15/03/2025
নকল করতেও যে এতো মজা লাগে, আমি আগে জানতাম না।
আর ছোটবেলা থেকেই আমি বেশ ভালো স্টুডেন্ট। তাই নকল করার কথা মনে সেভাবে আসেনি। তখনও জানতাম নকল করে পেছনের বেঞ্চের ছেলে-পেলেরা। একটা সুপিরিওরিটি কমপ্লেক্স আর কী।
আমার এই সুপিরিয়রিটি কমপ্লেক্স প্রথম ভেঙে দেয় আমার বন্ধু হাসিব।
হাসিব একদিন ফিসফিস করে বলে, চল নকল করে লিখি।
হাসিব নিজেও ভালো স্টুডেন্ট। আমি এক। ও দুই। রাফি তিন। মাহমুদ চার।
আমরাই ক্লাসের বিগ ফোর। সামনে বসি। স্যারদের সাথে রেসপন্স করি। যে কোন সিদ্ধান্তে মাতব্বরি করি। উপরে উপরে বিরক্ত হলেও টিচাররা আমাদের এই মাতব্বরিতে কিছুটা প্রশ্রয়ই দেয় বলা চলে।
ভালো স্টুডেন্ট হলে সাত খুন মাফ টাইপের ব্যপার স্যাপার আর কী।
তো, হাসিব যখন নকল করতে বলে, তখন সেটাকে গুরুত্ব দিতেই হয়। আমি বলি, পরীক্ষায় কী করবো তাহলে? পরীক্ষায় তো পড়তেই হবে আবার।
হাসিব বলে , আরে গাধা, পড়তে হয় পরীক্ষার আগে দিয়ে পড়বো। আমার মামা ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। ফাটাফাটি রেজাল্ট। অথচ পড়ে কখন? পরীক্ষার আগের দিন। শোন, আগের দিন আর নাই। আমরা এখন বড় হইছি না? এখন কি আর এতো হোমওয়ার্ক করার টাইম আছে?
আমি মাথা ঝাকাই। কথা আসলেও সত্য। ক্লাস সিক্সে উঠার পর জীবনটাই কেমন পাল্টে গেসে। প্রায় দিনই বাংলাদেশ, পাকিস্তান নাহয় অষ্ট্রেলিয়ার খেলা থাকে। রাতে আবার দেখা লাগে বার্সা রিয়ালের খেলা। বিকেলটা তো মাঠেই শেষ। পড়বো কখন?
আমি হাসিবের কথা মেনে নিই। পড়া যখন লাগবেই, পরীক্ষার আগে পড়ে নেবো। ক্লাসে পড়ে লাভ কী?
হাসিব ব্যাগ নিয়ে ডেস্ক থেকে নামিয়ে কোলের উপর রাখে। বড় পকেটের চেন খোলা। সেই খোলা চেনের মধ্যে খোলা বই। এক হাত উপরে। আর এক হাত ব্যাগের ওখানে আড়াআড়ি করে রাখা।
স্যার অন্যদিকে ঘুরলেই ব্যাগের চেইনটা তুলে এক ঝলক দেখে নিয়ে লেখা।
ওর দেখাদেখি আমিও সেইম কাজটাই করতে যাই। আমার হাত কাঁপে। বারবার স্যারের সাথে চোখাচোখিও হতে লাগে। বাশার স্যার মিটিমিটি হাসেন। কী খবর, সাদিকুর রহমান? হয়ে গেসে তোমার? খাতা দিবা?
