19/04/2026
রাজনীতিতে আবেগের জায়গা নেই? নাকি আছে শেষকথা?
ইসলামী রাজনৈতিক বিশ্লেষক: ড. হালিমা সুলতানা
“রাজনীতিতে আবেগের জায়গা নেই”—এটা প্রচলিত রাজনীতির বহুল ব্যবহৃত একটি বাক্য। আরেকটি প্রচলিত ধারণা হলো—“রাজনীতিতে শেষকথা বলে কিছু নেই।” বাস্তব রাজনীতির অভিজ্ঞতা থেকেই এসব কথা এসেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ইসলামী রাজনীতিও কি একই বাস্তবতায় পরিচালিত হবে?
উত্তরটা সরল—না। ইসলামী রাজনীতিতে আবেগও আছে, আদর্শও আছে, এবং শেষকথাও আছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, প্রচলিত রাজনীতির এই কঠোর বাস্তবতা ধীরে ধীরে ইসলামী রাজনীতির ভেতরেও প্রবেশ করছে। এমনকি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কিছু নেতৃত্ব, কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যেও এই প্রবণতা দৃশ্যমান। তাদের অনেকেই এখন মনে করছেন—“সংসদে যেতেই হবে”, তা আবার “যেকোনো মূল্যে”, এবং তা হতে হবে “উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসন” নিয়ে।
পরিবর্তনের স্লোগান বনাম বাস্তবতা
জুলাই অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে দেশজুড়ে নানা স্লোগান উঠে আসে—
“ইনকিলাব”, “আপোস না সংগ্রাম”, “ক্ষমতা না জনতা”, “ঢাকা ঢাকা”, “নতুন বন্দোবস্ত”।
এই স্লোগানগুলোর মর্মার্থ ছিল স্পষ্ট—জাতি পরিবর্তন চায়। পুরোনো জঞ্জাল সরিয়ে একটি নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত চায়। মানুষ চায়—
আঁতাত ও ষড়যন্ত্রমুক্ত রাজনীতি
পেশিশক্তি ও কালো টাকার প্রভাবমুক্ত নির্বাচন
একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা
এই প্রেক্ষাপটে পীর সাহেব চরমোনাই একটি জাতীয় ঐক্যের ডাক দেন, এবং ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে এপিআরের মতো কাঠামোর কথাও উল্লেখ করেন।
ঐক্যের আড়ালে দরকষাকষি
বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল প্রকাশ্যে ঐক্যের কথা বললেও, বাস্তবে চলতে থাকে ভিন্ন খেলা—
দরকষাকষি, আঁতাত, ভাগবাটোয়ারা এবং পেশিশক্তি ও অর্থ সংগ্রহের প্রতিযোগিতা।
যারা জুলাইয়ে পরিবর্তনের জন্য সোচ্চার ছিল, তাদের একটি অংশ দ্রুত আপোসের পথে হাঁটে। ক্ষমতার জন্য তৎপরতা বাড়ে, বিদেশি প্রভাব বাড়তে থাকে, আর শুরু হয় নতুন ধরণের “হালাল চাঁদাবাজি”—
তদবির, ব্যবসায়িক সুবিধা দেওয়া এবং মামলাভীতিকে কাজে লাগিয়ে অর্থ আদায়।
চট্টগ্রামের এক নেতার বিরুদ্ধে দলীয় অফিসের নামে বিপুল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ এই বাস্তবতারই প্রতিফলন। “জুলাই” হয়ে ওঠে তাদের ঢাল, আর “মব” তাদের হাতিয়ার।
নৈতিকতা বনাম ক্ষমতার রাজনীতি
একটি গুরুত্বপূর্ণ সভায়, যেখানে পরিবর্তনের কর্মসূচি নির্ধারণ করা হয়, সেখানে সভাপতিত্বকারী দল সভা শেষে নিজেদের অবস্থান থেকে সরে দাঁড়ায়। কারণ হিসেবে বলা হয়—
“রাজনীতিতে আবেগের জায়গা নেই।”
এই ঘটনাই প্রমাণ করে—নীতির চেয়ে ক্ষমতাই এখন মুখ্য হয়ে উঠেছে। এমনকি বড় রাজনৈতিক দলের সামনে অনেকেই আত্মসমর্পণমূলক অবস্থান নেয়। এ প্রসঙ্গে পীর সাহেব চরমোনাইয়ের আক্ষেপ ছিল যথার্থ—
“এরা কীসের রাজনীতি করবে, যারা শুরুতেই কথার বরখেলাপ করে?”
গুণগত পরিবর্তনের সংকট
পীর সাহেব চরমোনাইয়ের লক্ষ্য ছিল রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন—
একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং টাকামুক্ত নির্বাচনী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা।
কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, অনেক দল এই আন্দোলনকে ব্যবহার করেছে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার জন্য। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল না পরিবর্তন, বরং দরকষাকষির মাধ্যমে সুবিধা নিশ্চিত করা। সুযোগ পেলেই তারা ঐক্য ভেঙে নিজেদের স্বার্থে চলে গেছে।
তাহলে কি পীর সাহেব চরমোনাই রাজনীতি বোঝেন না?
অনেকে বলেন—পীর সাহেব চরমোনাই রাজনীতি বোঝেন না।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—তিনি কি চাইলে অন্যদের মতো আপোস, আঁতাত ও সুবিধাবাদী কৌশল নিতে পারতেন না?
অবশ্যই পারতেন। ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন প্রতিষ্ঠার পরপরই পারতেন।
কিন্তু তিনি তা করেন না—সচেতনভাবেই করেন না।
কারণ, তিনি রাজনীতিকে কেবল ক্ষমতার খেলা হিসেবে দেখেন না। তার কাছে রাজনীতি ইবাদত রাজনীতি একটি আদর্শিক দায়িত্ব।
যারা তাকে “অদক্ষ” মনে করেন, তাদের প্রতি প্রশ্ন—
এমন আপোসকামী রাজনীতির কি দেশে অভাব আছে?
আপনারা চাইলে সেখানেই যোগ দিতে পারেন। ইসলামী আন্দোলনকে কেন কলুষিত করতে চান?
✍️ শেষকথা
প্রচলিত রাজনীতিতে হয়তো আবেগের জায়গা নেই, শেষকথাও নেই।
কিন্তু ইসলামী রাজনীতি যদি একই পথে হাঁটে, তাহলে তার স্বকীয়তা কোথায়?