18/05/2026
সৃষ্টি নিখুঁত..... জীবদেহ নিখুঁতের মিথ
মানুষের ডিজাইনে কিছু মারাত্মক ত্রুটি!
© অলোক সরাক
আমাদের মানুষদের “সৃষ্টি” কে নিখুঁত ভাবার বাতিক আছে!
গ্রিকরা গাণিতিকভাবে নিখুঁত দেহের প্রতি অবসেসড ছিল, কিন্তু সৃষ্টি মোটেই নিখুঁত নয়, মানুষের শরীরে ডিজাইনের প্রচুর ত্রুটি আছে, কারণ পিছনে কোন “বুদ্ধিমান ডিজাইনার” নেই, বরং বিবর্তন আমাদের দেহকে কোনরকমে জোড়াতালি দিয়ে প্রাকৃতিক নির্বাচনের প্রতি ফিট বা মানানসই করেছে মাত্র।
এইসব ডিজাইন ফ্ল বা ত্রুটি না থাকলে মানুষ অনেক দীর্ঘ ও আরামদায়ক জীবনযাপন করত।
প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরিক নৃবিজ্ঞানী অ্যালান মানের কথায় "বিবর্তন পরিপূর্ণতা তৈরি করেনা, বরং জোড়াতালি দিয়ে কাজ চালানোর মত করে প্রাকৃতিক নির্বাচনের প্রতি ফিট করে মাত্র"
মানুষের শরীরের কয়েকটি বহুল পরিচিত ডিজাইন ফ্ল বা ত্রুটি -
বেদনাদায়ক অস্বস্তিকর মেরুদণ্ড: বর্তমানে মানুষের মেরুদণ্ড একটি জগাখিচুড়ি! আমাদের অমানব পূর্বপুরুষদের মেরুদণ্ড ধনুকের মতো খিলান তৈরি করে নীচে ঝুলে থাকা অঙ্গগুলির ওজন সহ্য করার জন্য বিবর্তিত হয়েছিল, কারণ আমাদের পূর্বপুরুষরা অতীতে হাতে-পায়ে হামাগুড়ি দিয়ে চলাফেরা করত, পরের স্টেজে সামনের দিকে ঝুঁকে হাঁটত, তখন সব ঠিক ছিল, কিন্তু তারপর আমরা উঠে দাঁড়ালাম, ফলে মেরুদণ্ড একটি কলামে পরিণত হতে বাধ্য হল, এই পরিবর্তনটি নিম্ন কশেরুকার উপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে, যার ফলে কশেরুকার মাঝে থাকা ডিস্ক স্লিপ হয় এবং বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পিঠে ব্যথা শুরু হয়, ভারী ওজন তুললে কম বয়সেই মেরুদন্ড নষ্ট হয়ে যায়।
চারপেয়ে প্রাণিদের জীবনে এই সমস্যা নেই। তাই মানুষের বার্ধক্যে হাড়ের ক্ষয়, পিঠ, কোমরে ব্যথা অত্যন্ত সাধারণ।
অনমনীয় হাঁটু: মানুষের শরীরের সবচেয়ে জটিল জয়েন্টটির ডিজাইনে মারাত্মক ভুল! হাঁটু শুধুমাত্র দুটি দিকে ঘোরে, সামনে এবং পিছনে। এই জয়েন্টটি যদি কাঁধ এবং নিতম্বের মতো বল-সকেট দিয়ে তৈরি হত, তাহলে তাড়াতাড়ি হাঁটুর হাড় ক্ষয়ে গিয়ে ব্যথা হত না।
আবার দুই পায়ে দাঁড়ানোর কারণে হাঁটুতে অত্যধিক চাপ পড়ে, ফলে জঙ্ঘা ও পায়ের জয়েন্ট ভঙ্গুর, লিগামেন্ট ছিঁড়ে যাওয়ার ভয় থাকে, আর্থ্রাইটিস হয়।
সরু পেলভিস: এই ডিজাইন ভুলের জন্য মানব নারীদের প্রবল প্রসব বেদনা সহ্য করতে হয়, আমাদের বড় মস্তিষ্ক ও সরু পেলভিস হওয়ার জন্য এটা হয়, নারীদের শ্রোণির প্রস্থ প্রায় ২ লক্ষ বছর ধরে পরিবর্তিত হয়নি।
পুরুষদের শরীরের বাইরে ঝুলন্ত অণ্ডকোষ: মানুষের এই গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গটি শরীরের বাইরে ঝুলে থাকে, যার ফলে আঘাতের প্রতি অসহায়।
