10/07/2026
একজন মানুষকে দ্বিতীয়বার হত্যা করতে অস্ত্র লাগে না।
শুধু তাকে ভুলে গেলেই যথেষ্ট~~~~~~~~~~~~~~~~
মৃত্যুর আগে বুবি শেষবার কোথায় তাকিয়েছিলেন?
আকাশের দিকে?
নাকি রেললাইনের দিকে, যে রেললাইন তাঁকে পঁচিশ বছর আগে এক অজানা গন্তব্য থেকে মেথিকান্দা স্টেশনে এনে নামিয়ে দিয়েছিল?
কেউ জানে না।
কেউ জানবে না।
কারণ বুবি কোনোদিন কথা বলতে পারেননি।
পৃথিবীতে এমন কিছু মানুষ থাকে, যাদের জন্ম হয়, জীবন কেটে যায়, মৃত্যুও হয়—কিন্তু তাদের গল্প কেউ লেখে না। তাদের জন্য কোনো ইতিহাস তৈরি হয় না। তারা কোনো পরিসংখ্যানে জায়গা পায় না। রাষ্ট্র তাদের নাম জানে না, সমাজ তাদের পরিচয় জানতে চায় না।
বুবি ছিলেন তেমনই একজন মানুষ।
প্রায় সত্তর বছরের এক বাক্প্রতিবন্ধী নারী।
তাঁর ঠিকানা ছিল একটি রেলস্টেশন।
বাড়ি ছিল না।
পরিবার ছিল কি না, কেউ জানত না।
জাতীয় পরিচয়পত্র ছিল কি না, কেউ খোঁজ নেয়নি।
তিনি শুধু ছিলেন।
প্রতিদিন ভোরে স্টেশন ঝাড়ু দিতেন।
মানুষের ফেলে যাওয়া প্লাস্টিক, কাগজ, বোতল কুড়িয়ে পরিষ্কার করতেন।
কেউ দয়া করে দু-একটা টাকা দিলে নিতেন।
না দিলে নীরবে সরে যেতেন।
কারও কাছে অভিযোগ করতেন না।
কারণ অভিযোগ করার ভাষাটুকুও তাঁর ছিল না।
---পঁচিশ বছর...একটি মানুষের জীবনের কত দীর্ঘ সময়!
এই দীর্ঘ সময়ে তিনি জমিয়েছিলেন মাত্র চল্লিশ হাজার টাকা।
কী ভয়ংকর হিসাব!
প্রতিদিন গড়ে চার টাকা আটত্রিশ পয়সা।
এক কাপ চায়ের দামও নয়।
কিন্তু সেই চার টাকা ছিল তাঁর না-খাওয়া দুপুরের মূল্য।
ছিল শীতের রাতে না কেনা একটি কম্বলের দাম।
ছিল অসুস্থ শরীর নিয়ে ওষুধ না খাওয়ার সিদ্ধান্ত।
ছিল নিজের সব চাওয়া-পাওয়াকে মেরে ফেলে বেঁচে থাকার এক অসম্ভব ধৈর্যের গল্প।
সেদিন গভীর রাতে কয়েকজন মানুষ এল।
তারা জানত না, কিংবা জানার প্রয়োজনও মনে করেনি—এই বৃদ্ধা কত কষ্টে টাকাগুলো জমিয়েছেন।
তাদের প্রয়োজন ছিল শুধু টাকা।
তারা ঘুম থেকে তুলে তাঁকে মারল।
একজন সত্তর বছরের অসহায় নারীকে।
যিনি আত্মরক্ষা করতে পারেন না।
চিৎকার করতে পারেন না।
সাহায্য চাইতে পারেন না।
ভাবতে কষ্ট হয়...
প্রথম আঘাতটা যখন তাঁর শরীরে পড়েছিল, তখন কি তিনি ভয় পেয়েছিলেন?
নাকি এত বছরের কষ্ট তাঁকে ভয় পাওয়ার ক্ষমতাও কেড়ে নিয়েছিল?
শেষ মুহূর্তে কি তিনি কাউকে মনে করেছিলেন?
মা?
বাবা?
নাকি এমন কাউকে, যার কথা পৃথিবীর কেউ কোনোদিন জানবে না?
মারধরের পর বুবি স্টেশনের একটি বেঞ্চে গিয়ে বসেছিলেন।
রক্তাক্ত মুখ।
নিস্তব্ধ চোখ।
একটি শব্দও নেই।
মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর সমস্ত শব্দ যেন তাঁর কাছ থেকে অনেক আগেই বিদায় নিয়েছে।
তারপর...তিনি চলে গেলেন।
এতটাই নীরবে, যতটা নীরবে একদিন এই স্টেশনে এসেছিলেন।
---আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে...
বুবি কোথা থেকে এসেছিলেন?
কোন গ্রামের মাটি তাঁর শৈশব চিনত?
কোন মা তাঁকে জন্ম দিয়েছিলেন?
কোন বাবা প্রথম কোলে নিয়েছিলেন?
-- এই স্টেশনে নতুন মানুষ আসবে।
নতুন ট্রেন থামবে।
নতুন ভিক্ষুক বসবে।
নতুন দোকান খুলবে।
সবকিছু আগের মতোই চলবে।
শুধু কেউ হয়তো একদিন বলবে—
"এখানে একটা বোবা বৃদ্ধা থাকত..."
তারপর সেই কথাটুকুও হারিয়ে যাবে।
বুবির জন্য কোনো শোকসভা হবে না।
কোনো মানববন্ধন হবে না।
কোনো রাজনৈতিক বক্তৃতায় তাঁর নাম উচ্চারিত হবে না।
কোনো স্মৃতিফলকে লেখা থাকবে না—"এই মানুষটিও একদিন বেঁচে ছিলেন।"
হয়তো তাঁর কবরেও নাম থাকবে না।
কিন্তু আমরা যদি তাঁকে ভুলে যাই, তাহলে শুধু একজন বুবিকে নয়—আমাদের বিবেককেও কবর দিয়ে ফেলব।
কারণ সভ্য সমাজের পরিচয় বড় বড় ভবনে নয়, বড় বড় বক্তৃতায় নয়।
সভ্যতার পরিচয় লুকিয়ে থাকে সেই সমাজ কীভাবে তার সবচেয়ে অসহায় মানুষটিকে রক্ষা করে।
আমরা বুবিকে রক্ষা করতে পারিনি।
অন্তত তাঁর গল্পটাকে বাঁচিয়ে রাখি।
যেন আগামী প্রজন্ম জানে—একসময় এই দেশে একটি স্টেশনে একজন নীরব নারী ছিলেন, যিনি সারা জীবন কাউকে কষ্ট দেননি; অথচ মানুষই তাঁর শেষ সম্বলটুকু ছিনিয়ে নিয়ে তাঁকে হত্যা করেছিল।
বুবি আর নেই।
কিন্তু তাঁর নীরবতা আমাদের প্রতিদিন প্রশ্ন করে যাবে!
এই হত্যার সাথে আমিও জড়িত!
আপনিও!
Copied