15/01/2026
এক সময় ইয়েমেনের রাজত্ব দীর্ঘকাল ধরে নিজ জনগণের হাতেই স্থিতিশীলভাবে টিকে ছিল। বাইরের কোনো শক্তি সেখানে চোখ তুলে তাকানোর সাহস পেত না। লোভ ছিল না। কোনো আগ্রাসনও ছিল না।
কিন্তু সময় তো আর সব সময় এক থাকে না। সেই নীতিতে একসময় এমন এক যুগ এল, যখন ইয়েমেনের ওপর হাবশিদের(আবিসিনিয়ার) প্রভাব পড়তে শুরু করল। সে সময় পারস্যের সম্রাট ছিলেন কিসরা আনুশিরওয়ান।
ইতিহাসবিদ হিশাম ইবন মুহাম্মদ বলেন—ইয়েমেনে হাবশিদের প্রবেশের মূল কারণ ছিলেন সে সময়কার ইয়েমেনের রাজা যু নুওয়াস আল-হিমইয়ারি। তিনি ছিলেন ইহুদি ধর্মের।
একদিন নাজরানের এক দাউস নামক ইহুদি ব্যক্তি রাজা যু নুওয়াসের দরবারে এসে হাজির হলো। সে অভিযোগ করল, নাজরানের খ্রিস্টানরা অন্যায়ভাবে তার দুই মেয়েকে হত্যা করেছে। সে রাজার কাছে বিচার ও প্রতিশোধ চাইল।
এই কথা শুনে যু নুওয়াস ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলেন। তার ভেতরে ধর্মীয় পক্ষপাত জেগে উঠল। তিনি নিজের ধর্মের লোকদের রক্ষার নামে সেনাবাহিনী নিয়ে নাজরানের দিকে রওনা হলেন। সেখানে পৌঁছে তিনি ভয়াবহ হামলা চালালেন। সাধারণ মানুষের ওপর চালানো হলো নির্মম নির্যাতন ও ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ।
এই গণহত্যা থেকে নাজরানের এক লোক কোনোভাবে প্রাণে বেঁচে যায়। সে পালিয়ে হাবশার রাজা নাজ্জাশির কাছে পৌঁছে যায়। নিজের জাতির ওপর চালানো নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের সব বিবরণ সে খুলে বলে। প্রমাণ হিসেবে সঙ্গে নিয়ে যায় একটি ইনজিলের কপি, যার কিছু অংশ আগুনে পুড়ে গিয়েছিল।
সব শুনে নাজ্জাশি বললেন—আমার কাছে সৈন্যের অভাব নেই, কিন্তু সমুদ্র পার হওয়ার মতো জাহাজ নেই। আমি রোমের সম্রাট কায়সারের কাছে চিঠি লিখব, যেন তিনি আমাদের জাহাজ পাঠান। তিনি কায়সারের কাছে চিঠি লিখলেন এবং সেই পোড়া ইনজিলটিও প্রমাণ হিসেবে পাঠালেন।
কায়সার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখলেন এবং বহু জাহাজ পাঠিয়ে দিলেন। নাজ্জাশি সেই জাহাজে সত্তর হাজার হাবশি সৈন্য পাঠালেন। তাদের প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত করলেন আরইয়াত নামের এক ব্যক্তিকে। তাকে তিনি নির্দেশ দিলেন—ইয়েমেন জয় করলে—এক-তৃতীয়াংশ পুরুষকে হত্যা করবে, এক-তৃতীয়াংশ দেশ ধ্বংস করবে, আর এক-তৃতীয়াংশ নারী ও সন্তানকে বন্দি করে নিয়ে আসবে।
এই বিশাল বাহিনীর মধ্যেই ছিল এক সেনা। নাম তার আবরাহা আল-আশরাম। হাবশি বাহিনী সমুদ্র পাড়ি দিয়ে ইয়েমেনের দিকে রওনা হলো। যখন যু নুওয়াস এই সংবাদ পেলেন, তিনি হিমইয়ার গোত্রসহ ইয়েমেনের অন্যান্য গোত্রকে একত্র করলেন এবং যুদ্ধের প্রস্তুতি নিলেন। দুই বাহিনীর মধ্যে ভয়াবহ যুদ্ধ শুরু হলো।
শেষ পর্যন্ত যু নুওয়াস পরাজিত হলেন।
এদিকে আরইয়াত ও তার বাহিনী বিজয়ীর বেশে ইয়েমেনে প্রবেশ করল। পরাজয় ও ধ্বংস দেখে যু নুওয়াস গভীর হতাশায় ডুবে গেলেন। তিনি নিজের ঘোড়া ঘুরিয়ে সমুদ্রের দিকে ছুটলেন। ঘোড়াকে সাগরে নামালেন। গভীর জলে ঢুকে পড়লেন এবং শেষ পর্যন্ত ডুবে মারা গেলেন। এভাবেই তার জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটল।
