15/03/2017
পৃষ্ঠটান (ইংরেজি: Surface Tension) হল প্রবাহীর পৃষ্ঠের একটি স্থিতিস্থাপক প্রবণতা, যা তার উপরিতলকে সম্ভাব্য সর্বনিম্ন ক্ষেত্রফল প্রদান করে। পৃষ্ঠটানের জন্যই কিছু কীট, যাদের দেহের ঘনত্ব জল অপেক্ষা অনেক বেশি, তারা জলের উপরিতলে ভাসমান থাকতে পারে আর হেঁটে যেতে পারে।
সাবানের ফেনা দিয়ে পৃষ্ঠটানের একটি পরীক্ষা।
তরল ও গ্যাসের সংযোগস্থলে, তরল অণুগুলির পরস্পরের প্রতি আকর্ষণ (সংসক্তি টানের জন্য), তরল ও গ্যাসের অণুগুলির আকর্ষণ (আসঞ্জন টানের জন্য) অপেক্ষা অনেক বেশি হওয়ায় পৃষ্ঠটান সংঘটিত হয়। তরলপৃষ্ঠের নীচে অভ্যন্তরীণ বলসমূহের লব্ধি বল এমনভাবে ক্রিয়া করে, যেন তরলের উপরিতল কোনো টান করা স্থিতিস্থাপক পর্দা দ্বারা আবৃত রয়েছে। এই অসম লব্ধি বলের কারণেই তরল পৃষ্ঠে সংকোচনশীল টান প্রযুক্ত হয়, সেই কারণেই সম্ভবত একে ‘পৃষ্ঠটান’ বলা হয়।[১] অন্যান্য তরলের থেকে জলের অণুগুলির হাইড্রোজেন বন্ধন উচ্চমানের হয় (২০° সে. উষ্ণতায় ৭২.৮ মিলিনিউটন প্রতি মিটার)।
পৃষ্ঠটানে বল প্রতি একক দৈর্ঘ্যে কিংবা প্রতি বর্গ-একক ক্ষেত্রফল প্রযুক্ত হতে পারে। এই দুই প্রকার বল বাস্তবে একই, কিন্তু প্রতি বর্গ-একক ক্ষেত্রফল প্রযুক্ত হলে, এই বলকে পৃষ্ঠশক্তি বলা হয়। পৃষ্ঠশক্তি আবার কঠিনের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য হতে পারে।
বস্তুবিজ্ঞানে পৃষ্টটানকে পৃষ্ঠ পীড়ন বা মুক্ত পৃষ্ঠশক্তি নামেও অভিহিত করা হয়।
কারণ ::
তরল অণুগুলোর উপরে প্রযুক্ত বলসমূহের চিত্র।
তরলের অণুগুলির মধ্যে পারস্পরিক সংসক্তি বলই পৃষ্ঠটান বিষয়টির জন্য দায়ী। নির্দিষ্ট আয়তনের তরলের অভ্যন্তরস্থ প্রতিটি অণু তার পরিপার্শ্বে থাকা সমস্ত অণুর দ্বারা সবদিক থেকে সমানভাবে আকর্ষিত হয়, ফলে লব্ধি বলটি শূন্য হয়। কিন্তু, তরলের মুক্তপৃষ্ঠে থাকা অণুগুলির পরিপার্শ্বে সব জায়গায় তরল অণু ঘিরে থাকে না, সেই জন্য ওই অণুগুলি নীচের দিকে আকর্ষিত হয়। এর ফলে একটি অভ্যন্তরীণ চাপের উৎপত্তি ঘটে এবং তরল অণুগুলি সম্ভাব্য সর্বনিম্ন ক্ষেত্রফল ধারণ করতে বাধ্য হয়।
তরলের ফোঁটার বিশেষ আকৃতির জন্যও পৃষ্ঠটান দায়ী। যদিও তরলের নির্দিষ্ট আকৃতি নেই, তবুও পৃষ্ঠতলের অসম সংসক্তি বলের কারণে জলের ফোঁটাগুলোর গোলকাকার আকার ধারণের প্রবণতা দেখা যায়। অভিকর্ষ সহ অন্যান্য সকল পারিপার্শ্বিক বল অনুপস্থিত থাকলে, সমস্ত তরল পদার্থের ফোঁটাই প্রায় গোলাকার আকৃতি ধারণ করবে। ল্যাপলেসের নীতি অনুযায়ী, এই গোলাকার আকৃতি মুক্তপৃষ্ঠের প্রয়োজনীয় ‘পৃষ্ঠ পীড়ন’কে হ্রাস করতে সাহায্য করে।
