27/03/2015
মুক্তিযুদ্ধের শেকড়সন্ধান ও ছাত্র
ইউনিয়নের জন্ম
ফকির বিদ্রোহ, সন্যাস বিদ্রোহ,
সাঁওতাল বিদ্রোহ, ১৮৫৭ সালের
প্রথম ভারতীয় স্বাধীনতা যুদ্ধের
ধারাবাহিকতায় পরবর্তীকালে
ভারতজুড়ে স্বরাজের জন্য
নামাত্রিক আন্দোলন-সংগ্রাম,
অনুশীলন, যুগান্তরের মত সশস্ত্র
গ্রুপসমূহের বিপ্লবী প্রয়াস
বাংলাকে পরিনত করেছিল
অগ্নিগর্ভে। শত বছরেরও বেশি
সময় ধরে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা
সংগ্রাম যে মুক্তিচেতনার উন্মেষ
ঘটিয়েছিল, তার মাঝেই বিকশিত
হয়েছে বাঙালির মুক্তিসংগ্রাম। এ
প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, বিংশ
শতাব্দীর প্রথমার্ধ থেকেই
ভারতবর্ষে বামপন্থী ধারার বিকাশ
ঘটতে শুরু করে। ক্রমশই সুসংগঠিত
হতে থাকে কমিউনিস্টরা,
ফলশ্রুতিতে বেগবান হতে থাকে
এদেশের উপনিবেশবিরোধী ও
অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রাম।
বাংলাতেও সেই প্রগতিশীল
আন্দোলনের ঢেউ এসে লাগে।
ভারতবর্ষের জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম
যখন অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে
চলছে- বিপ্লবী সশস্ত্র সংগ্রামে
ক্ষুদিরাম, বাঘা যতীন, ভগত সিং,
রাজগুরু, আশফাকউল্লাহ, সূর্যসেন,
প্রীতিলতাদের মত অসংখ্য তরুণের
আত্মত্যাগের দৃষ্টান্ত যখন
মানুষকে উজ্জীবিত করছে
স্বাধীনতার মন্ত্রে,তখনই ব্রিটিশ
সরকারের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ
উৎসাহে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প
ছড়িয়ে দেয়া হয় ভারতবর্ষজুড়ে।
নানামুখী ষড়যন্ত্র এবং উত্তাল
সেই সময়ে ঘটে যাওয়া কিছু
ঘটনাবলীকে ঘিরে সৃষ্ট
গণবিভ্রান্তিকে কাজে লাগিয়ে
সামনে নিয়ে আসা হয় দ্বি-জাতি
তত্ত্বকে । ভারতবর্ষের জনগণের
বিজয়কে খন্ডিত করা এবং ইঙ্গ-
মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নয়া
উপনিবেশিক শোষণ নিশ্চিত করার
ষড়যন্ত্রকে সফল করে জন্ম
নেয় সাম্প্রদায়িক পাকিস্তান
রাষ্ট্র।এদেশের মানুষের সাংস্কৃতিক
ঐতিহ্য ধারণ করে অসাম্প্রদায়িক,
উদার, মানবতাবাদী চরিত্রকে।
সুফিবাদ, মরমীবাদ, বাউল ঐতিহ্যের
ধারাবাহিকতায় রবীন্দ্রনাথ, লালন,
বিবেকানন্দ, নজরুলের মত মনিষীরা
উদার মানবতাবাদী দর্শন প্রোথিত
করেছেন বাঙালির মানসপটে। সেই
চরিত্রকে ধারণ করে ও হাজার
বছরের নিজস্ব ভাষা-সংস্কৃতি-
ঐতিহ্য-সংগ্রামকে লালন করে,
পাকিস্তান নামক
সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রকাঠামোর অংশ
হওয়া বাঙালিদের মধ্যে আরেক নতুন
দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করে। তার ওপর,
পাঞ্জাবি একচেটিয়া ধনিকদের
নেতৃত্বে পরিচালিত পাকিস্তানী
রাষ্ট্রযন্ত্রের শোষণের খড়গ নেমে
আসে পূর্ববঙ্গের মানুষের ওপর।
অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক,
প্রশাসনিকক্ষেত্রে নিদারুণ বৈষম্য,
ভাষা-সংস্কৃতির উপর আগ্রাসন,
রাষ্ট্রযন্ত্রের দমন-নিপীড়ন এ
অঞ্চলের মানুষকে ক্রমশ
মুক্তিসংগ্রামের দীক্ষায় দীক্ষিত
করে তোলে।
দেশ ভাগের অব্যবহিত পরেই
উপমহাদেশের কমিউনিস্টদের কন্ঠে
সর্বপ্রথম আওয়াজ ওঠে, ‘ইয়ে
আজাদি ঝুটা হ্যায়, লাখো ইনসান
ভুখা হ্যায়’। পূর্ব বাংলার
কমিউনিস্টরাও এই স্লোগান নিয়ে
মানুষের কাছে যেতে থাকেন। সেসময়
এই আওয়াজ হঠকারী ছিল কীনা সে
প্রসঙ্গ এড়িয়েও এ কথা বলা যায়
যে, কমিউনিস্টরাই সর্বপ্রথম ১৯৪৭
সালের সেই তথাকথিত স্বাধীনতাকে
মিথ্যে বলে চিহ্নিত করেন। সেই
মিথ্যে স্বাধীনতাকে প্রত্যাখ্যান
করেই সামাজিক, রাজনৈতিক,
অর্থনৈতিক মুক্তির মহান লক্ষ্যে
১৯৭১ সালে সংঘটিত হয় মহান
মুক্তিযুদ্ধ। যদিও, প্রতিক্রিয়াশীল
প্রতিবিপ্লবীদের দখলে
বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতা চলে
যাওয়ায় আমরা আজো সেই মুক্তির
প্রকৃত স্বাদ আস্বাদন করতে পারি
নি, এখনো কোটি মানুষ অনাহারে,
অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে।
কমিউনিস্টদের উপর পাকিস্তান
জন্মের পর থেকেই নেমে আসে
ফ্যাসিস্ট আক্রমণ, নির্যাতন,
জুলুম। তার মাঝেই নাচোলের
রাণীকমরেড ইলা মিত্রের নেতৃত্বে
তেভাগা আন্দোলন, কমরেড মণি
সিংহের নেতৃত্বে টঙ্ক আন্দোলন,
অজয় ভট্টাচার্য-বারীন দত্তের
নেতৃত্বে নানকার বিদ্রোহ গড়ে
ওঠে। শাসকশ্রেণীর হিংস্রতায়
খাপড়া ওয়ার্ডে এ দেশের প্রথম
জেল হত্যাকান্ডে শহীদ হন
কমিউনিস্ট বিপ্লবীরা।
কমিউনিস্টদের সংগ্রামে
অর্থনৈতিক মুক্তির প্রশ্নের সাথে
সাথে গণতন্ত্র এবং বাঙালি জাতির
অধিকারের প্রসঙ্গও ক্রমশ সামনে
আসতে থাকে। পূর্ব বাংলার নিপীড়িত
মানুষও সচেতন হয়ে ওঠে তাদের
অধিকার সম্পর্কে।