আমি বলি, স্যার আরেকটু। স্যার বলে ঠিক আছে, ঠিক আছে। তুমি তোমার মতো লেখো।
অন্য সব স্যারই আমাকে ডাকতেন সাদিক নামে। শুধু বাশার স্যার আদর করে ডাকতেন, সাদিকুর রহমান।
আমি কাঁপা কাঁপা হাতে নকল করে করে লিখতে থাকি । তেমন কিছু না। ভাবসম্প্রসারণ। টপিক, সততাই সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা। এখন আইরনি মনে হলেও তখন এইটাকে আমার কাছে কিছুমাত্র খারাপ মনে হয় নাই।
নকল করে লিখতে গিয়ে সেদিন তিনটে বিষয় আমি আবিষ্কার করলাম।
১। নকল করা মোটেও সহজ কিছু না। বরং হাত, চোখ আর নার্ভের সর্বোচ্চ পরীক্ষা দিতে হয়।
২। দেখে দেখে লিখতে সময় লাগে অনেক বেশি।
৩। সামনে বসে নকল করা বেশ সহজ। কারণ স্যারেরা ধরেই নেয় সামনে বসা ভালো স্টুডেন্টরা কখনও নকল করবে না। সো, তাদের সব মনোযোগ থাকে পেছনের সারিতে।
এই প্রথম পেছনে বসে নকল করা পোলাপাইনের প্রতি এক ধরণের সম্মান এবং শ্রদ্ধা অনুভব করলাম। নাহ, যত অপদার্থ আমরা ওদের ভাবি, ওরা আসলে অতোটা অপদার্থ না।
তবে এইটা ঠিক, নকল করা অনেক মজা। একে পড়াশোনা কিছুই করা লাগে না। দুই। নিষিদ্ধ কাজে আনন্দ অনেক বেশি।
সময় শেষ হওয়ার ঠিক ৪ মিনিট আগে আলিফ বইসহ ধরা পড়লো। স্যার ওর গালে দুটো চড় মেরে কান ধরে দাড় করিয়ে রেখে আবার চেয়ারে এসে কাজে মন দিলেন। আলিফ এর আগেও এমন কাজ করেছে, ধরাও পড়েছে, সো, অস্বাভাবিক কিছু না।
আমরা ভয়ে ভয়ে লেখা শেষ করে দ্রুত সেটা জমা দিই। আগেই বলেছি স্যার আমার লেখার বড় ভক্ত। আজ আরো বেশি প্রশংসা করলেন। শেষ কালে ভেরি গুড বলে খাতা ফেরত দিলেন।
গর্বে আমার বুক চওড়া হয়ে গেল দুই বিঘত পরিমাণ।
এমন সময় কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকা আলিফ বললো, সাদিকও তো স্যার নকল করে লিখেছে।
স্যার আমার দিকে চোখ তুললেন। চোখে স্পষ্ট রাগ।
২.
বাশার স্যার ঠিক মারধোর করা টিচার কখনোই ছিলেন না।
আমরা কখনোই স্যারের হাতে বেত দেখিনি। বরং স্যার সাধারণত বকা ঝকা আর বেশি হলে কানমলে দেওয়া, এর মধ্যেই থাকতেন।
বাট আলিফের কথা শুনে আমি স্যারের দুই চোখ লাল হয়ে যেতে দেখলাম।
স্যার ঠান্ডা কন্ঠে বললেন, সাদিকুর রহমান। এদিকে আসো।
আমি তখন চাবি দেওয়া পুতুলের মতো হয়ে গেছি। লজ্জায় মাথা কাটা যাওয়ার জোগাড়। মনে মনে বলছি, হে ধরনী দ্বিধা হও। আমার সব রাগ গিয়ে পড়ে আলিফের উপর। শালা স্যার আজকে বের হোক ক্লাস থেকে।
স্যার বললেন, নিচে যাও। আমার অফিস রুমের ড্রয়ারে বেত রাখা আছে। নিয়াসো।
গোটা ক্লাস আতঙ্কে শিউরে উঠলো। শিউরে উঠতে চাইলাম আমিও।পারলাম না। ততক্ষণে আমার সারা শরীর অবশ হয়ে আসতে শুরু করেছে। গলা শুকিয়ে কাঠ। পানি খাবো। কিন্তু পানি কই?
২.
অফিস রুমে রাজ্জাক স্যার হেসে বললেন, কী নিবা? মার্কার?
আমি বললাম, স্যার, বেত।
রাজ্জাক স্যার বললেন, কোন স্যারের ক্লাস?
আমি বললাম, বাশার স্যার।
উনার মুখ থেকে হাসি উধাও হয়ে গেল। বললো, যাও নিয়ে যাও। কিন্তু স্যার বেত চায় কেন?