পৃষ্ঠটানের জন্য পেপার ক্লিপটি জলে ডুবে যায় না।
পৃষ্ঠটানের কারণ ব্যাখ্যার আরেকটি উপায় হল শক্তির পরিপ্রেক্ষিতে দেখা। অণুটির সাথে পরিপার্শ্বের বাকি অণুর সংযোগ না থাকলে, তা যে শক্তিস্তরে থাকে, পরিপার্শ্বের সাথে সংযুক্ত থাকা অণু তার চেয়ে কম শক্তিস্তরে থাকে। তরলের অভ্যন্তরে থাকা অণুগুলিকে ঘিরে অসংখ্য অণু থাকতে পারে, কিন্তু মুক্তপৃষ্ঠে থাকা অণুগুলির চারপাশে কম সংখ্যক অণু থাকে (অভ্যন্তরের অণুগুলির তুলনায়), তাই বহিস্থ অণুগুলোর স্থিতিশক্তি বেশি হয়। তরলের শক্তিস্তর সর্বনিম্ন করতে হলে (বা স্থায়িত্ব পেতে হলে) তরলের মুক্তপৃষ্ঠে উচ্চ শক্তিসম্পন্ন অণুর সংখ্যা কমাতে হবে। আর মুক্তপৃষ্ঠে থাকা অণুর পরিমাণ কমালে পৃষ্ঠের ক্ষেত্রফলও হ্রাস পাবে।[২] এই পৃষ্ঠ-ক্ষেত্রফল সংকোচনের ফলে, পৃষ্ঠতলটি সবচেয়ে মসৃণ ও টান-টান আকার ধারণ করার চেষ্টা করে (ইউলার-ল্যাংরেঞ্জের সমীকরণ থেকে গাণিতিক ভাবে প্রমাণ করা যায়, ‘মসৃণ’ আকারের পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রফল সর্বনিম্ন হয়)। পৃষ্ঠতলের আকারে কোনো বক্রতা তৈরি হলেই তার স্থিতিশক্তি বৃদ্ধি পায়। অতএব, সেই বক্রতা কমানোর জন্য পৃষ্ঠতল নেমে যায়, ঠিক যেভাবে একটি বলকে ওপরে ছুঁড়ে দিলে অভিকর্ষীয় স্থিতিশক্তি কমানোর জন্য তা নীচে নেমে আসে।
পৃষ্ঠটানের প্রভাব ::
জল :::
পৃষ্ঠটান জলের ওপরে অনেক প্রভাব বিস্তার করে:
ক. মোমের মতো পিচ্ছিল আবরণ যুক্ত তলে (গাছের পাতা) বৃষ্টির জল মুক্তোর মতো ক্ষুদ্র আকার নেয়। জল মোমের সাথে দুর্বলভাবে আকর্ষিত হয়, কিন্তু নিজের অণুর সাথে দৃঢ় সংঘবদ্ধ থাকে। তাই জল ছোটো ছোটো বিন্দুর আকারে ভেঙে যায়। পৃষ্ঠটান এদের গোলাকার আকার দিতে সাহায্য করে, কারণ সমান আয়তনের ক্ষেত্রে গোলক পৃষ্ঠের ক্ষেত্রফল সবচেয়ে কম হয়।
খ. জলের ভর প্রসারিত হলে জলবিন্দুর সৃষ্টি হয়। অ্যানিমেশনে দেখানো হয়েছে, জল ততক্ষণ নলটির সাথে আটকে থাকে, যতক্ষণ না তার ভর প্রসারিত হতে হতে এমন অবস্থায় পৌঁছয়, যে অবস্থায় পৃষ্ঠটান জলকে নলের সাথে আটকে রাখতে সক্ষম হয়। তখন এটা মুক্ত হয় আর পৃষ্ঠটানের জন্য গোলাকার আকৃতি ধারণ করে। নল থেকে জলের প্রবাহ চালালে, তা নীচে পড়ার সময় অসংখ্য জলকণায় পরিণত হবে। অভিকর্ষ জলের প্রবাহকে নীচে টেনে আনে, আর পৃষ্ঠটান তাকে ভেঙে জলকণায় পরিণত করে।[৩]
