শরতের মেঘলা আকাশ।
ক্ষণে সূর্য উঁকি দেয়, আবার ক্ষণে চলে যায় মেঘের আড়ালে।
শনশন বাতাস। যত দূর চোখ যায়, একদিকে কাশবনের শুভ্রতা—অন্যদিকে পানি আর পানি। সেই পানিতেই ছোট ছোট ডিঙি নৌকা ভেসে বেড়ায়।
ঢাকার মিরপুরে মাজার রোড পেরিয়ে বেড়িবাঁধ দিয়ে আশুলিয়া যাওয়ার রাস্তার বর্ণনা এটা।
দিনটা যদি হয় ছুটির, স্বল্প সময়ের মধ্যেই যদি ঘুরে আসতে চান কেউ, তবে অনায়াসে চলে যেতে পারেন এ অঞ্চলে। শুধুই যে প্রাকৃত
িক সৌন্দর্য, তা নয়, এই সৌন্দর্য ঘিরেই এ অঞ্চলে গড়ে উঠেছে ছোট-বড় বেশ কিছু কফি শপ, ভ্রাম্যমাণ রেস্তোরাঁ, খাবারের দোকান ও বিনোদন পার্ক।
ভ্রমণ উপভোগ্য করে তোলার জন্য পানির ওপর বাঁশের মাচার মতো করে সেখানে বানানো হয়েছে টিনের ছাউনির ছোট ছোট ঘর। যাতায়াতের জন্য বাঁশের সাঁকো। এখানে বসে অনায়াসেই দিনটি কাটিয়ে দেওয়া যায়।
মিরপুর শাহ আলী মাজার রোড ছেড়ে বেড়িবাঁধের ওপর উঠে এক কিলোমিটার রাস্তা পেরোলেই হাতের বাঁয়ে তামান্না ফ্যামিলি পার্ক ও চীনা রেস্তোরাঁ, আর ডানে স্বপ্নচূড়া কফি হাউস।
সঙ্গে যদি ছোট ছেলেমেয়ে থাকে, তবে তামান্না ফ্যামিলি পার্কে তাদের জন্য রয়েছে বিভিন্ন রকমের রাইড। আছে স্পিডবোট। লোকজন টিকিট কেটে সেসব রাইডে চড়ে আনন্দ আর হইচই করে দিনভর।
এখানে রয়েছে সম্মেলন কক্ষও। যে কেউ চাইলে বনভোজনও করতে পারে অনায়াসে। আর বসার জন্য ব্যবস্থা করা হয়েছে পানির ওপর সারি সারি সুদৃশ্য খুপরিঘর। তবে খাবারের দামটা একটু বেশি মনে হতে পারে।
তামান্নার খেয়ায় আছে ছোট ছোট ডিঙি নৌকা। ১০০ টাকা ঘণ্টা চুক্তিতে যে কেউ নৌকায় করে ঘুরে আসতে পারে তুরাগ নদ। মাঝেমধ্যে দূর থেকে ভেসে আসে দু-একজন মাঝির দরাজ গলার গান।
তামান্না ফ্যামিলি পার্ক ছেড়ে আশুলিয়ার দিকে এগোলে হাতের ডানে পড়বে ছায়ানীড়, স্বপ্ননীড়, ইওর চয়েজ রেস্টুরেন্ট। এখানে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে আড্ডা, গান আর হইহুল্লোড়।
লোকালয় ছেড়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সান্নিধ্য নিয়ে যারা একটু আনন্দ উপভোগ করতে চায়, তাদের জন্যই যেন উপযুক্ত এ স্থান।
বিরুলিয়া বাজারের একটু আগেই ভ্রমণপিপাসুদের বিশ্রাম নেওয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছে বসার আসন। এ ছাড়া তুরাগ নদের পাড় ঘেঁষে হয়েছে ছোট ছোট বাঁশের বেঞ্চ। মাথার ওপর গাছের ছায়া, নদের স্রোত, সুশীতল বাতাস কার না ভালো লাগে! এ জন্য পাশেই যে চায়ের দোকানগুলো গড়ে উঠেছে, সেখান থেকে কয়েক কাপ চা খেলেই চলবে। ইচ্ছা করলে কেউ কেউ গরম গরম চটপটিও নিয়ে নিতে পারে।
বিরুলিয়া বাজার ছেড়ে একটু এগিয়ে গেলেই হাতের ডানে পড়বে বিশাল শুটিং স্পট। এখানে আছে বিশ্রাম নেওয়ারও কিছু জায়গা।