জানি না বলে উঠে আসতে শুরু করলাম। মাথার ওজন যেন বেড়ে গেছে দুই কেজি। আর পায়ের ওজন দশ কেজি। সিড়ি দিয়ে আমার পা উঠে না। খালি একটা কথাই মনে হয়, এ আমি কী করলাম? কী করলাম? এই মুখ আর মানুষকে দেখাবো কী করে? ফার্স্টবয় হয়ে শেষমেশ নকল করা?
৩.
বেত হাতে নিয়ে বাশার স্যার শুরু করলেন মাইর।
ঐ প্রথম। ঐ শেষ।
ক্লাস এইটে স্কুল চেঞ্জ করার আগে আমি উনারে আর কখনওই কাউকে মারতে দেখিনি।
স্যারের বেতের শব্দ আর আলিফের চিৎকার, আমার কানে তালা লেগে গেল। ততক্ষণে বুঝে গেসি, মাইরটা আসলে আমি না, আলিফের নসিবেই যাচ্ছে।
মারতে মারতে স্যার বললেন, লেখাপড়া করিস না। সারাদিন করিস নকল আর বদমায়েশি। আবার ঐ ভালো ছেলেটার নামে নালিশ করিস যে ও নকল করে? আরে ব্যাটা, ও না পারলে সাদা খাতা জমা দিবে। বাট নকল করবে না, আমি জানি। তোর মতো নাকি ও?
এরপর স্যার আমাকে বললো, তুমি যাও, সাদিকুর। মন খারাপ করো না। হিংসা থেকে বলেছে। ভালো ছেলেদের এসব হিংসা সহ্য করতেই হয়।।
আমি হাফ ছেড়ে বাঁচতে চাইলাম। হাফ আমাকে ছাড়লো না। নড়তে গিয়ে দেখি আরো নড়তে পারি না। এই কথাগুলো শোনার চে মাইর খাওয়াও বুঝি ভালো ছিলো?
৪.
এরপর আমি আর কখনওই বাশার স্যারের চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারিনি।
পরীক্ষার হলে টুকটাক দেখাদেখি করতাম। ঐটাও বন্ধ হলো।
নকল তো দূরের কথা।
পাশের জনের খাতা দেখতে গেলেও মনে হতো স্যারের সেই কথা, ও না পারলে সাদা খাতা জমা দিবে। বাট নকল করবে না, আমি জানি।
এতো মাইর খাওয়ার পরেও আলিফ নকল করা ছাড়ে নি। বাট ছেড়েছিলাম আমি।
৫.
জীবনের প্রথম বাজার করা সব ছেলের জন্যই স্পেশাল হয়। আনন্দের হয়।
আমার জন্য হয়নি। বরং প্রথম বাজারের স্মৃতি আমার কাছে ছিলো কষ্টের।
আব্বু টাইফয়েড হয়ে বিছানায় পড়ে গেলেন। আম্মুরে বসে থাকা লাগে কম্বল নিয়ে। বাজার করার লোক আমি ছাড়া আর কেউ নাই। বাজারের ব্যাগ হাতে নিয়ে আসার সময় খালি আব্বুর কথা মনে পড়ে। এতো শক্তিশালী মানুষ। কবে উঠবে আবার? আমার কান্না পায়।
আব্বু বিছানা থেকে উঠলেন এক মাস পর। তবে আমার বাজারে যাওয়াটা বহাল থাকলো। বুঝলাম, বাজার আমি ভালোই করি।
এর মধ্যে একদিন দামাদামি করে কিছু টাকা কমাইয়া ফেললাম। টাকাটা আলাদা করে ঢুকাইয়া নিলাম বাম পকেটে। ব্যাপারটা চুরি মনে করলেও আমি পারিশ্রমিক হিসেবে নিলাম। ঠিক করলাম, আব্বু বললে বাড়তি দামের কথা বলে হিসাব বরাবর করে ফেলবো।
বাজার শেষে সব হিসাব মিলাইয়া আব্বুর ঘরে গেলাম। বাড়তি টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য। আব্বু বললো, কী? আমি বললাম মাছ কিনতে লেগেছে...আব্বু ধমক দিলো। বললো, তোমার থেকে টাকার হিসাব কখন চাইসি? যা বাচসে, টেবিলের উপর রেখে যাও। তুমি আমার ছেলে, তোমার থেকে আমার টাকার হিসেব নিতে হবে না। যাও।
আমি ডান পকেটে হাত ঢুকাই। বাম পকেটেও হাত ঢুকাই। তারপর শূন্য পকেট নিয়ে ঘরে ফিরে আসি। এই পৃথিবীতে বিশ্বাসের চে ভারী কোন বস্তু আজতক আবিষ্কার হয়েছে বলে মনে হয় না।
ঐ প্রথম। ঐ শেষ। আমার বাম পকেটে আর বাজারের টাকা ঢোকেনি কখন।
শূণ্য বুক পকেটে টাকা না, ভরে থাকে বিশ্বাস।
সেই বিশ্বাস নিয়ে আমি বাজার করে যাই দিনের পর দিন।
৬.