ঘন সারিবদ্ধ দাঁত: যখন বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মস্তিষ্ক প্রসারিত হয়, তখন চোয়ালটি আরও ছোট হয়ে যায়, ফলে দাঁতগুলি কাছাকাছি এসে যায়, বিশেষ করে পেষাই দাঁত গুলির মাঝে খুব পাতলা ফাঁকে খাবার জমে, ফারমেন্টেশন হয়ে অ্যাসিড তৈরি হয়, যত্ন না নিলে দাঁত নষ্ট হয়, আরেকটি সমস্যা হল, সবচেয়ে দূরবর্তী মোলার দাঁতের জন্য কোন জায়গা অবশিষ্ট থাকে না, ফলে "আক্কেল দাঁত" বেরোনোর সময় ব্যথা হয়।
প্যাঁচানো ধমনী: মানুষের বাহু এবং পায়ে একটি করে প্রধান ধমনী দিয়ে রক্ত সরবরাহ হয়, যা শরীরের সামনের দিকে বাইসেপস বা হিপ ফ্লেক্সর দিয়ে প্রবেশ করে, ফলে পিছনের দিকের ট্রাইসেপস এবং হ্যামস্ট্রিং টিস্যুতে রক্ত সরবরাহ করতে হাড়ের চারপাশে বৃত্তাকার পথ ধরতে হয় এবং স্নায়ুর সঙ্গে পেঁচিয়ে যায়, এই কারণেই হাতে বা পায়ে কিছুক্ষণ চাপ পড়লে অসাড় হয়ে যায়।
চোখে পশ্চাৎমুখী রেটিনা: মানুষের চোখের রেটিনার ফটোরিসেপ্টর কোশগুলি পিছনের দিকে মুখ করে সজ্জিত থাকে, এই ডিজাইনের ফলে রেটিনা ডিট্যাচ বা খুলে পড়ার সম্ভাবনা বেড়ে গেছে, যা অন্ধত্বের একটি প্রধান কারণ। মানুষের তুলনায় অক্টোপাশ ও স্কুইডদের চোখের ডিজাইন অনেক উন্নত।
ভুল পথে স্নায়ু: রেকারেন্ট ল্যারিঞ্জিয়াল নার্ভ (RLN) আমাদের কথা বলার এবং খাবার গেলার মেকানিজমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ভ্রূণের বিকাশের সময় RLN ঘাড়ের টিস্যুর একটি ছোট পিণ্ডে জড়িয়ে যায়, যা মহাধমনীর চারপাশে স্নায়ুটিকে লুপ করে দেয়, যা এই জায়গায় আঘাতের প্রতি আমাদের অসহায় করে তোলে।
স্বরযন্ত্র ভুল জায়গায়: শ্বাসনালী ও খাদ্যনালী গলবিলে একই স্থানে খোলে, আবার এখানেই স্বরযন্ত্রেরও অবস্থান, শ্বাসনালীতে যাতে খাবার না ঢুকে যায় তার জন্য এপিগ্লটিস খাবার গেলার সময় স্বরযন্ত্রের মধ্য দিয়ে শ্বাসনালীর ছিদ্রকে ঢেকে দেয়, কিন্তু কখনও কখনও এপিগ্লটিস যথেষ্ট দ্রুত কাজ করেনা, ফলে খাওয়ার সময় কথা বললে খাবার পিছলে পড়ে শ্বাসনালীতে আটকে যেতে পারে, ফলে মানুষের দম বন্ধ হয়ে মৃত্যুর পরিস্থিতি চলে আসে, এইভাবে অনেক মানুষ বেঘোরে প্রাণ হারায়।
পায়ু ও জননছিদ্রের কাছাকাছি অবস্থান: এই ছিদ্র দুটির কাছাকাছি অবস্থানের জন্য মানুষ মূত্রনালীতে সংক্রমণের শিকার হয়, বিশেষ করে মহিলারা এই ডিজাইনের জন্য বেশি অসহায় হয়ে উঠেছে।
মানুষের ডিএনএ মেরামত দক্ষতা দুর্বল - ফলে মানুষের কোশ ক্যান্সারাস হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি।
