08/06/2026
এআই-নির্মিত কৃত্রিম ছবি/ভিডিওর পরিচিতি
প্রকাশ বাধ্যতামূলক না করলে সামনেই মহাবিপদ!
---------------------------------------------------------------
কয়েক বছর আগেও একটি ছবি বা ভিডিওকে সত্যের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ হিসেবে ধরা হতো। “ভিডিও আছে”, “ছবি আছে”- এই দুটি বাক্যই কোনো ঘটনার সত্যতা প্রতিষ্ঠার জন্য প্রায় যথেষ্ট ছিল। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত অগ্রগতির ফলে আমরা এমন এক বাস্তবতায় এসে দাঁড়িয়েছি, যেখানে চোখে দেখা জিনিসও আর নির্ভরযোগ্য নয়। এখন একটি ভিডিও দেখেও নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন হয়ে পড়ছে- এটি বাস্তব, নাকি নিখুঁতভাবে নির্মিত একটি ডিজিটাল প্রতারণা।
এআই-নির্মিত ছবি ও ভিডিও প্রযুক্তি দিন দিন এমন পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে যে, অনেক ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদেরও ফরেনসিক বিশ্লেষণের সাহায্য নিতে হচ্ছে আসল ও নকলের পার্থক্য নির্ণয়ের জন্য। একজন মানুষের মুখ, কণ্ঠস্বর, অঙ্গভঙ্গি কিংবা আবেগ- সবকিছু এত নিখুঁতভাবে অনুকরণ করা সম্ভব হচ্ছে যে, সাধারণ মানুষের পক্ষে বিভ্রান্ত হওয়া প্রায় অনিবার্য।
এই পরিস্থিতিতে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এসেছে- মানুষ কীভাবে বুঝবে কোনটি বাস্তব আর কোনটি কৃত্রিম? পথ একটাই- আইন করে বাধ্যতামূলকভাবে এআই-নির্মিত ছবি ও ভিডিওর উপর স্পষ্ট ও দৃশ্যমানভাবে উল্লেখ করা যে এটি একটি কৃত্রিমভাবে তৈরি কনটেন্ট। এই প্রদর্শনীটাও এমন সুস্পষ্টভাবে হতে হবে, যাতে একজন সাধারণ মানুষও প্রথম দেখাতেই বুঝতে পারেন- এটি বাস্তব দৃশ্য নয়, বরং প্রযুক্তির মাধ্যমে নির্মিত একটি উপস্থাপনা। আর কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে সেই পরিচয় গোপন করে মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে, তাহলে তার বিরুদ্ধে থাকা দরকার কঠোর আইনগত ব্যবস্থার বিধান।
আমরা এমন এক যুগে প্রবেশ করেছি যেখানে কয়েক সেকেন্ডের একটি ভুয়া ভিডিও দিয়েই একজন মানুষকে অপরাধী, দুর্নীতিবাজ, রাষ্ট্রবিরোধী কিংবা সামাজিকভাবে ঘৃণিত ব্যক্তিতে পরিণত করা সম্ভব হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে একটি মিথ্যা ভিডিও কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। পরে সেটি মিথ্যা প্রমাণিত হলেও যে মানসিক, সামাজিক বা পেশাগত ক্ষতি হয়ে যায়, তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আর পূরণ করা সম্ভব হয় না।
এআই-নির্মিত কৃত্রিম কন্টেন্ট ও প্রকৃত কন্টেন্ট আলাদা করতে না পারার বিপদ এখন আর শুধু ব্যক্তি পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই। বিচারব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা, সামাজিক সম্প্রীতি এমনকি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপরও এটি গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। আমরা এখন হরহামেশাই দেখে থাকি- বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সরকারি কর্মকর্তা বা ধর্মীয় নেতার নামে কৃত্রিম ভিডিও বানিয়ে সেটা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, যেখানে তাকে এমন কিছু বলতে বা করতে দেখা যাচ্ছে যা তিনি কখনোই বলেননি বা করেননি। ইতোমধ্যে এই এআই নির্মিত ভুয়া ভিডিও গুজব ছড়ানো ও ব্যক্তির চরিত্র হননের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠেছে। বাস্তবতা এটাই যে, মানুষ নিজের চোখকে কানের চেয়ে বেশি বিশ্বাস করে।
