20/10/2015
সনেট
শেক্সপিয়ার
১
নিবিড় মিলনের মাঝে দুটি মন যদি এক হয় তবে তার মাঝে কখনই কেন বাধা স্বীকার করবো না, যে প্রেম প্রেমই না, যে প্রেম ক্ষণেক্ষণে মত বদলায় অথবা নূতন প্রভুর কাছে নব অঙ্গীকার করে চলে। যে প্রেম প্রকৃত তা চিরদিন লক্ষ্যে চিরস্থির থাকে। ঝড়ের আঘাতে সে কোনদিনই কম্পিত হয় না। অচঞ্চল দূরের নক্ষত্র যেন কখনই কক্ষচু্ত হয় না যে মহত্ব অনস্বীকার্য যদিও তার যোগ্যতা অজ্ঞাত।
কালের করাল হাতে এই প্রেম কখনই ক্রীড়ানক নয়, অথচ কালগ্রাসে ক্সয় হয় সুন্দর কত গন্ড আর ওষ্ঠাধর। কালের গতির ঘায়ে এই প্রেম কখনই নিরর্থক হয় না। সমস্ত ধ্বংসের মাঝে এই প্রেম রয়ে যায় অজর অমর। এ যদি ভুল বলে প্রমাণিত হয়, মিথ্যা হয় তবে আমার সব কবিতা মিথ্যা বলে প্রমাণিত হবে, আমার প্রেম মিথ্যা বলে বিদিত হবে।
২
হে প্রিয়, যখন ধরেছি বহিরঙ্গ সম্মানের হীন চন্দ্রাতপ, তোমার পথে দিয়েছি আমার সমস্ত শ্রদ্ধাসিক্ত ভালবাসার অঞ্জলী। সুখ ও দুঃখের যত তীব্র শীতাতপ আমি সইতে পারিনি। অনন্তের ভিত্তি তবু তা কালের জয়ে জলাঞ্জলী দিতে পারে নি। আমি দেখেছি যারা রূপ আর অনুগ্রহ চায় তারা অনেক বেশী হারায় যা তারা ভালবেসে দেয়। তারা সরল সুবোশ ছেড়ে মিশ্রিত উপাদানে সংগ্রহ করে চলে, তাদের ক্ষেত্রে চোখের পলক ফেলতে না ফেলতে সমস্ত রূপ আর অনুগ্রহ নিঃশেষে ফুরিয়ে যায়। তার থেকে তোমার অন্তরে আমাকে টেনে নাও, আমি যদিও নিঃস্ব তুও আমি মুক্ত, আমার আত্মা স্বাধীন। আমার অবিমিশ্রিত সত্তা ছলনাকে কখনও প্রশ্রয় দেয় না। আমার সত্তা তোমাতেই উৎসর্গকৃত। সম্পূর্ণ প্রতারণা হীন সে সত্তা। আমার আত্মা যখন অকারণে অভিযুক্ত হবে তখনো তুমি কত শত চাপ ও পীড়ন তুচ্ছ করে মুক্ত থাক।
৩
হে তরুন বালক তোমার মুষ্টিকে দৃঢ়বদ্ধ কর, কালের কাস্তে ভয়ানক আর তার ভ্রাম্যমান দর্পন চপল। যখন তুমি দুর্বল হয়ে পড়ে তখন তোমার আপন আত্মার দর্পনে প্রেমিককে দুর্বল করে দেখাও, যেভাবে তোমার প্রেমিক তোমার মনে প্রতিবিম্বিত হয়ে আছে। পরম কর্ত্রী প্রকৃতি যেদিকে চলবে। যেদিকে সেটা চালাতে চাইবে, যদিই তুমি এগিয়ে যাও এখনি সে তোমায় টেনে ধরবে। তার কবলে সে তোমাকে রেখে দেয় এই উদ্দেশ্য নিয়ে অদ্ভুত এক সূক্ষ্ম কৌশলে সে কালকে ধ্বংস করে অকারণে। হে বালক, সে প্রকৃতিকে তুমি ভয় করে চলো, তার মতে মত দিয়ে চলো দেরী হলেও সে তার সম্পদ যেন তোমাকে অর্পন করে, দেরীতে হলেও তার দেনা পাওনা শোধ করে দিতে হবে, পরিশেষে যা দেবার সে তোমাকেই দিয়ে যাবে।
৪
যতবার তোমার হাত সুরের মুর্ছনায় ফেটে পড়ে বীণার তারের ওপর তোমার আঙুলের সাথে সে তার নেচে চলে, তোমার আঙুলের মুদু চালনায় যে গীতের সুষ্টি হয় তাতে আমার কর্ণকুহর হঠাৎ করে স্তব্দবিহবল হয়ে পড়ে বীণার তারের ভাগ্যকেতাই আমি ঈর্ষা করি আমি ফেটে পড়ি তীব্র ভীষণ আকার ধারণ করে। আমার ওষ্ঠ দুটি তোমার চুম্বনের আশায় সর্বদাই প্রস্তত। প্রাণহীন বীণার তাদের উদ্বত্য দেখে তার ব্যথা তীব্র ভীষণ আকার ধারণ করে। আমার ওষ্ঠ দুটি তোমার চুম্বনের আশায় সর্বদায় প্রস্তত।
প্রাণহীন বীনার তারগুলি তোমার আজ আমার ওষ্ঠ বীণার তারে পরিণত হতে চায়। সে স্পর্শ না পেয়ে তারা আজ নির্জীব হয়ে আছে। হে প্রিয়া, তুমি যত পারো তোমার আঙুলগুলোকে উদ্বত বীণার তারে দিও কিন্তু একমাত্র তোমার চুম্বন দিও আমার দুটি অধরে।
৫
আমার প্রিয়ার মুখ সূর্যের মত উজ্জল নয়। তার অধরোষ্ঠ থেকে রক্ত-প্রবাল অনেক বেশী লাল। তুষারের মত তার বক্ষ শুভ্র সমুজ্জ্বল নয়। তার কেনাজালে মন কৃষ্ণ অমাংস্য জটিল তারের মত জীবনের নানাস্থানে অনেক দেখেছি রক্ত শ্বেত গোলাপ আমার প্রিয়ার গন্ড গোলাপের মত সুন্দর নয়। যে গন্ধ আমার প্রিয় নিঃশ্বাসের সাথে নিঃসৃত হয়, সে গন্ধকে গোলাপের গন্ধের সাথে তুলনা করাই বৃথা অপলাপ। তার কথা ভালবাসা কারণ তা কি যেন এক নেশায় নেশা, কিন্তু সংগীতের মত সেকথা জানি তা মধুর নয়। মন্দ মধুর পায়ে সে যখন মাটির পরে যাওয়া আসা করে মর্ত্যের সে মানবীকে কখনই স্বর্গের দেবী বলে ভুল হয় না। তবুও শপথ করে বলে যে তার প্রতি আমার প্রেম মাত্য সুবিরল। মিথ্যা যত তুলনার অতীত সে তার রূপগুণের সম্বল।