত্বর দেখবে সে আমাদের দ্বীনও গ্রহণ করে নেবে। 'আমাকেই ভয় কর' অর্থাৎ, যে নির্দেশ আমি দিতে থাকব, তার উপর নির্ভয়ে আমল করতে থাকো। ক্বিবলার পরিবর্তনকে অনুগ্রহ পরিপূর্ণতা ও পথপ্রাপ্তি বলে আখ্যায়িত করে এ কথা পরিষ্কার করে দেওয়া হয়েছে যে, অবশ্যই আল্লাহর নির্দেশের উপর আমল মানুষকে অনুগ্রহ, পুরস্কার ও সম্মানের অধিকারী বানায় এবং সে সুপথপ্রাপ্তি তথা হিদায়াতের তওফীক লাভ করে।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৪/২২ আল্লাহকে স্বরণ করতে হবে (আল্লাহকে স্বরণ করলে আল্লাহও বান্দাকে স্মরণ করেন) এবং আল্লাহর শোকর (কৃতজ্ঞতা) আদায় করতে হবে। (আয়াত ১৫২)
কাজেই তোমরা আমাকে স্মরণ কর*, আমিও তোমাদেরকে স্মরণ করব। আর তোমরা আমার প্রতি কৃতজ্ঞ হও এবং অকৃতজ্ঞ হয়ে না। (আয়াত ১৫২)
শরী'ঈ পরিভাষায় যিকর হচ্ছে, বান্দা তার রবকে স্মরণ করা। হোক তা তার নাম নিয়ে, গুণ নিয়ে, তার কাজ নিয়ে, প্রশংসা করে, তার কিতাব তিলাওয়াত করে, তার একত্ববাদ ঘোষণা করে, তার নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করে অথবা তার কাছে কিছু চেয়ে।
যিকর দুই প্রকার। যথা - কওলী বা কথার মাধ্যমে যিকর ও আমলী বা কাজের মাধ্যমে যিকর। প্রথম প্রকার যিকরের মধ্যে রয়েছে - কুরআন তিলাওয়াত, আল্লাহর সুন্দর সুন্দর নাম ও সিফাতসমূহের আলোচনা ও স্মরণ, তার একত্ববাদ ঘোষণা ইত্যাদি। আর দ্বিতীয় প্রকারে রয়েছে - ইলম অর্জন করা ও শিক্ষা দেয়া, আল্লাহর হুকুম-আহকাম ও আদেশ-নিষেধ মেনে চলা ইত্যাদি। প্রথম প্রকার যিকরের মধ্যে কিছু যিকর আছে যা সময়, অবস্থা এবং সংখ্যার সাথে সম্পৃক্ত। যেমন, সকাল ও সন্ধ্যার যিকর, সালাতের পরের যিকর, খাওয়ার শুরু-শেষ, কাপড় পরিধান, মসজিদে প্রবেশ-বাহির ইত্যাদি সহ দৈনন্দিন বিভিন্ন কাজ-কর্মের দোআ বা যিকরসমূহ। যে সকল যিকর অবস্থা, সময় ও সংখ্যার সাথে সম্পৃক্ত সেগুলোর সংখ্যা, সময় অথবা অবস্থা কোনটিরই পরিবর্তন করা জায়েয নেই। যে সকল যিকর এ তিনটির সাথে সম্পৃক্ত নয় অর্থাৎ সাধারণ যিকর, সেগুলো সময়, সংখ্যা অথবা অবস্থার সাথে সম্পৃক্ত করাও জায়েয নেই। ইমাম আবু হানিফা রহিমাহুল্লাহ বলেনঃ ‘মৌখিক যিকরের জন্য কোন নির্দিষ্ট স্থানে একত্রিত হওয়া এবং নির্দিষ্ট শব্দ নির্ধারণ করা বিদ'আত’। [ইবনুল হুমাম, শরহে ফাতহুল কাদীরঃ ২/৭২]
যিকর এর ফযীলত অসংখ্য। তন্মধ্যে এটাও কম ফযীলত নয় যে, বান্দা যদি আল্লাহকে স্মরণ করে, তাহলে আল্লাহও তাকে স্মরণ করেন। আবু উসমান নাহদী রাহেমাহুল্লাহ বলেন, আমি সে সময়টির কথা জানি, যখন আল্লাহ তা'আলা আমাদিগকে স্মরণ করেন। উপস্থিত লোকেরা জিজ্ঞেস করল, আপনি তা কেমন করে জানতে পারেন? বললেন, তা এজন্য যে, কুরআনুল কারীমের ওয়াদা অনুসারে যখন কোন মুমিন বান্দা আল্লাহকে স্মরণ করে, তখন আল্লাহ নিজেও তাকে স্মরণ করেন। কাজেই বিষয়টি জানা সবার জন্যই সহজ যে, আমরা যখন আল্লাহর স্মরণে আত্মনিয়োগ করব, আল্লাহ্ তা'আলাও আমাদের স্মরণ করবেন।