আরইয়াত ইয়েমেনে ঢুকে নাজ্জাশির আদেশ বাস্তবায়ন করল—এক-তৃতীয়াংশ পুরুষ হত্যা করা হলো, এক-তৃতীয়াংশ দেশ ধ্বংস করা হলো, আর এক-তৃতীয়াংশ নারী ও সন্তানকে বন্দি করে নাজ্জাশির কাছে পাঠানো হলো।
এরপর আবরাহা-কে সানা নগরী ও ইয়েমেনের অন্যান্য অঞ্চলের শাসক নিযুক্ত করা হলো। কিন্তু আবরাহা নাজ্জাশির কাছে কোনো খাজনাই পাঠাল না।
এই খবর নাজ্জাশির কানে পৌঁছালে তিনি বুঝলেন—আবরাহা বিদ্রোহ করেছে এবং নিজেই শাসন শুরু করেছে।
তিনি আবার সেনাবাহিনী পাঠালেন। নেতৃত্বে আবারও আরইয়াত। উদ্দেশ্য, আবরাহাকে দমন করা। আরইয়াত সানার কাছাকাছি পৌঁছালে আবরাহা তাকে একটি চিঠি লিখল—"তুমি আর আমি এক। আমাদের ধর্ম এক, দেশ এক। আমাদের উচিত নিজেদের দেশ ও ধর্মের কল্যাণ নিয়ে ভাবা। চাও তো আমরা দু’জন দ্বন্দ্বযুদ্ধে নামি। যে জিতবে, রাজত্ব তার হবে। এতে হাবশিদের রক্তপাত হবে না।"
আরইয়াত এতে রাজি হয়ে গেল। কিন্তু আবরাহা ভেতরে ভেতরে বিশ্বাসঘাতকতার পরিকল্পনা করেছিল। সে তার এক দাস আরাঞ্জাদা'কে গোপনে একটি গর্তে লুকিয়ে রাখল। যুদ্ধ শুরু হলে আরইয়াত প্রথমে বর্শা নিক্ষেপ করল। বর্শা আবরাহার মাথা এড়িয়ে তার নাকে আঘাত করল। নাক কেটে গেল, চিরে গেল। এই ঘটনার পর থেকেই তার নাম হয়ে গেল—আবরাহা আল-আশরাম (কাটা নাকওয়ালা আবরাহা)।
ঠিক তখনই গর্ত থেকে বেরিয়ে এসে আরাঞ্জাদা এক আঘাতে আরইয়াতকে হত্যা করল। আবরাহা তখন তাকে বলল—'তুমি যা চাও, চাইতে পারো।'
আরাঞ্জাদা বলল—'আমি চাই ইয়েমেনের কোনো নারী তার স্বামীর কাছে যাওয়ার আগে আমার কাছে আসুক।'
আবরাহা সেই ঘৃণ্য দাবি মেনে নিল। কিছুদিন সে এই অমানবিক কাজ চালিয়ে গেল। শেষ পর্যন্ত ইয়েমেনের মানুষ বিদ্রোহ করে আরাঞ্জাদাকে হত্যা করল।
তখন আবরাহা ইয়েমেনবাসীদের বলল—'এখন তোমাদের মুক্ত হওয়ার সময় এসেছে।'
আরইয়াত নিহত হওয়ার খবর নাজ্জাশির কাছে পৌঁছালে তিনি শপথ করলেন—'আমি শান্ত হব না, যতক্ষণ না আবরাহার রক্ত ঝরাই।'
এই খবর পেয়ে আবরাহা নাজ্জাশির কাছে একটি চিঠি লিখল—'হে বাদশাহ, আরইয়াত আপনারই দাস ছিল, আমিও আপনার দাস। সে আপনার রাজত্ব দুর্বল করতে চেয়েছিল এবং আপনার সৈন্যদের ধ্বংস করতে চেয়েছিল। আমি তাকে যুদ্ধ বন্ধ করতে বলেছিলাম, যাতে আপনার কাছে দূত পাঠাতে পারি। কিন্তু সে যুদ্ধ ছাড়া কিছুই মানেনি। আমি যুদ্ধ করেছি এবং জয়ী হয়েছি। আমার শাসন আপনার জন্য; নিজের জন্য নয়। আমি শুনেছি আপনি শপথ করেছেন—আমার রক্ত ঝরাবেন ও আমার দেশ ধ্বংস করবেন। তাই আপনার শপথ পূর্ণ করার জন্য আমি আমার রক্তের একটি শিশি এবং আমার দেশের মাটির একটি থলে পাঠালাম। আমার উপর আপনার অনুগ্রহ বজায় রাখুন। আমি আপনারই দাস। আমার সম্মান আপনার সম্মান থেকেই।
চিঠি পড়ে নাজ্জাশি সন্তুষ্ট হলেন। তিনি আবরাহাকে ক্ষমা করলেন এবং ইয়েমেনের শাসক হিসেবে বহাল রাখলেন।
📚 সূত্র: ইমাম আবুল ফারাজ ইবনুল জাওজি (রহ.)
আল-মুনতাযাম ফি তারিখিল মুলুক ওয়াল উমাম
খণ্ড: ২