বিবর্তন একটি পরিবর্তনকারী শক্তি, কোনও দক্ষ, মেধাবী ইঞ্জিনিয়ার নয়, বিবর্তন শূন্য থেকে পুনরায় নকশা করার পরিবর্তে পুরানোগুলির উপরে নতুন বৈশিষ্ট্য তৈরি করে। এর ফলে অনেক "প্যাচওয়ার্ক" বা জোড়াতালি ডিজাইন তৈরি হয়। ক্রমববিবর্তনের কারণে “প্যাচওয়ার্ক” ডিজাইন - প্রাকৃতিক নির্বাচন মানুষের দেহে অনেক জায়গায় ত্রুটির আপাত সমাধান করেছে, অর্থাৎ জোড়াতালি দিয়ে, প্যাচওয়ার্ক করে কাজ চালিয়েছে, পুরানো কাঠামোর ওপর নতুন অংশ বসিয়েছে।
যেমন স্বরযন্ত্রের স্নায়ু, এই স্নায়ু স্বরযন্ত্র নিয়ন্ত্রণ করে, মস্তিষ্ক থেকে সরাসরি গলায় যাওয়ার পরিবর্তে, এটি বুকে একটি দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয় এবং তারপর আবার উপরে উঠে আসে। জিরাফের ক্ষেত্রে এই স্নায়ু অপ্রয়োজনীয়ভাবে কয়েক মিটার এগিয়ে যায়! কারণ এটি আমাদের প্রাথমিক মাছের মতো পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত হয়েছিল যাদের শারীরস্থান সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়েছিল, কিন্তু স্নায়ু পথটি রয়ে গেছে।
মানুষের চোখে অন্ধবিন্দু বা ব্লাইন্ডস্পট - অপটিক স্নায়ু মানুষের রেটিনার পিছনের দিকে যুক্ত, যাতে রেটিনার একটি অংশে কোন আলোক সংবেদনশীল কোশ থাকেনা। স্বাভাবিক অবস্থায় ব্লাইন্ড স্পট সমস্যার সৃষ্টি করে না কারণ মস্তিষ্ক অন্য চোখ এবং আশেপাশের দৃষ্টিক্ষেত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য ব্যবহার করে অনুপস্থিত তথ্য পূরণ করে নেয়। তবে কোন রোগের কারণে যদি ব্লাইন্ডস্পট বড় হয়ে যায়, তখন সমস্যা দেখা দিতে পারে যাকে স্কোটোমাবলা হয় , চোখের ম্যাকুলার ডিজেনারেশন, গ্লুকোমা বা রেটিনা ডিটাচমেন্টের মতো অবস্থার কারণে ঘটে, এছাড়া এই ভুল ডিজাইনের কারণে চোখের ভেতরে তরলের চাপ বাড়ার ফলে গ্লুকোমা হলে অপটিক নার্ভ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং দৃষ্টিশক্তির স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে, যার ফলে দৃষ্টিতে অন্ধ দাগ বা "প্যাচি ব্লাইন্ড স্পট" দেখা দিতে পারে।
মানুষের তুলনায় স্কুইড এবং অক্টোপাসের চোখ ভিন্নভাবে বিবর্তিত হয়েছে, তাদের চোখে এই ত্রুটি নেই।
সাইনাসের খারাপ নিষ্কাশন ব্যবস্থা - মানুষের সাইনাস, বিশেষ করে বড় ম্যাক্সিলারি সাইনাস সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় গহ্বরের উপরের দিকে অবস্থিত খোলা জায়গা (অস্টিয়া) দিয়ে নাকের গহ্বরে প্রবেশ করে, ফলে শ্লেষ্মাকে মাধ্যাকর্ষণের বিরুদ্ধে চলতে হয়, যার ফলে মাথা কাত না করে থাকলে বা শুয়ে না থাকলে কার্যকরভাবে শ্লেষ্মা নিষ্কাশন করা কঠিন হয়ে পড়ে। এটি বেশিরভাগ চারপেয়ের প্রাণীদের তুলনায় বিপরীত, ওদের সাইনাস মাধ্যাকর্ষণ শক্তির সাথে কাজ করে আরও দক্ষতার সাথে নিষ্কাশন করে। সাইনাসের প্রাকৃতিক খোলা অংশ (অস্টিয়া) তুলনামূলকভাবে সরু এবং সাধারণ সর্দি, অ্যালার্জি বা প্রদাহের কারণে সহজেই এটি বন্ধ হয়ে যেতে পারে, এই বাধা সাইনাস গহ্বরের ভিতরে শ্লেষ্মা আটকে রাখে, যা ব্যাকটেরিয়া এবং ছত্রাকের বৃদ্ধির জন্য উপযুক্ত একটি গরম, অন্ধকার, তরলপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করে, যা সংক্রমণের দিকে পরিচালিত করে, এর ফলে ঘন ঘন সাইনাস সংক্রমণ হয়। এটারও কারণ হল মানুষের প্রাথমিক খুলির নকশাটি মাছের মত প্রাণিদের থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত, যারা জলে আনুভূমিক অবস্থায় জীবন কাটাত।
ভ্যারিকোজ শিরা - মানুষ ও মহাবানরদের মত দাড়িয়ে থাকা প্রাণিদের ক্ষেত্রে হৃৎপিন্ড অনেক উচুঁতে থাকে, ফলে পায়ের রক্তকে উপরের দিকে হৃৎপিন্ডে ফিরিয়ে আনতে মানুষের পায়ের শিরাগুলিকে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির সাথে লড়াই করতে হয়, এই সিস্টেমটি হল মূলত সোজা হয়ে হাঁটার জন্য ছিলনা, যার ফলে ভ্যারিকোজ শিরা দেখা দিতে পারে, শিরাগুলোর ভালভ দুর্বল হয়ে গেলে বা ক্ষতিগ্রস্থ হলে রক্ত হৃৎপিণ্ডের দিকে সঠিকভাবে প্রবাহিত হতে পারে না এবং শিরায় জমা হয়, যার ফলে শিরাগুলো ফুলে যায়, পেঁচিয়ে যায়।
অবশিষ্ট অঙ্গ - যেমন অ্যাপেনডিক্স মূলত বেশি উদ্ভিদভোজী পূর্বপুরুষদের অঙ্গের অবশিষ্ট অংশ, বিবর্তন এটিকে টিকিয়ে রেখেছে কারণ এর এখনও রোগ প্রতিরোধে সামান্য ভূমিকা রয়েছে, তবে এটি একটি অবশিষ্ট রেট্রোফিট, এতে প্রদাহ হতে পারে (অ্যাপেনডিসাইটিস), কখনও কখনও মারাত্মকও হতে পারে।
কব্জির হাড়ের অনেক টুকরো - মানুষের কব্জিতে ৮টি ছোট কার্পাল হাড় রয়েছে , যা মূলত গাছে বসবাসকারী স্তন্যপায়ী প্রাণীদের আরোহণ এবং আঁকড়ে ধরার জন্য বিকশিত হয়েছিল, কিন্তু মানুষে রয়ে যাওয়া কাঠামোটি প্রয়োজনের তুলনায় জটিল এবং ঝুঁকিপূর্ণ। কব্জির পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ, যেমন টাইপিং, মাউস, কলম, যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা বা কোনো নির্দিষ্ট কাজে বারবার হাত ব্যবহার করলে হাত ও বাহুতে ব্যথা, অসাড়তা দেখা দেয়, ঝিনঝিন করে, কারণ কব্জির কার্পাল টানেলের মধ্য দিয়ে যাওয়া মিডিয়ান নার্ভে (মধ্যমা স্নায়ু) চাপ পড়ে ও সংকুচিত হয়, যার ফলে ব্যথা, ঝিঁঝিঁ করা এবং দুর্বলতা দেখা দেয়। একে কার্পাল টানেল সিনড্রোম বলে।
সুতরাং প্রকৃতির ডিজাইন নিখুঁত - এটি একটি মিথ, কারণ প্রকৃতি বা বিবর্তন কোন দক্ষ চেতনা নিয়ন্ত্রিত ইঞ্জিনিয়ার নয়, আজকের সব জীবদের প্রাকৃতিক নির্বাচন ধীরে ধীরে তৈরি করেছে। তাই আদর্শ, নির্ভুল ডিজাইনের পরিবর্তে “যা টিকে যায়” তাই চলছে।
এগুলো ছাড়াও আরো অনেক ত্রুটি আছে।
#বিজ্ঞানকথা