সাঈদ ইবনে যুবায়ের রাহিমাহুল্লাহ যিকরুল্লাহ'র তাফসীর প্রসঙ্গে বলেছেন যে, যিকরের অর্থই হচ্ছে আনুগত্য এবং নির্দেশ মান্য করা। তার বক্তব্য হচ্ছেঃ “যে ব্যক্তি আল্লাহর নির্দেশের আনুগত্য করে না, সে আল্লাহর যিকরই করে না; প্রকাশ্যে যতবেশী সালাত এবং তাসবীহই সে পাঠ করুক না কেন। মূলত: যে ব্যক্তি আল্লাহ্ তা'আলার আনুগত্য করে অর্থাৎ তার হালাল ও হারাম সম্পর্কিত নির্দেশগুলোর অনুসরণ করে, সেই আল্লাহকে স্মরণ করে, যদি তার নফল সালাত ও সিয়াম কিছু কমও হয়। অন্যদিকে যে ব্যক্তি আল্লাহর নির্দেশাবলীর বিরুদ্ধাচরণ করে সে সালাত-সিয়াম, তাসবীহ-তাহলীল প্রভৃতি বেশী করে করলেও প্রকৃতপক্ষে সে আল্লাহকে স্মরণ করে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেনঃ যে ব্যক্তি যিকর করে এবং যে ব্যক্তি যিকর করেনা তাদের উপমা হচ্ছে জীবিত ও মৃতের ন্যায়। [বুখারীঃ ২০৮]
অপর এক হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তোমাদেরকে কি এমন একটি উত্তম আমলের সংবাদ দেব যা তোমাদের মালিকের নিকট অধিকতর পবিত্র, তোমাদের মর্যাদা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে অধিকতর সহায়ক, স্বর্ণ ও রৌপ্য ব্যয় করা থেকেও তোমাদের জন্য উত্তম, শক্রর সাথে মোকাবেলা করে গর্দান দেয়া-নেয়া থেকে উত্তম? তারা বলল, হ্যাঁ অবশ্যই বলবেন। তিনি বললেন, যিকরুল্লাহ। [তিরমিযীঃ ৫/৪৫৯]
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত এক হাদীসে-কুদসীতে আছে, আল্লাহ্ তাআলা বলেন, বান্দা যে পর্যন্ত আমাকে স্মরণ করতে থাকে বা আমার স্মরণে যে পর্যন্ত তার ঠোট নড়তে থাকে, সে পর্যন্ত আমি তার সাথে থাকি। [বুখারীঃ ৭৪০৫] মুআয রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “আল্লাহর আযাব থেকে মুক্ত করার ব্যাপারে মানুষের কোন আমলই যিকরুল্লাহর সমান নয়।” যুন্নুন মিসর বলেনঃ ‘যে ব্যক্তি প্রকৃতই আল্লাহকে স্মরণ করে সে অন্যান্য সবকিছুই ভুলে যায়। এর বদলায় স্বয়ং আল্লাহ্ তা'আলাই সবদিক দিয়ে তাকে হেফাজত করেন এবং সবকিছুর বদলা তাকে দিয়ে দেন’।
তাফসীরে জাকারিয়া
৫/২৩ আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতে হবে ধৈর্য ও নামাযের মাধ্যমে। (আয়াত ১৫৩)
হে ঈমানদারগণ! তোমরা সাহায্য চাও সবর * ও সালাতের মাধ্যমে। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ সবরকারীদের সাথে আছেন।**
‘সবর’ শব্দের অর্থ হচ্ছে সংযম অবলম্বন ও নফস্ এর উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ লাভ। কুরআন ও হাদীসের পরিভাষায় ‘সবর’-এর তিনটি শাখা রয়েছে। (এক) নফসকে হারাম এবং না-জায়েয বিষয়াদি থেকে বিরত রাখা (দুই) ইবাদাত ও আনুগত্যে বাধ্য করা এবং (তিন) যেকোন বিপদ ও সংকটে ধৈর্যধারণ করা। অর্থাৎ যেসব বিপদ-আপদ এসে উপস্থিত হয়, সেগুলোকে আল্লাহর বিধান বলে মেনে নেয়া এবং এর বিনিময়ে আল্লাহর তরফ থেকে প্রতিদান প্রাপ্তির আশা রাখা। [ইবনে কাসীর]।
‘সবর’-এর উপরোক্ত তিনটি শাখাই প্রত্যেক মুসলিমের অবশ্যপালনীয় কর্তব্য। সাধারণ মানুষের ধারণা সাধারণতঃ তৃতীয় শাখাকেই সবর হিসেবে গণ্য করা হয়। প্রথম দুটি শাখা এ ক্ষেত্রে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ, সে ব্যাপারে মোটেও লক্ষ্য করা হয় না। এমনকি এ দু’টি বিষয়ও যে ‘সবর’-এর অন্তর্ভুক্ত এ ধারণাও যেন অনেকের নেই। কুরআন হাদীসের পরিভাষায় ধৈর্যধারণকারী বা সাবের সে সমস্ত লোককেই বলা হয়, যারা উপরোক্ত তিন প্রকারেই সবর অবলম্বন করে।
