02/06/2022
ইসলামিক পদ্ধতিতে পশু-পাখি জবাই করলে কষ্ট পায় কিনা
পৃথিবীর সব দেশেই মুসলমানরা পশু-পাখি আল্লাহ্ প্রদত্ত ইসলাম নির্দেশিত পন্থায় জবাই করেন। মুসলমানরা প্রতিটি কাজ আল্লাহ ইচ্ছামাফিক ও রাসূল ﷺ এঁর তরিকা/পন্থা অনুযায়ী করে থাকেন। নিজের ইচ্ছায় কিছুই করেন না।
আল্লাহতায়ালা প্রাণী সম্পর্কে পবিত্র কোরআন শরীফে বলেন, ‘ভূপৃষ্ঠে বিচরণশীল প্রত্যেকটি জীব এবং (বায়ুমন্ডলে) নিজ ডানার সাহায্যে উড়ন্ত প্রত্যেকটি পাখি তোমাদের মতোই একেকটি জাতি।’ –সূরা আনআম ৩৮
পবিত্র কোরআনুল কারিমে পশুপাখির মর্যাদা এবং মানবসমাজে তাদের অবস্থানও সুস্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন। আল্লাহতা’য়ালা বলেন, ‘আর চতুষ্পদ জন্তুগুলো তিনি তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন, তাতে রয়েছে উষ্ণতার উপকরণ ও বিবিধ উপকার। তা থেকে তোমরা আহার গ্রহণ করো। তোমাদের জন্য তাতে রয়েছে সৌন্দর্য, যখন সন্ধ্যায় তা ফিরিয়ে আনো এবং সকালে চারণে নিয়ে যাও। এগুলো তোমাদের বোঝা বহন করে এমন দেশে নিয়ে যায়, ভীষণ কষ্ট ছাড়া যেখানে তোমরা পৌঁছাতে সক্ষম হতে না। তোমাদের পালনকর্তা অনুগ্রহশীল, পরম দয়ালু।’ -সূরা নাহল ৫-৭।
আপনার কাছে পশু-পাখি জবাই করাটা কষ্টের কিংবা নিষ্ঠুরতা মনে হলেও পশু-পাখির স্রষ্টা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মানুষের প্রয়োজনে পশু-পাখি জবাইয়ের হুকুম দিয়েছেন। বিজ্ঞানের উৎকর্ষতায় আজ প্রমাণিত যে, মাথায় ধরে পশুকে মাটিতে শুইয়ে দিলে কিংবা তার গলদেশে অবস্থিত প্রধান তিনটি রগ কেটে দিলে সাথে সাথেই পশুটির মস্তিষ্ক বোধ ও অনুভুতি শক্তি হারিয়ে ফেলে। তখন দেখতে যেমনই মনে হোক, পশু-পাখির মারাত্মক কোনো কষ্ট বা যন্ত্রণা হয় না। এ সময়টিতে তার দেহের প্রবাহিত রক্ত (যা হারাম) সজোরে নির্গত হয়ে শেষ হয়। কয়েক মিনিট তার দেহ আন্দোলিত হওয়ার সুযোগ শরিয়ত এ জন্য রেখেছে যে, তার দেহের প্রতিটি শীরা-উপশীরা ও কোটি কোটি কোষ থেকে মানুষের জন্য ক্ষতিকর পদার্থ রক্তের সাথে যেন নিঙড়ে বের হয়ে যেতে পারে।
এক কোপে পশু-পাখির মাথা আলাদা করা বা বলি দেয়ার পদ্ধতি ইসলামী শরিয়ত সমর্থন করে না। এতে জবাইয়ের উদ্দেশ্য ও রহস্য কোনোটাই পূরণ হয় না। জবাই করাই ইসলামের পদ্ধতি। এ পদ্ধতি ছাড়া পশু-পাখি হালাল হবে না। হালাল পশু-পাখি হালাল পন্থায়ই জবেহ্ করতে হবে। উটের ক্ষেত্রে নহর পদ্ধতিও স্বীকৃত। অবশ্যই খেয়াল রাখা উচিত, তিনটি রগ কাটার পর পশুকে রক্ত প্রবাহিত হয়ে সে নিস্পন্দন হওয়া পর্যন্ত সময় দেয়া ওয়াজিব। নিস্পন্দন হওয়া আগে ছোট ছুরি দিয়ে খুঁচিয়ে গলার হাঁড়ের মধ্যকার রগগুলো কেটে দিয়ে দ্রুত মেরে ফেললে বা যথেষ্ট পরিমাণ প্রবাহিত রক্ত নিঙড়ে বের হওয়ার আগেই কোন ভাবে পশুটি মেরে ফেলি, তবে ঐ পশুর গোশত হালাল হওয়া নিয়েও যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। সুতরাং ইলেকট্র্রিক শক কিংবা এক কোপে মাথা আলাদা করে ফেলা অথবা ক্যাপটিভ বল্ট গান (Captive Bolt Pistol) দ্বারা মাথার নির্দিষ্ট স্থানে জোরে প্রহারের মাধ্যমে অচেতন করে পশু জবাই করা জায়েজ নয়।
শাদ্দাদ ইবনে আউস বলেন, হজর রাসূলুল্লাহ ﷺ -এঁর কাছ থেকে আমি দু’টি কথা শিখেছি। তিনি বলেন, ‘প্রত্যেক বস্তুর প্রতি দয়া প্রদর্শন করা আল্লাহতায়ালা আবশ্যক করেছেন। তাই কোনো জন্তু হত্যা করতে হলে উত্তমপন্থা গ্রহণ করো। জবাই করতে হলে উত্তমভাবে জবাই করো। ছুরি-চাকু ধারালো করো। জবাই করা পশুর জন্য সহজ করো।’ –মুসলিম শরীফ।