গ. জলের চেয়ে বেশি ঘনত্বযুক্ত বস্তুর জলে ভেসে চলাও পৃষ্ঠটানেরই ফলাফল। তবে এটা তখনই ঘটবে, যখন সেই বস্তুর ওজন এতটাই নগণ্য হয় যে, পৃষ্ঠটান জনিত বল সেই ওজনকে সহ্য করতে সক্ষম হয়। উদাহরণ হিসেবে, কিছু পোকা পৃষ্ঠটানকে কাজে লাগিয়ে পুকুরের জলের উপর দিয়ে হেঁটে যেতে পারে। পোকাটির পা’গুলির ভারের নগণ্যতার জন্য পায়ের অণু আর জলের অণুর কোনো আকর্ষণ থাকে না, তাই যখন জলের মধ্যে পা’টি ফেলা হয়, পৃষ্ঠটান কেবল জলে পায়ের জন্য সৃষ্ট বক্রতাকে মসৃণ করার চেষ্টা করে। অর্থাৎ জল পোকাটিকে উপরে ঠেলে দেয় যাতে সেটা জলের মুক্ততলের ওপরে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। এই অবস্থায় জল পোকার ভার বহন করতে পারে। এক্ষেত্রে জলতল একটি স্থিতিস্থাপক পর্দার মতো কাজ করে। পোকাটির পায়ের চাপে জলের পৃষ্ঠতলে খাঁজের সৃষ্টি হয় বা পৃষ্ঠতল সামান্য অবনমিত হয়,[৪] আর পৃষ্ঠতলের বক্রতা (তথা ক্ষেত্রফল) সংকোচনের প্রবণতার জন্য জল পোকার পা’টিকে উপরে ঠেলে দেয়।
ঘ. আলাদা দুটি তরলের মুক্তপৃষ্ঠের টানের তারতম্যের জন্য জল ও তেলের পৃথকীকরণ (ছবিতে জল ও তরল মোম) সম্ভব হয়। এর জন্যও দায়ী পৃষ্ঠটান।
ঙ. অ্যালকোহলীয় পানীয় রাখা কোনো পাত্রের দেয়ালে তরলের বিন্দু ও ধীর প্রবাহকে ‘টিয়ার্স অফ ওয়াইন’ বা ‘ওয়াইনের অশ্রু’ বলে। জল ও ইথানলের পৃথক পৃষ্ঠটানের মধ্যে জটিল মিথষ্ক্রিয়ায় এটি ঘটে; জল ও উদ্বায়ী ইথানলের মিশ্রিত পৃষ্ঠটান এর জন্য দায়ী।
পৃষ্ঠতল সক্রিয় পদার্থ সম্পাদনা
পৃষ্ঠতল সক্রিয় পদার্থ (surfactant) ব্যবহার করলে তরলের পৃষ্ঠটান উল্লেখযোগ্য ভাবে হ্রাস পায়, তখন পৃষ্ঠটানের প্রমাণ পাওয়া যায়:
সাবানের বুদবুদের ভর অত্যন্ত কম হয়, কিন্তু সেই তুলনায় পৃষ্ঠের ক্ষেত্রফল অনেক বেশি হয়। বিশুদ্ধ জলে বুদবুদগুলো অস্থায়ী। পৃষ্ঠতল সক্রিয় পদার্থ যোগ করলে বুদবুদগুলোকে স্থিতিশীল করা সম্ভবপর হয় (ম্যারাঙ্গোনি প্রভাব)। আসলে ওই জাতীয় পদার্থ জলের পৃষ্ঠটান তিনগুণ বা তারও বেশি কমিয়ে দেয়।
‘এমালশন’ হল এক ধরনের কলয়েড জাতীয় দ্রবণ, যেখানে পৃষ্ঠটান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশুদ্ধ জলে তেলের অতি ক্ষুদ্র ফোঁটা বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে দিলে ফোঁটাগুলি অনায়াসেই একজোট হয়ে অধিক ভর সৃষ্টি করে। কিন্তু পৃষ্ঠতল সক্রিয় পদার্থের উপস্থিতিতে পৃষ্ঠটান হ্রাস পায়, ফলস্বরূপ জলে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র তেলের ফোঁটা পৃথক্ভাবে ভাসমান থাকে।