** সালাত এবং ‘সবর’-এর মাধ্যমে যাবতীয় সংকটের প্রতিকার হওয়ার কারণ এই যে, এ দু'পস্থায়ই আল্লাহ্ তা'আলার প্রকৃত সান্নিধ্য লাভ হয়। আল্লাহ সবরকারীদের সাথে আছেন বাক্যের দ্বারা এদিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, সালাত আদায়কারী এবং সবরকারীগণের আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ হয়। মহান আল্লাহ আরশের উপর থেকেও তাঁর বান্দাদের সাথে থাকার অর্থ দুটি। প্রথম. সাধারন অর্থে সাথে থাকা। যা সমস্ত মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আর তা হচ্ছে, সবাই মহান আল্লাহর জ্ঞানের ভিতরে থাকা। মহান আল্লাহর যত সৃষ্টি সবার যাবতীয় অবস্থা তাঁর গোচরিভূত।
তিনি ভাল করেই জানেন কে কোথায় কোন অবস্থায় কোন কাজে লিপ্ত। দ্বিতীয় প্রকার সাথে থাকা বিশেষ অর্থে। যা কেবলমাত্র তাঁর নেককার, সবরকারী, ইহসানকারী, মুত্তাকীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আর সেটি হচ্ছে, সাহায্য-সহযোগিতা করা। মহান আল্লাহর পক্ষে কারও সাথে থাকার অর্থ কখনো এটা হতে পারে না যে, তিনি তার সাথে চলাফেরা করছেন বা কোন কিছুর ভিতরে প্রবেশ করে আছেন। অথবা তার সাথে লেগে আছেন। কারণ; মহান আল্লাহ তাঁর আরশের উপর রয়েছেন। তিনি স্রষ্টা হিসেবে সৃষ্টি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
তাফসীরে জাকারিয়া
৬/২৪ বিপদে-মুসিবতে মুমিনদের করণীয়: ধৈর্যধারণ---- (আয়াত ১৫৫-১৫৭)
কোন বিপদে পতিত হওয়ার আগেই যদি সে সম্পর্কে সংবাদ দিয়ে দেয়া হয়, তবে সে বিপদে ধৈর্যধারণ সহজতর হয়ে যায়। কেননা, হঠাৎ করে বিপদ এসে পড়লে পেরেশানী অনেক বেশী হয়। যেহেতু আল্লাহ্ তা'আলা সমগ্র উম্মতকে লক্ষ্য করেই পরীক্ষার কথা বলেছেন, সেহেতু সবার পক্ষেই অনুধাবন করা উচিত যে, এ দুনিয়া দুঃখ-কষ্ট সহ্য করারই স্থান। সুতরাং এখানে যেসব সম্ভাব্য বিপদ-আপদের কথা বলা হয়েছে, সেগুলোকে অপ্রত্যাশিত কিছু মনে না করলেই ধৈর্যধারণ করা সহজ হতে পারে। পরীক্ষায় সমগ্র উম্মত সমষ্টিগতভাবে উত্তীর্ণ হলে পরে সমষ্টিগতভাবেই পুরস্কার দেয়া হবে; এছাড়াও সবর-এর পরীক্ষায় ব্যক্তিগত পর্যায়ে যারা যতটুকু উত্তীর্ণ হবেন, তাদের ততটুকু বিশেষ মর্যাদাও প্রদান করা হবে।
মূলত: মানুষের ঈমান অনুসারেই আল্লাহ্ তা'আলা মানুষকে পরীক্ষা করে থাকেন। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “সবচেয়ে বেশী পরীক্ষা, বিপদাপদ-বালা মুসিবত নবীদেরকে প্রদান করেন। তারপর যারা তাদের পরের লোক, তারপর যারা এর পরের লোক, তারপর যারা এর পরের লোক।” [মুসনাদে আহমাদ: ৬/৩৬৯] অর্থাৎ প্রত্যেকের ঈমান অনুসারেই তাদের পরীক্ষা হয়ে থাকে। তবে পরীক্ষা যেন কেউ আল্লাহর কাছে কামনা না করে। বরং সর্বদা আল্লাহর কাছে নিরাপত্তা কামনা করাই মুমিনের কাজ।
তাফসীরে জাকারিয়া
Send a message to learn more