অন্য হাদিসে এসেছে, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন, এক লোক একটি ভেড়া জবাই করার জন্য মাটিতে শোয়ায়। এরপর সে চাকুতে ধার দিতে শুরু করে। তা দেখে নবী করিম ﷺ বললেন, ‘তুমি কি তাকে কয়েকবার মারতে চাও? শোয়ানোর আগে কেন চাকু ধারাতে পারলে না? –আত তারগিব ওয়াত তারহিব: ২২৬৫।
পশু-পাখির প্রতি দয়ার বিধান হিসেবে নবী করিম ﷺ কিছু নির্দেশনা দিয়েছেন। (এক) পশু-পাখিকে আরেক পশু-পাখির সামনে জবাই না করা। (দুই) পশু-পাখিকে বেশি সময় বেঁধে ফেলে না রাখা। (তিন) ছুরি-চাকু দেখিয়ে মানসিক কষ্ট দেওয়া যাবে না। এসবের কারণে তারা মৃত্যুর চেয়ে বেশি কষ্ট পায়।(চার) পশু-পাখি জবাই করার জন্য ভোতা ছুরি ব্যাবহার করা যাবেনা। তীক্ষ্ন ধারালো ছুরি ব্যবহার করতে হবে। (পাঁচ) পশুপাখি জবাই করার সময় কষ্ট দিতে নিষেধ করেন। (ছয়) জবাই করার জন্য টেনে-হেঁচড়ে নিয়ে শারীরিক কষ্ট দেওয়া যাবে না।(সাত) পশু-পাখির প্রাণ বের হয়ে থিতিয়ে যাওয়ার আগেই চামড়া ছোলা শুরু না করা। অর্থাৎ জবাইয়ের পর পশু-পাখির শরীর থেকে রক্ত বের হয়ে যাওয়ার জন্য ও প্রাণ বের হওয়া পর্যন্ত পর্যাপ্ত সময় দেওয়া। পশু-পাখির দেহের প্রাণস্পন্দন একেবারে থেমে যাওয়া বা নিস্তেজ হওয়ার আগে চামড়া খসানো বা অন্য কোনো অঙ্গ কাটা মাকরূহ।
জার্মানির প্রচলিত ক্যাপটিভ বল্ট গান (Captive Bolt Pistol) দ্বারা মাথার নির্দিষ্ট স্থানে জোরে প্রহারের মাধ্যমে অচেতন করে পশু জবাই এবং সরাসরি ধর্মীয় পদ্ধতিতে ছুরির জবাই — এ দুইটির মধ্যে ব্যথা অনুভব ও অজ্ঞান হওয়ার মাত্রা নির্ধারণ করে তুলনামূলক একটি পরীক্ষা করেন জার্মান চার গবেষক। ১৯৭৮ গবেষণাটি জার্মানিতে হয়েছিল। জার্মানির হ্যানোভার বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪ জন গবেষকের (W. Schulze, H. Schultze-Petzold, A.S. Hazem ও R. Gross) । জবাইয়ের সময়ে EEG পরীক্ষা করে পশুর মস্তিষ্ক এবং ECG পরীক্ষা করে পশুর হার্ট দেখেন। তাঁরা দেখতে পান জবাইয়ের পরে EEG গ্রাফে কোনো পরিবর্তন দেখা যায় না, অর্থাৎ পশু কোনো ব্যাথা পায় না। EEG রেকর্ডে দেখা যায়, পশু গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকার মতো অচেতন হয়ে থাকে, শরীর হতে প্রচুর রক্ত বের হয়ে যাওয়ায় ব্রেইনে রক্ত সরবরাহ হয় না বলে এই অচেতন অবস্থা হয়। EEG গ্রাফে Zero level দেখাচ্ছিলো, তার মানে পশু কোনো ব্যাথা পাচ্ছিলো না। গবেষণায় দেখা যায়, ক্যাপটিভ বল্ট গান দিয়ে প্রহারের ফলে EEG গ্রাফে মস্তিষ্কের কার্যক্রম বেশী পরিলক্ষিত হয়। যা ব্যথা অনুভব হওয়ার কারণেই হয় বলে উল্লেখ করা হয়। অপরদিকে, ধর্মীয় পদ্ধতিতে সরাসরি জবাইয়ে গলা কাটার পর EEG গ্রাফে তেমন কোনো বিশেষ প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়নি। এ গবেষণায় তাঁরা ২৩টি ভেড়া ও ১৫টি বাছুর ব্যবহার করেছিলেন।
জবাইয়ের পর পশু-পাখির যে খিচুনি আমরা দেখি সেটা Spinal cord এর একটি Reflex Reaction, এটি মোটেও ব্যাথার জন্য হয় না। সুবহানাল্লাহ্। আল্লাহ রাব্বুল আল-আমীন এঁর প্রতিটি সিদ্ধান্ত অত্যন্ত নিখুঁত ও নির্ভুল। যাঁরা ভাবেন যে পশু-পাখি জবাইয়ের মাধ্যমে মুসলমানরা পশু-পাখিকে কষ্ট দিচ্ছে তারা আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীনের এই রহমতের কথা জানতে পারলে সত্যিই অবাক হবেন। তবে অবিশ্বাসি অথবা ইসলাম বিদ্বেষিগণের কথা ভিন্ন।