30/12/2025
শীতকালে মুরগির খামার ব্যবস্থাপনা: অধিক উৎপাদন ও রোগ প্রতিরোধের কৌশল
শীতকালে প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে ব্রয়লার ও লেয়ার মুরগির উৎপাদনশীলতা বজায় রাখা বেশ চ্যালেঞ্জিং। মুরগির শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা সাধারণত ১০৭.৫° ফারেনহাইট। পরিবেশের তাপমাত্রা কমে গেলে মুরগি দেহ থেকে দ্রুত তাপ হারায়, ফলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় এবং ডিম বা মাংসের উৎপাদন ব্যাহত হয়। নিচে শীতকালীন সফল খামার ব্যবস্থাপনার মূল দিকগুলো তুলে ধরা হলো:
১. তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ও শেড ব্যবস্থাপনা
• থার্মোমিটার ব্যবহার: খামারের সঠিক তাপমাত্রা বুঝতে বিভিন্ন স্থানে থার্মোমিটার স্থাপন করুন।
• ছাদ ও বেড়ার সুরক্ষা: তাপমাত্রা ধরে রাখতে শেডের ছাদে খড়, গোলপাতা বা চট বিছিয়ে দেওয়া যেতে পারে। তীব্র শীতে শেডের চারপাশে পর্দার ব্যবস্থা করতে হবে, তবে তা যেন পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের পথে বাধা না হয়।
• কৃত্রিম তাপ প্রদান: তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে বৈদ্যুতিক বাল্ব বা হ্যারিকেন ব্যবহার করা যায়। তবে তীব্র শীতে গ্যাসের ব্রুডার ব্যবহার করা সবচেয়ে কার্যকর।
• ব্রুডিং প্রস্তুতি: বাচ্চা আসার অন্তত ১২ ঘণ্টা আগেই ব্রুডারে তাপ প্রদানের ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
• লিটার ব্যবস্থাপনা: আর্দ্রতা ও ক্ষতিকর গ্যাস (অ্যামোনিয়া) নিয়ন্ত্রণে শীতকালে লিটার ৪-৫ ইঞ্চি পুরু করে দিতে হবে।
২. খাদ্য ও পানি ব্যবস্থাপনা
• উচ্চ ক্যালরিযুক্ত খাবার: শীতে শরীর গরম রাখতে মুরগির অতিরিক্ত শক্তির প্রয়োজন হয়। তাই খাদ্যে শর্করা বা চর্বির পরিমাণ কিছুটা বাড়ানো উচিত। প্রয়োজনে রেশনে সামান্য তেল মিশিয়ে ক্যালরি বাড়ানো যেতে পারে।
• খাওয়ানোর নিয়ম: ব্রুডিং অবস্থায় প্রথম ৩ দিন লিটারের ওপর কাগজ বিছিয়ে খাবার ছিটিয়ে দিলে ভালো। বড় মুরগিকে অল্প অল্প করে বারবার খাবার দিলে তাদের খাওয়ার আগ্রহ বাড়ে।
• হালকা গরম পানি: প্রচণ্ড শীতে মুরগি পানি পান কমিয়ে দেয়, যা বিপাক প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটায়। তাই সকালে বা তীব্র ঠান্ডার সময় হালকা গরম পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। পানি দেওয়ার আগে পাত্র ভালোভাবে জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার করে নিন।
৩. বিশেষ সতর্কতা ও পর্যবেক্ষণ
• পাইলিং প্রতিরোধ: শীতের রাতে মুরগি ঠান্ডার হাত থেকে বাঁচতে এক জায়গায় জড়ো হয় (পাইলিং), যা থেকে শ্বাসরোধ হয়ে মুরগি মারা যেতে পারে। এটি প্রতিরোধে রাতে একজন দক্ষ কর্মীকে তদারকির দায়িত্বে রাখা উচিত।
• বিদ্যুৎ সরবরাহ: জেনারেটর বা বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থা সচল রাখুন যাতে তাপ উৎপাদনে কোনো বিচ্যুতি না ঘটে।
৪. জৈব নিরাপত্তা ও রোগ প্রতিরোধ
• টিকা প্রদান: শীতকালে রানীক্ষেত ও এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা (বার্ড ফ্লু) রোগের প্রকোপ বাড়ে। রানীক্ষেত রোগের টিকা সময়মতো দিলে ইনফ্লুয়েঞ্জার ঝুঁকিও অনেকটা কমে।
• জীবাণুনাশক স্প্রে: খামারের চারপাশের ১০০ গজের মধ্যে নিয়মিত জীবাণুনাশক স্প্রে করতে হবে।
• বন্য ও মুক্ত মুরগি থেকে দূরত্ব: খামারের আশপাশে মুক্তভাবে বিচরণ করা মুরগি বা বন্য পাখিকে আসতে দেওয়া যাবে না, কারণ এদের মাধ্যমেই ভাইরাসের সংক্রমণ বেশি ছড়ায়।
• দ্রুত শনাক্তকরণ: শীতে মাইকোপ্লাজমা বা ঠান্ডা লাগার সমস্যাও দেখা দেয়। যেকোনো রোগের প্রাথমিক উপসর্গ দেখা মাত্রই দ্রুত চিকিৎসা শুরু করতে হবে, কারণ শীতের কারণে মুরগির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় নিরাময় কঠিন হয়ে পড়ে।
উপসংহার: শীতকালে মুরগির সঠিক যত্ন, পুষ্টিকর খাবার এবং কঠোর জৈব নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারলে খামারিরা লোকসানের হাত থেকে রক্ষা পাবেন এবং কাঙ্ক্ষিত মুনাফা অর্জন করতে পারবেন।