ঘুষ আমি খাই নাই কোনদিন। খাওয়ার ইচ্ছাও কখনও করেনি।
তবে কমিশনের টাকার ভাগ একবার নিয়েছিলাম। খুব বেশিও না। ৫০ হাজার টাকার একটা বান্ডিল। যদিও নাম ছিলো কমিশন, এটা কিসের টাকা আমি জানতাম। সবাইই জানতো।
টাকা নেওয়ার রাতে ছেলেটা এসে বললো, আজকে মিস আমাদের অনেস্টি নিয়ে পড়াইসে। আমার বিষম লাগে। বৌ পানি আগাইয়া দেয়। বিবেকের বিষম কি আর পানিতে নামে?
ছেলে বলতে থাকে, তুমি তো অনেস্ট, না বাবা? আমি কিন্তু হাত তুলে বলেছি আমার বাবা অনেস্ট বাবা।
আমি হাত দিয়ে ভাত তুলতে যাই। আমার হাত ভারী লাগে। সেই বাশার স্যারের মতো। সেই আব্বুর মতো। বিশ্বাস নামের এই কারাগার আমার পিছু ছাড়লো না জীবনে।
আমার আর হালকা হওয়াও হলো না কোনদিন।
৭.
পুরুষ মানুষের জীবনে সবচে বড় ট্রাজেডি হলো, বিবাহের পর সবাই বৌ এর কথা জিগায়। তার কথা জিগায় না।
আর বাচ্চা হওয়ার পর জিগায় বাচ্চার কথা।
বাপ হওয়ার পর মা থেকে শ্বাশুড়ি, বন্ধু থেকে কলিগ সবাই আমারে প্যারেন্টিং এর শিক্ষা দেয়। অমুক অমুক করতে হবে। তমুক তমুক করতে হবে। শাসন করতে হবে। বাচ্চার মা বলে, পেটাইতে হবে। বাচ্চাকাচ্চা পেটানো আমার বহুদিনের শখ।
আমি মিটিমিটি হাসি। সবার অভিযোগ আমি ওরে বকি না, মারি না, শাসন করি না। কীভাবে মারবো? আমার যে মায়া লাগে। কিন্তু শাসন? শাসনও তো করতে হবে, নাকি?
রাতে ঘুমানোর পর ছেলেটার মাথায় হাত বুলাই। তারপর নীরবে, সবার অগোচরে আমার গলায় ঝুলতে থাকা বিশ্বাসের শেকলটা ওর গলায় পরিয়ে দিই।
বিড়বিড় করে বলি, আমি তোরে অনেক বিশ্বাস করি বাপ, অনেক বিশ্বাস করি।
রাতের আলো আধারির আবছায়াতে একটা ছায়ার শেকল ওর গলাতে আটকে যায়।
বাবা হিসেবে আমার কর্তব্য শেষ হয়।
মানুষকে শাসন বা নিয়ন্ত্রণের সবচে ভারী অস্ত্রটার নাম বিশ্বাস। এরপরে বাবা হিসেবে আমার আর চিন্তা কিসের?