28/02/2026
মুখোমুখি সংঘর্ষে মৃত্যু নিঃসন্দেহে গৌরবের। তবে যে জীবন নিজেকে বিলিয়ে দেয় মৃত্যুর আহ্বানে, যে জীবন অসংখ্য মানুষকে বাঁচার স্বপ্ন দেখতে শেখায়—সেই জীবনকে কোন মানদণ্ডে মাপা যায়? তাজুল শুধু একটি নাম নন, তিনি এক অমলিন প্রেরণা; সমগ্র বাংলায় তাঁর মতো আরেকজন খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করার পর আরাম-আয়েশের জীবন বেছে নেওয়ার সুযোগ তাঁর ছিল। কিন্তু শোষণ-বঞ্চনামুক্ত সমাজ গঠনের লক্ষ্যে তিনি যোগ দেন আদমজী জুট মিলে বদলি শ্রমিক হিসেবে। পরিবারের সব সুবিধা-সুবিধাকে পেছনে ফেলে স্ত্রী-সন্তানসহ টানা দশ বছর শ্রমিকপল্লীতে শ্রমিকদের সাথেই বসবাস করেছেন। সুবিধাবাদের মোহ ত্যাগ করে তিনি বেছে নিয়েছিলেন মর্যাদার পথ। বাস্তবতার অজুহাতে সরে দাঁড়াতে পারতেন, কিন্তু ছাত্র ইউনিয়ন থেকে অর্জিত আদর্শের প্রতি আমৃত্যু ছিলেন অবিচল।
তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হন, আদমজী ট্রেড ইউনিয়নের সহ-সভাপতি এবং পাটকল ট্রেড ইউনিয়নের আন্তর্জাতিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বাংলা ১৩৫০ সালে চাঁদপুরের মতলবে তাঁর জন্ম। সপ্তম শ্রেণিতে পড়াকালেই ছাত্র ইউনিয়নের পতাকাতলে যুক্ত হন। ১৯৬৮ সালে ঢাকা কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে এইচএসসি পাস করে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে। ছাত্ররাজনীতিতে সম্পূর্ণভাবে আত্মনিয়োগ করায় অভিভাবকেরা তাঁকে সংগঠন থেকে দূরে সরাতে বিয়ের ব্যবস্থা করেন।
কিন্তু বিয়ের রাতেই তিনি চাঁদপুর ছেড়ে কেন্দ্রীয় সম্মেলনে যোগ দিতে চলে আসেন। ১৯৭৩-৭৪ সালে কেন্দ্রীয় সংসদের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক নির্বাচিত হন। উচ্চশিক্ষা সমাপ্ত করে শ্রমিকশ্রেণির মুক্তির লক্ষ্যে ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র ও কমিউনিস্ট পার্টিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। কেবল বিপ্লবের স্লোগানে নয়, বাস্তব সংগঠন ও আন্দোলন গড়ে তুলতেই তিনি আদমজীর শ্রমিকপল্লীতে এক দশক কাটিয়েছেন। তাজুল ইসলাম ও তাঁর সহযোদ্ধাদের নিরলস প্রচেষ্টায় স্বৈরাচারী এরশাদের বিরুদ্ধে শ্রমিকসমাজ আন্দোলনের প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়।
শ্রমিক আন্দোলনের সেই উজ্জ্বল সময়ে আদমজীসহ ঢাকার বিস্তীর্ণ শ্রমিকাঞ্চলে তাজুল হয়ে ওঠেন স্বৈরাচারী এরশাদশাহীর অন্যতম আতঙ্ক। ১৯৮৪ সালের ১ মার্চ শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ) দাবি আদায়ে হরতালের ডাক দেয়। হরতাল সফল করার সব প্রস্তুতি শেষে বাড়ি ফেরার পথে স্বৈরশাসকের পেটোয়া বাহিনী তাঁর উপর হামলে পড়ে। রাতের অন্ধকারে ঝরে যায় বিপ্লবের এই লাল ফুল। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় তিনি রেখে যান সংগ্রামের অমর আহ্বান।
তাঁর আত্মদান ও আদর্শের প্রতি অটল অঙ্গীকার ছাত্র ইউনিয়নের চেতনাকে উচ্চাসনে আসীন করেছে। তিনি দেখিয়ে গেছেন, বিপ্লবী ধারার ছাত্র আন্দোলনই পারে কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি মানুষের মুক্তির পথ নির্মাণ করতে। নীল পতাকার সেই অকুতোভয় সৈনিক, বিপ্লবের লাল ফুল—তাজুল ইসলাম, তোমাকে জানাই সংগ্রামী অভিবাদন। তোমার আদর্শ বাংলার ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ুক; তোমার রক্তরাঙা পতাকা হাতে নিয়ে আমরা এগিয়ে চলি নিরন্তর।