এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের আশিভাগ শিক্ষিতমূর্খের ধারণা বাকশাল একটা স্বৈরাচারি শাসন ব্যবস্থা। তাদের অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে প্রায়ই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা এই বাকশাল জুজু নিয়ে আসেন তাদের বক্তৃতায় বয়ানে। এমনকি বর্তমান শাসন ব্যবস্থাকেও অনেকে তুলনা করেন সেই আদলে। আফসোসের ব্যাপার হচ্ছে খোদ আওয়ামী লীগের প্রচুর নেতাকর্মী বাকশাল বলতে আসলে কি বোঝায় তা জানেন না। তারা তাদের প্রতিপক্ষের খোচা নিরবে সহ্য করেন এবং মনে মনে রুষ্ট হন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উপর। কি এক পাপের বোঝা যেন চাপিয়ে গিয়েছিলেন তিনি।
এই বিভ্রান্তির নেপথ্যে কিছু মুখরোচক উপাদানও আছে। যেমন তাজউদ্দিন আহমেদের একটি উক্তির কথা শোনা যায়, তিনি নাকি বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর বলেছিলেন বাকশালই বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু ডেকে এনেছে। কিংবা বঙ্গবন্ধু এই বাকশাল অবলম্বন করার সময় তিনি বুঝেছিলেন বঙ্গবন্ধু তার মৃত্য ডেকে এনেছেন। কথাটা যদি সত্যিও হয়, তাহলে বলতে হবে তাজউদ্দিন ভুল বলেননি। তবে তার এই উক্তি যে ছলে প্রয়োগ করা হয়, সেভাবেও মোটে কথাটা তিনি বলেননি। আরও আছে মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি এমএজি ওসমানীর বিখ্যাত উক্তি। তিনি নাকি সংসদে দাড়িয়ে বলেছিলেন, বঙ্গবন্ধু আপনি ভুল করছেন। আমি আর আপনার সঙ্গে নেই। ঠিক কেনো ওসমানীর এই প্রলাপ সেটা আমি আসলেই ধরতে পারিনি।
যাহোক ফিরে আসি বাকশালে। বঙ্গবন্ধু এটাকে বলেছিলেন দ্বিতীয় বিপ্লব। প্রথম বিপ্লব ছিলো মুক্তিযুদ্ধ।যার বিনিময়ে আমাদের স্বাধীনতা।সেটা ছিলো বাঙালীর রাজনৈতিক মুক্তি। আর বাকশাল কর্মসূচী দিয়ে বঙ্গবন্ধু বাঙালীর অর্থনৈতিক মুক্তির সূচনা করতে চেয়েছিলেন। এই অর্থনৈতিক শৃংখলটা বাধা ছিলো বিভিন্ন পরাশক্তি আর দাতা দেশের কাছে। স্বাধীনতার পর তিনটি বছর তিনি সবার দরজায় গেছেন। হাত পেতেছেন। কিন্তু সবার একটাই শর্ত। আমার দালালি করো। আমেরিকা, রাশিয়া, সৌদি আরব, চীন সবার একই শর্ত। বিশ্ব ব্যাংকের ঋণ, দাতা দেশগুলোর ঋণের সঙ্গে কি শর্ত জুড়ে ছিলো তা আগেই আমি ভিন্ন আলোচনায় উল্লেখ করেছি। যুদ্ধবিধস্ত দেশটার উপর প্রকৃতির কেনো এত রোষ ছিলো সেটাও এক জিজ্ঞাসা। হয় খরা নয় বন্যা। দুটোরই অবশ্যম্ভাবী প্রতিক্রিয়া দুর্ভিক্ষ। এটাও ভোলা চলবে না গোটা বিশ্বজুড়ে তখন চলছিলো এক ভয়াবহ আর্থিক মন্দা।
তার উপর দেশে চলছিলো অন্য এক অরাজকতা। জনগনের মুক্তি, সর্বহারার মুক্তির জন্য চীনপন্থী কমিউনিস্টরা চালাচ্ছিলো তাদের ধারার বৈপ্লবিক কর্মসূচী। সেটার মধ্যে প্রধান ছিলো পাটের গুদামে আগুন দেওয়া। ব্যাংক লুট করা। প্রান্তিক অঞ্চলের পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের হত্যা করে অস্ত্র লুট করা। স্বাধীনতার পর তিন বছরে তখনকার অর্থমানে দুইশো কোটি টাকার পাট পোড়ানো হয়েছে। এই পাট ছিলো বাংলাদেশের একমাত্র অর্থকরী পন্য যা রপ্তানী করে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতো এই দেশ। ছিলো জাসদ। তারা শ্লোগান দিতো বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের। এটা ঠিক কোন বৈজ্ঞানিকদের সমাজতন্ত্র সেটা তারা ঠিকমতো বোঝাতে না পারলেও তাদেরও কাজ ছিলো সর্বহারা পার্টির মতোই। ব্যাংক লুট করো, গুদামে আগুন দাও, দেশ অচল করো। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা শূন্যের নীচে চলে গেলে দেশে সর্বহারার বিপ্লব হবে, তারা সব পয়সাওয়ালাদের মেরেকেটে এই বিপ্লব ঘটাবে। আর তাদের শাসন করবে বিপ্লবী নেতারা। কি সারকাজমিক অর্গাজম!
বঙ্গবন্ধু ঠিক করলেন এভাবে চলতে পারে না। ন্যামের সদস্য কিউবার কাছে পাট বিক্রি করেছেন। সেটা যুক্তরাষ্ট্র বেয়াদবি হিসেবে নিয়েছে কারণ তাদের চোখে কিউবা কমিউনিস্ট দেশ, অতএব দুই জাহাজ বোঝাই চাল ও খাদ্যশস্য তারা ফিরিয়ে নিয়ে সাগরে ঢেলে দিলো। বঙ্গবন্ধু বুঝলেন স্বনির্ভর হওয়ার বিকল্প নেই। একই সঙ্গে তিনি সমাজতন্ত্রওয়ালাদেরও বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র শেখানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। দ্বিতীয় বিপ্লব হলো সেই বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র যার মূল এসেন্স ছিলো গণতন্ত্রের মোড়কে অর্থনৈতিক সমাজতন্ত্র। অর্থাৎ সমবায় পদ্ধতিতে ফসল উৎপাদন হবে, কৃষকরা মিলিতভাবে জমি চাষ করে ফসল ফলাবেন। তাদের নায্য দাম দিয়ে সেই ফসল দেশজুড়ে বিপনন করা হবে।
বাকশাল কি স্বৈরাচারি শাসন ব্যবস্থা? মোটেই না। এটা ছিলো বহুদলীয় শাসনব্যবস্থা। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বাংলার মানুষের পূর্ণ সমর্থন নিয়ে জিতেছিলো আওয়ামী লীগ। সেই নির্বাচিত সংসদরাই মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং স্বাধীনতার পর স্বাধীন দেশের জাতীয় সংসদে বসেছেন, নতুন সংবিধান দিয়েছেন। এরপর ১৯৭৩ সালের নির্বাচনেও সংখ্যাগরিষ্ঠ সিট আওয়ামী লীগই পেয়েছে। একমাত্র বিরোধী দলীয় সদস্য ন্যাপ মোজাফফরের সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। তখন বিরোধী দল বলতে ছিলো ন্যাপ ভাসানী, ন্যাপ মোজাফফর,বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) এবং জাসদ। ভাসানী নির্বাচনে বিশ্বাস করতেন না। করলে জামানত হারাতেন নিঃসন্দেহে। সত্তরে তিনি যেমন ভোটের আগে ভাত চেয়েছেন। স্বাধীনতার পর করলেন শুধু অনশন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধের জন্য অনশন। মুসলিম বাংলা গঠনের জন্য অনশন। আওয়ামী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে তার অনশন ছিলো অহরহ। আর জাসদ কি করতো তাতো বলা হয়েছে। আর মুক্তিযুদ্ধ শেষে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ ছিলো বলে মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলামী, পিডিপি ছিলো নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল।
তো স্বনির্ভরতার দ্বিতীয় বিপ্লবে বঙ্গবন্ধু ডাক দিলেন জাতীয় ঐক্যের। ভাসানী ন্যাপ এবং জাসদ প্রত্যাখ্যান করলো তার ডাক। ভাসানী যদিও তার শিষ্য মুজিবকে ডেকে আশীর্বাদ করলেন। তবে দলীয়ভাবে এর বিরুদ্ধে থাকলেন। জাতীয় ঐক্যের ডাকে সাড়া দিলো মুক্তিযুদ্ধের সময় আওয়ামী লীগের মিত্রশক্তি ন্যাপ মুজাফফর এবং সিপিবি। আওয়ামী লীগ, ন্যাপ মুজাফফর এবং সিপিবির সম্মিলিত রূপ ছিলো বাকশাল। যার পূর্ণাঙ্গ অর্থ বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ। এখানে আওয়ামী কথাটা জনতা অর্থে ব্যবহৃত। চার বিরোধী দলের দুটো শাসনতন্ত্রে। আর দুটো বিরুদ্ধ অবস্থানে। স্বৈরাচারি হলো কিভাবে!
বাকশালের মূল এসেন্স ছিলো ক্ষমতার বিকেন্দ্রিকরণ। ছোট ছোট সেলে গোটা দেশকে ভাগ করে দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু তার এই পরিকল্পনায়। মানুষের শরীর যেমন বিভিন্ন কোষে তৈরি তেমনি বাকশালও। প্রতিটি সেলের মূল ক্ষমতায় কৃষক, শ্রমিক এবং সাধারণ জনতা। প্রশাসক হিসেবে রাজনৈতিক নেতৃত্ব যাদের সহযোগি সেনাসদস্য এবং আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা। দেশের প্রতিটি জেলার জন্য একজন করে গভর্নর নির্বাচিত করা হলো। এবং এই গভর্নরদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হলো বাকশাল কর্মসূচি পরিচালনার জন্য। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সেই গভর্নররাই শপথ নেওয়ার কথা ছিলো বঙ্গবন্ধুর কাছে। বাকশাল শুরু হতে পারেনি। বাংলাদেশে কখনও বাকশাল কায়েম করা যায়নি। এটি পরিকল্পনা হিসেবেই ছিলো। বাস্তবায়নের আগেই বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে বাকশালকে অংকুরেই বিনাশ করা হয়।