আমাদের দেশের প্রধানত রক্ষণশীল ও অসচেতন সমাজ কাঠামোতে নারীদের ক্ষেত্রে এসব ভিডিওর প্রভাব আরো ভয়াবহ, আরো বিস্তৃত। যদি কোনো মেয়েকে নিয়ে কৃত্রিম ভিডিও বানিয়ে সমাজমাধ্যমে ছেড়ে দেওয়া হয়, তখন আমাদের দেশের অসচেতন সামাজিক ব্যবস্থা কোনো রকম বাছবিচার ছাড়াই সেটাকে কথিত 'ভাইরাল' করে দেয়। সবাই বুঝে,না বুঝে এমনভাবে নিন্দামন্দ করতে থাকে যে, রক্ষণশীল সামাজিক বাস্তবতায় পরিস্থিতির শিকার নারীর বেঁচে থাকাই দায় হয়ে পড়ে।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই প্রযুক্তি প্রতারণার নতুন নতুন পথ খুলে দিয়েছে। ব্ল্যাকমেইল, চাঁদাবাজি, সাম্প্রদায়িক উসকানি- সবকিছুর জন্যই এআই-নির্মিত কনটেন্ট এখন কার্যকর একটি অস্ত্র। অতীতে গুজব ছড়াত মুখে মুখে বা লেখার মাধ্যমে; এখন তা ছড়ায় ভিডিওর ভাষায়, যা মানুষের মনকে অনেক দ্রুত প্রভাবিত করে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যেই এআই-নির্মিত কনটেন্ট চিহ্নিতকরণ এবং ডিপফেক নিয়ন্ত্রণে আইন ও নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। কারণ তারা উপলব্ধি করেছে, প্রযুক্তির বিকাশকে থামানো সম্ভব নয়, কিন্তু তার অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বজায় রেখেও প্রযুক্তির স্বচ্ছ ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব- যদি সঠিক আইনি কাঠামো তৈরি করা যায়। আমাদের দেশেও অবিলম্বে এমন সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়ন ও যথাযথ প্রয়োগ অতীব প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যথায় এআই-নির্মিত ভিডিও/ছবির মাধ্যমে সৃষ্ট সামাজিক বিশৃঙ্খলা যে অবিলম্বে সীমা ছাড়াবে, এটা বলাই বাহুল্য।
অবশ্যই এআই কোনো সমস্যা নয়। শিল্প, শিক্ষা, গবেষণা, বিনোদন কিংবা সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে এআই অসাধারণ সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। সমস্যা প্রযুক্তিতে নয়; সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন প্রযুক্তিকে ব্যবহার করা হয় মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য, মিথ্যাকে সত্যের রূপ দেওয়ার জন্য, কিংবা প্রতারণাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার জন্য।
এআই-নির্মিত ছবি ও ভিডিওতে বাধ্যতামূলক ওয়াটারমার্ক ও দৃশ্যমান ঘোষণা অন্তর্ভুক্ত করা দরকার যে, এটি একটি এআই-নির্মিত ছবি/ভিডিও। এবং এর ব্যতিক্রম কিছু করলে কঠোর শাস্তির বিধান এখন সময়ের দাবি। এটি প্রযুক্তির বিরুদ্ধে কোনো অবস্থান নয়; বরং প্রযুক্তিকে দায়িত্বশীল ও জবাবদিহিমূলক ব্যবহারের পক্ষে অপরিহার্য পদক্ষেপ।
শঙ্কা প্রযুক্তির অগ্রগতিকে নিয়ে নয়; বরং সত্যকে চিনে রাখার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলাটাই আগামীর দুনিয়ায় অন্যতম চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে। প্রযুক্তি যত উন্নত হবে, সত্য ও মিথ্যার মধ্যকার সীমারেখা ঝাপসা হয়ে ওঠার বিপদও ততই বাড়বে। সামাজিক মাধ্যমসহ প্রযুক্তির অদক্ষ ও অসচেতন ব্যবহারকারীতে ভরা আমাদের দেশের ক্ষেত্রে এই বিপদের শঙ্কা পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় দৃশ্যতঃ অনেক অনেক বেশি। আর এর সুযোগ নিয়ে মিথ্যের বেসাতি করে ক্রমবর্ধমান হারে সমাজকে অস্থির ও বিশৃঙ্খল করে তুলতে পারে স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী। আইন প্রণয়ন করে এআই-নির্মিত কৃত্রিম কন্টেন্টের পরিচয় দৃশ্যমানভাবে প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক না করলে বড় সামাজিক বিশৃঙ্খলাই আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।..........................................................
© শামীম আনোয়ার
এডিশনাল স্পেশাল এসপি (সিআইডি)
সিআইডি হেডকোয়ার্টার্স, মালিবাগ, ঢাকা।