এই শুটিং স্পটে আছে গ্রাম, লেক, কাশবনসহ আধুনিক বাড়িঘর। শিগগিরই আনুষ্ঠানিকভাবে এখানে কাজ শুরু হবে।
বিরুলিয়া বাজার ছেড়ে একটু এগিয়ে হাতের ডানে তাকালেই দুই চোখে যেন বিস্ময় জেগে ওঠে। বাতাসে হেলে পড়ছে কাশফুল। যত দূর চোখ যায়, কেবল এমনই দৃশ্য। আর এই কাশবনেই ছোটাছুটি করে বেড়াচ্ছে অসংখ্য মানুষ। খালি পায়ে নেমে পড়েছে সবাই। পুরো দৃশ্যটি দেখলেই মনে হবে যেন কোনো এক শিল্পীর ক্যানভাস।
হাতের বাঁয়ে নদের ডানে কাশবন, মাঝখানে সবুজ অরণ্য। এর মধ্যেই রাস্তা। এগিয়ে চলতে একসময় এসে যায় আশুলিয়া স্টিমার ঘাট। বাঁধের রাস্তার ডান দিকে ভ্রাম্যমাণ রেস্তোরাঁ সারিনা। আসলেএটি একটি জাহাজ। এখানে পাওয়া যাবে সব ধরনের খাবার। যদি কেউ তাদের পারিবারিক অনুষ্ঠান করতে চায়, তবে নদে জাহাজ ছুটিয়ে আনন্দ উদ্যাপন করা যাবে খুব সহজেই। এখানেই আছে বেশ কিছু স্পিডবোট। ঘণ্টা চুক্তিতে এগুলোয় ভ্রমণ করা যাবে। আর ঘাটে বাঁধা আছে নৌকা, তবে ঘণ্টায় ২০০ টাকা ভাড়া গুনতে হবে। এদিকটায় অনেকগুলো চটপটির দোকান। এসবের চটপটি কিছুটা সস্তাতেই পাওয়া যাবে।
টোল পার হয়ে একটু এগিয়ে গেলে আরও সুন্দর দৃশ্য। আস্তে আস্তে বিকেল হয়ে আসে। এরপর পশ্চিম আকাশে সূর্য যখন অস্ত নেয়, তখন নৌকাগুলোয় জ্বলে ওঠে হারিকেন। হারিকেনের আলো পানিতে দোল খেয়ে ভেসে বেড়ায়। দেখার মতো এক দৃশ্যের রচনা হয়।
চারদিকের আলো তখন নিভে গেছে। চটপটির দোকানগুলোতে জ্বলতে থাকে হ্যাজাক বাতি। আর রাস্তা দিয়ে ছুটে চলে গাড়িগুলো। ছলাত্ ছলাত্ পানির শব্দ কানে এসে বাজতে থাকে। মাঝেমধ্যে দুই-একটা বিমান উড়ে যায়। বিমানের বাতির আলোয় যেন চারদিক উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। রাত যত গভীর হতে থাকে, মানুষের আনাগোনা তত কমতে করে।
যেভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে আশুলিয়ায় যেতে চাইলে মিরপুর হয়ে যেতে পারেন, অথবা উত্তরা হয়ে।
নিজস্ব পরিবহনে যেতে পারেন অথবা উত্তরা থেকে অনেক বাস যায় ওদিকে। ওই বাসগুলোতে করে অনায়াসেই পৌঁছে যেতে পারেন এমন সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করতে। অথবা মিরপুর বেড়িবাঁধ থেকে রিকশা অথবা সিএনজিচালিত যানে সহজেই চলে যেতে পারেন সুন্দর সুন্দর সব লোকেশনে।
কিছু সতর্কতা
আশুলিয়া ও মিরপুর বেড়িবাঁধ—দুটো স্থানই লোকালয় থেকে দূরে হওয়ায় একা ভ্রমণ না করাই শ্রেয়; বিশেষ করে রাতের বেলা কয়েকজন একসঙ্গে ভ্রমণে বেরোনো ভালো। কারণ দুর্বৃত্তরা পথ আটকে ধরে সবকিছু ছিনিয়ে নিতে পারে। তবে মাঝেমধ্যেই পুলিশ টহল দেয়। এ জন্য সব দিক ভেবে ভ্রমণে বের হওয়াই ভালো।
বাড়তি কিছু
মিরপুর বেড়িবাঁধ ও আশুলিয়া ভ্রমণ শেষে বাড়তি হিসেবে পাওয়া যেতে পারে তুরাগ নদ থেকে তোলা নানা রকম তাজা মাছ। এসব মাছে নেই কোনো ফরমালিন। সুলভেই মিলবে মাছসহ বিভিন্ন শাকসবজি।